- readaim.com
- 0
উত্তর::শুরু: প্রশাসন হলো একটি দেশের চালিকাশক্তি, যা রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। মূলত প্রশাসনের দুটি ভিন্ন রূপ দেখা যায়: সনাতন প্রশাসন এবং উন্নয়নমুখী প্রশাসন। সনাতন প্রশাসন মূলত স্থিতিশীলতা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর, যেখানে প্রচলিত নিয়ম-কানুন ও প্রথাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অন্যদিকে, উন্নয়নমুখী প্রশাসন হলো একটি গতিশীল ব্যবস্থা যা সমাজের সার্বিক উন্নয়নে সরাসরি অংশগ্রহণ করে এবং জনগণের চাহিদা পূরণে সচেষ্ট থাকে। এই দুটি প্রশাসনের মধ্যেকার মৌলিক পার্থক্যগুলো বোঝা যেকোনো রাষ্ট্র ও সমাজের অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য।
১। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: সনাতন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হলো স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিদ্যমান আইন-কানুন ও প্রথাকে কঠোরভাবে অনুসরণ করা। এখানে প্রশাসনের মূল কাজ হলো সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা, কিন্তু সমাজের পরিবর্তন বা উন্নয়নের প্রতি তাদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। এই ধরনের প্রশাসন সাধারণত কঠোর নিয়ম-নীতি এবং প্রথাগত কাঠামো অনুসরণ করে, যা সমাজের গতিশীলতাকে অনেক সময় বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে, পরিবর্তন বা নতুনত্বের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে এবং প্রশাসন তার চিরাচরিত রুটিনের বাইরে যেতে চায় না।
২। কাজের পদ্ধতি: সনাতন প্রশাসনের কাজের পদ্ধতি অত্যন্ত আমলাতান্ত্রিক এবং প্রথাগত। এখানে প্রতিটি কাজ একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ করে, যা অনেক সময় দীর্ঘসূত্রিতার কারণ হয়। ফাইল নড়াচড়া করতে অনেক সময় লাগে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। এই পদ্ধতিতে সৃজনশীলতা বা নতুনত্বের কোনো সুযোগ থাকে না, কারণ সবকিছুই পূর্বনির্ধারিত ছকের মধ্যে ঘটে। এর ফলে, জনগণের সমস্যা দ্রুত সমাধান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা আসে।
৩। জনগণের সম্পর্ক: সনাতন প্রশাসনে জনগণ এবং প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব বজায় থাকে। এই ধরনের প্রশাসনে জনগণ মূলত সেবাগ্রহীতা হিসেবে বিবেচিত হয়, যাদের সাথে প্রশাসনের সম্পর্ক অনেকটা আনুষ্ঠানিক। প্রশাসন নিজেদেরকে জনগণের শাসক বা নিয়ামক মনে করে এবং জনগণের অংশগ্রহণ বা মতামতকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এর ফলে, জনগণের চাহিদা ও সমস্যার সাথে প্রশাসনের কোনো সরাসরি সংযোগ থাকে না এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠে না।
৪। পরিবর্তন ও সংস্কার: সনাতন প্রশাসন সাধারণত পরিবর্তনকে ভয় পায় এবং সংস্কারের প্রতি তাদের তেমন আগ্রহ থাকে না। তারা মনে করে যে প্রচলিত নিয়ম-কানুনই সর্বোত্তম এবং তাতে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। নতুন কোনো প্রযুক্তি বা পদ্ধতির প্রবর্তন করা তাদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। এই মানসিকতার কারণে প্রশাসন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না এবং সমাজের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়। ফলে, সমাজ এগিয়ে গেলেও প্রশাসন পুরনো ধ্যান-ধারণা নিয়েই পড়ে থাকে।
৫। সিদ্ধান্ত গ্রহণ: সনাতন প্রশাসনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সাধারণত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। এখানে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তারা সাধারণত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তাদের কেবল উপরের নির্দেশ পালন করতে হয়। এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কাঠামোর কারণে অনেক সময় সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সম্পূর্ণ ধারণা থাকে না। এটি সামগ্রিক কাজের গতিকে ধীর করে দেয় এবং সৃজনশীল সমাধান খুঁজে বের করার সুযোগ সীমিত করে।
৬। জবাবদিহিতা: সনাতন প্রশাসনে জবাবদিহিতার বিষয়টি সাধারণত অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একজন কর্মকর্তা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে, কিন্তু জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতা তুলনামূলকভাবে কম। এর ফলে, স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায় এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের কাছে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। এতে করে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, যা জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে।
৭। মানবসম্পদ উন্নয়ন: সনাতন প্রশাসনে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এখানে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ মূলত নিয়ম-কানুন এবং প্রথাগত পদ্ধতি শেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। নতুন দক্ষতা অর্জন বা পেশাগত উন্নয়নের জন্য তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। এর ফলে, কর্মকর্তারা সময়ের সাথে নিজেদেরকে উন্নত করতে পারেন না এবং তাদের মধ্যে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ হ্রাস পায়। এটি সামগ্রিকভাবে প্রশাসনিক দক্ষতা কমিয়ে দেয়।
৮। উন্নয়নমুখী প্রশাসন: উন্নয়নমুখী প্রশাসন একটি আধুনিক এবং গতিশীল ধারণা যা সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে। এই ধরনের প্রশাসন শুধু আইন-কানুন বাস্তবায়ন করে না, বরং নতুন নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করে যা জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক। এখানে প্রশাসন জনগণের সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং তাদের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেয়। উন্নয়নমুখী প্রশাসন পরিবর্তন ও নতুনত্বকে স্বাগত জানায়, যা সমাজের অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
৯। উন্নয়নমুখী কাজের পদ্ধতি: উন্নয়নমুখী প্রশাসনে কাজের পদ্ধতি অনেক বেশি নমনীয় এবং সৃজনশীল। এখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করা হয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়। বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কাজের দক্ষতা বাড়ানো হয়। এটি জনগণের সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয় এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করে। এই পদ্ধতিটি প্রশাসনিক কাজের গতি এবং গুণগত মান বৃদ্ধি করে।
১০। উন্নয়নমুখী সম্পর্ক: উন্নয়নমুখী প্রশাসনে জনগণের সাথে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সহযোগিতামূলক। এখানে প্রশাসন জনগণের অংশীদার হিসেবে কাজ করে এবং তাদের মতামত ও অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। জনগণের চাহিদা ও সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন নীতি ও প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়। এটি জনগণের মধ্যে প্রশাসনের প্রতি আস্থা তৈরি করে এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে। এটি একটি অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন ব্যবস্থার জন্ম দেয়।
উপসংহার: সনাতন প্রশাসন এবং উন্নয়নমুখী প্রশাসনের মধ্যেকার পার্থক্য মূলত তাদের লক্ষ্য, পদ্ধতি এবং জনগণের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। সনাতন প্রশাসন যেখানে স্থবিরতা এবং প্রথাগত নিয়ম-কানুনের ওপর গুরুত্ব দেয়, সেখানে উন্নয়নমুখী প্রশাসন পরিবর্তন, গতিশীলতা এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করে। আধুনিক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য উন্নয়নমুখী প্রশাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করে না, বরং সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। তাই, একটি সফল ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটি উন্নয়নমুখী প্রশাসন অপরিহার্য।
১। 🎯 লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ২। 🎯 কাজের পদ্ধতি ৩। 🎯 জনগণের সম্পর্ক ৪। 🎯 পরিবর্তন ও সংস্কার ৫। 🎯 সিদ্ধান্ত গ্রহণ ৬। 🎯 জবাবদিহিতা ৭। 🎯 মানবসম্পদ উন্নয়ন ৮। 🎯 উন্নয়নমুখী প্রশাসন ৯। 🎯 উন্নয়নমুখী কাজের পদ্ধতি ১০। 🎯 উন্নয়নমুখী সম্পর্ক
১৯৮৩ সালে ভারতে ‘মণ্ডল কমিশন’ সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের সুপারিশ করে, যা সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল। এছাড়া, ২০০৫ সালে বাংলাদেশে ‘তথ্য অধিকার আইন’ পাস হয়, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৭০-এর দশকে সুইডেনে ‘ওম্বুডসম্যান’ প্রথা চালু হয়, যা জনগণের অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর নজরদারি করে। এসব ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ও জরিপগুলো প্রশাসনের আধুনিকীকরণ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়।

