- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা:- পশ্চিমা দর্শনের অন্যতম প্রাণপুরুষ সক্রেটিস কোনো নির্দিষ্ট জ্ঞানতত্ত্ব বা সুস্পষ্ট মতবাদ রচনা করে যাননি। কিন্তু তার দর্শনচর্চার পদ্ধতি এবং জীবনদর্শন এক বিশেষ জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণের জন্ম দিয়েছিল, যা আজও দার্শনিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তার জ্ঞানতত্ত্ব কোনো সুনির্দিষ্ট সূত্রের সমষ্টি নয়, বরং জ্ঞান অনুসন্ধানের একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া। নিচে সক্রেটিসের জ্ঞানতত্ত্বের মূল ভিত্তিগুলো ব্যাখ্যা করা হলো।
১. জ্ঞানের প্রথম সোপান: সক্রেটিসের জ্ঞানতত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত উক্তি হলো, “আমি কেবল একটি জিনিসই জানি, এবং তা হলো আমি কিছুই জানি না” (I know that I know nothing)। এই উক্তিটি আক্ষরিক অর্থে তার অজ্ঞতার প্রকাশ নয়, বরং এটি এক গভীর দার্শনিক অবস্থান। এর মাধ্যমে সক্রেটিস বোঝাতে চেয়েছেন:
- অহংকারমুক্ত মন: প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের প্রথম শর্ত হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা। যারা মনে করে তারা সবকিছু জানে, তারা নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ও যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।
- মিথ্যা জ্ঞানের অপসারণ: সমাজে প্রচলিত বহু ধারণা, বিশ্বাস ও মতামত আসলে পরীক্ষিত সত্য নয়। সক্রেটিস এই ধরনের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে মানুষের মন থেকে ভ্রান্ত জ্ঞানের আগাছা পরিষ্কার করতে চাইতেন।
সুতরাং, নিজের অজ্ঞতাকে মেনে নেওয়াই হলো প্রকৃত জ্ঞানের পথে প্রথম পদক্ষেপ।
২. সক্রেটিক পদ্ধতি বা এলিস্কাস (The Socratic Method or Elenchus): সক্রেটিস জ্ঞান বিতরণের পরিবর্তে জ্ঞান অনুসন্ধানের এক নতুন পদ্ধতির জন্ম দেন। এই পদ্ধতিটি “সক্রেটিক মেথড” বা “ডায়ালেকটিক মেথড” (সংলাপ পদ্ধতি) নামে পরিচিত। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- প্রশ্নোত্তর পর্ব: সক্রেটিস নিজে কোনো উত্তর না দিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন করতেন। যেমন—”ন্যায় কী?”, “সাহস কাকে বলে?” ইত্যাদি।
- ধারণার পরীক্ষা: সাক্ষাতকারে দেওয়া উত্তরের ওপর ভিত্তি করে তিনি আরও গভীর এবং যৌক্তিক প্রশ্ন করতেন। এর মাধ্যমে তিনি সেই ধারণার দুর্বলতা ও অসংগতিগুলো তুলে ধরতেন।
- লক্ষ্য: এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য কাউকে পরাজিত করা ছিল না, বরং সংলাপের মাধ্যমে উভয়েরই একটি স্বচ্ছ ও যৌক্তিক উপলব্ধিতে পৌঁছানো। তিনি নিজেকে একজন “ধাত্রী” (midwife) হিসেবে মনে করতেন, যিনি অন্যের মনের ভেতর থেকে জ্ঞানকে জন্ম নিতে সাহায্য করেন।
৩. অ্যাপোরিয়া (Aporia) (দ্বিধা ও উপলব্ধির মুহূর্ত):-সক্রেটিসের প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে যখন কোনো ব্যক্তি তার নিজের ধারণার অসংগতিগুলো বুঝতে পারতেন, তখন তিনি এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বিধা বা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পৌঁছে যেতেন। এই অবস্থাকেই গ্রিকদর্শনেঅ্যাপোরিয়া (Aporia)বলা হয়।
অ্যাপোরিয়া কোনো নেতিবাচক অবস্থা নয়। সক্রেটিসের মতে, এটি একটি জরুরিপর্যায়। কারণ এই দ্বিধার মুহূর্তেই মানুষ তার পুরনো ও ভ্রান্ত বিশ্বাসকে ত্যাগ করে প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানের জন্য প্রস্তুত হয়। এটিই হলো নতুন জ্ঞান লাভের পূর্বশর্ত।
৪. “জ্ঞানই পুণ্য” (Knowledge is Virtue): সক্রেটিসেরজ্ঞানতত্ত্ব তার নীতিতত্ত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবেজড়িত। তার বিখ্যাত উক্তি “জ্ঞানই পুণ্য”-এর মূল বক্তব্য হলো:
- কেউ জেনেশুনে অন্যায় করে না:সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন, মানুষ যখন কোনো কিছুর প্রকৃত স্বরূপ বা সত্য সম্পর্কে জানে, তখন সে মন্দ কাজ করতে পারে না। সব অন্যায় বা পাপের মূল কারণ হলো অজ্ঞতা।
- নৈতিকতার ভিত্তি:সত্যিকারের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় কী, তা জানাটাই হলো virtuous বা গুণী হওয়ার একমাত্র পথ। জ্ঞান কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়, এটি নৈতিক আচরণের চালিকাশক্তি।
৫. জ্ঞানের ধারণা সার্বজনীন ও অপরিবর্তনীয়:সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, জ্ঞান হলো সার্বজনীন (universal) এবং অপরিবর্তনীয়। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বস্তু বা মতামত পরিবর্তনশীল, তাই তা প্রকৃত জ্ঞানের উৎস হতে পারে না। জ্ঞান হলো বস্তুর সারাংশ (essence) সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ও যৌক্তিক ধারণা, যা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অপরিবর্তিত থাকে। যেমন—বিভিন্ন সাহসী কাজ থাকতে পারে, কিন্তু “সাহসিকতা”র মূল ধারণাটি এক ও অভিন্ন।
উপসংহার: সক্রেটিসের জ্ঞানতত্ত্ব আমাদের কোনো (ready-made) উত্তর দেয় না, বরং উত্তর খোঁজার একটি পথ দেখায়। তার দর্শন অনুযায়ী, জ্ঞান অর্জন একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া, যা শুরু হয় নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করার মাধ্যমে এবং এগিয়ে চলে সংলাপ, প্রশ্ন ও যুক্তির পথে। এটি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়, বরং একটি নৈতিক ও আত্ম-উন্নয়নমূলক যাত্রা। সক্রেটিসের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি আজও শিক্ষা, আইন এবং দর্শন চর্চার এক অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে আছে।

