- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- সভ্যতার সংকট কি?
Or, সভ্যতার সংকট কাকে বলে?
Or, সভ্যতার সংকটের সজ্ঞা দাও।
Or, সভ্যতার সংকট বলতে কি বুঝ?
উত্তর::ভূমিকা: মানব সভ্যতা দীর্ঘদিনের জ্ঞান, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু আধুনিক যুগে যুদ্ধ, নৈতিক অবক্ষয়, পরিবেশ ধ্বংস, বৈষম্য, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও মানবিক মূল্যবোধের সংকট সভ্যতার জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সভ্যতার এই অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকেই সভ্যতার সংকট বলা হয়।
সভ্যতার সংকটের পরিচয়:-
সভ্যতার সংকট হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে একটি সমাজ বা মানব সভ্যতার প্রচলিত মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো ও টিকে থাকার ভিত্তিগুলো বিভিন্ন কারণে হুমকির মুখে পড়ে। এটি শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সমস্যা নয়; বরং মানুষের চিন্তা, আচরণ, সম্পর্ক, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গভীর সংকট। যুদ্ধ, সহিংসতা, পরিবেশ বিপর্যয়, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও সামাজিক বৈষম্য সভ্যতার সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সভ্যতার সংকট- এর শাব্দিক অর্থ:- সভ্যতার সংকট শব্দটি ইংরেজি “Crisis of Civilization” শব্দের বাংলা রূপ। “Civilization” অর্থ হলো সভ্যতা বা উন্নত সামাজিক জীবনব্যবস্থা এবং “Crisis” অর্থ হলো সংকট, বিপদ বা অনিশ্চয়তা। অর্থাৎ সভ্যতার অস্তিত্ব, মূল্যবোধ ও উন্নয়নের ধারার ওপর যে গভীর সমস্যা বা হুমকি সৃষ্টি হয় তাকে সভ্যতার সংকট বলা হয়।
১। অ্যান্টোনিও গ্রামশি (Antonio Gramsci): সভ্যতার সংকট হলো এমন একটি অবস্থা, যখন পুরোনো মূল্যবোধ ও সামাজিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, কিন্তু নতুন ব্যবস্থা এখনও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। (“The old world is dying, and the new world struggles to be born; now is the time of monsters.”) এই ধারণা থেকে বোঝা যায় যে, সামাজিক পরিবর্তনের সময় মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
২। আর্নল্ড টয়েনবি (Arnold Toynbee): সভ্যতার সংকট সাধারণত তখন সৃষ্টি হয়, যখন একটি সভ্যতা নতুন চ্যালেঞ্জের কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। (“Civilizations die from suicide, not by murder.”) টয়েনবির মতে, সভ্যতার পতন অনেক সময় বাইরের আক্রমণের কারণে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কারণে ঘটে।
৩। ওসওয়াল্ড স্পেংলার (Oswald Spengler): সভ্যতা হলো সংস্কৃতির শেষ পর্যায়, যেখানে সৃজনশীলতা কমে গিয়ে যান্ত্রিকতা ও অবক্ষয় বৃদ্ধি পায়। (“Civilization is the inevitable destiny of culture.”) এই ধারণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত বস্তুবাদ ও মানবিক মূল্যবোধের ক্ষয় সভ্যতার সংকট তৈরি করতে পারে।
৪। হান্না আরেন্ট (Hannah Arendt): আধুনিক সভ্যতার সংকট তখন দেখা দেয়, যখন মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। (“The most radical revolutionary will become a conservative the day after the revolution.”) এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের গুরুত্ব তুলে ধরে।
৫। জিগমুন্ড বাউম্যান (Zygmunt Bauman): আধুনিক সমাজের অনিশ্চয়তা, পরিবর্তন ও সম্পর্কের দুর্বলতা সভ্যতার নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। (“Modernity means many things, but ambiguity is the only thing that does not mean.”) এই ধারণা আধুনিক জীবনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার দিকটি তুলে ধরে।
৬। নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky): আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ, পরিবেশ ধ্বংস ও সামাজিক বৈষম্য মানব সভ্যতার ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি সৃষ্টি করছে। (“The major crises facing humanity require global cooperation and collective action.”) এই ধারণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
৭। মহাত্মা গান্ধী (Mahatma Gandhi): আধুনিক সভ্যতার প্রকৃত উন্নয়ন কেবল বস্তুগত অগ্রগতিতে নয়, বরং নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর নির্ভরশীল। (“There is more to life than increasing its speed.”) এই বক্তব্য সভ্যতার মানবিক দিকের গুরুত্ব তুলে ধরে।
উপরের ধারণাগুলোর আলোকে বলা যায়, সভ্যতার সংকট হলো এমন একটি জটিল অবস্থা, যেখানে মানব সভ্যতার নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পরিবেশগত ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব বিভিন্ন ধরনের হুমকির সম্মুখীন হয়। এটি মানুষের উন্নয়ন ও টিকে থাকার পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার: সভ্যতার সংকট বর্তমান বিশ্বের একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সমস্যা। শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, শান্তি ও পরিবেশ রক্ষার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। একটি টেকসই ও মানবিক সভ্যতা গড়ে তুলতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।