- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সমাজকর্ম গবেষণা মানব সমাজের জটিল সমস্যাগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশ্লেষণ করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। এটি কেবল তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া, যা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নতুন পথের সন্ধান দেয়। সমাজকর্ম গবেষণা সমাজের অন্তর্নিহিত সমস্যা, যেমন – দারিদ্র্য, বৈষম্য, অপরাধ এবং অসুস্থতার কারণ ও প্রতিকার খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়া সমাজের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন এবং কার্যকর সমাধানের পথ প্রশস্ত করে।
শাব্দিক অর্থ: সমাজকর্ম শব্দের অর্থ হলো সমাজের কল্যাণে কাজ করা, আর গবেষণা শব্দের অর্থ হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান বা নতুন জ্ঞান আবিষ্কার করা। তাই, শাব্দিকভাবে, সমাজকর্ম গবেষণা হলো সমাজের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞান অনুসন্ধান করা।
সমাজকর্ম গবেষণা হলো একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সমাজের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়, সেই সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা হয় এবং সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়। এটি একটি সুসংগঠিত এবং নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি, যা সমাজের বিভিন্ন সমস্যার উপর আলোকপাত করে এবং সেই সমস্যার সমাধানের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদান করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানব কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সমাজকে আরও উন্নত করা।
যারা সমাজকর্ম গবেষণার সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাদের কয়েকটি সংজ্ঞা নিচে দেওয়া হলো। যারা সংজ্ঞা দেননি, তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
১। অক্সফোর্ড ডিকশনারি-এর মতে, গবেষণা হলো কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে নতুন তথ্য বা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য কোনো জ্ঞান বা ধারণার পদ্ধতিগত অধ্যয়ন। (Research is the systematic study of a topic or concept in order to discover new facts or conclusions.)
২। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস-এর মতে, গবেষণা হলো জ্ঞানের নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে অজানা তথ্য এবং ঘটনা আবিষ্কারের একটি পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা। (Research is a systematic effort to discover unknown facts and events in a particular field of knowledge.)
৩। ডি.পি. ওয়াল্ডো-এর মতে, গবেষণা হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে নতুন জ্ঞান আবিষ্কারের একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। (Research is a systematic process of discovering new knowledge about a specific topic by using scientific methods.)
৪। পলিন ভি. ইয়াং-এর মতে, গবেষণা হলো সুশৃঙ্খলভাবে কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা, যাতে নতুন জ্ঞান বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। (Research is the application of scientific methods in a systematic way to solve a particular problem, so that new knowledge or conclusions can be drawn.)
৫। পি.ভি. থমাস-এর মতে, সমাজকর্ম গবেষণা হলো সামাজিক পরিবেশের বিভিন্ন সমস্যা, কারণ ও সমাধানের জন্য বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। (Social work research is the scientific investigation of various problems, causes and solutions in a social environment.)
৬। সি. এ. মোজেস-এর মতে, গবেষণা হলো সমস্যার প্রকৃতি বোঝার জন্য তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা করার একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। (Research is a systematic process of collecting, analyzing, and interpreting data to understand the nature of a problem.)
৭। এ. কে. মিয়া-এর মতে, সমাজকর্ম গবেষণা হলো সুশৃঙ্খল জ্ঞান অর্জন এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে মানব জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। (Social work research is the systematic acquisition of knowledge and scientific investigation into various aspects of human life for the purpose of solving social problems.)
উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায় যে, সমাজকর্ম গবেষণা হলো সমাজের বিভিন্ন সমস্যা, যেমন – দারিদ্র্য, বেকারত্ব, এবং বৈষম্য সমাধানের জন্য একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়া, যা নতুন তথ্য ও জ্ঞানের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সাহায্য করে।
উপসংহার: সমাজকর্ম গবেষণা কেবল একটি শিক্ষণীয় বিষয় নয়, বরং মানব সমাজের উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। এটি সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে এবং সমস্যা সমাধানের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। সমাজকর্ম গবেষণা আমাদের সমাজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে এবং শক্তিশালীকরণে সহায়তা করে। এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, যা একটি উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে।
সমাজকর্ম গবেষণা হলো সমাজের সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত একটি ধারাবাহিক ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়া।
১৯৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সমাজকর্ম গবেষণার গুরুত্ব বাড়তে থাকে, এবং ১৯৫০-এর দশকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই বিষয়ে কাজ শুরু করে। এক জরিপে দেখা গেছে যে, ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ৬০% সমাজকর্মী তাদের কর্মক্ষেত্রে গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সমাজকর্ম গবেষণাকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করে তুলেছে, যা সমাজের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে সাহায্য করছে।

