- readaim.com
- 0
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে সমাজবিজ্ঞানকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। অগাস্ট কোঁতের পজিটিভিজম এবং হার্বার্ট স্পেন্সারের জৈবিক সাদৃশ্যের ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হলেও ডুর্খেইম সমাজকে অধ্যয়নের নিজস্ব পদ্ধতি এবং বিষয়বস্তু নির্ধারণে সক্ষম হন। সমাজের নৈতিক ভিত্তি, সামাজিক সংহতি এবং আধুনিক সমাজের সমস্যাগুলি নিয়ে তাঁর গভীর বিশ্লেষণ সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করে।
১.সমাজবিজ্ঞানের স্বতন্ত্র বিষয়বস্তু নির্ধারণ:- ডুর্খেইম সমাজবিজ্ঞানকে অন্যান্য বিজ্ঞান থেকে আলাদা করার জন্য “সামাজিক ঘটনা” (social facts) নামক একটি স্বতন্ত্র বিষয়বস্তু নির্ধারণ করেন। তাঁর মতে, সামাজিক ঘটনা হল চিন্তাভাবনার, অনুভূতির এবং কর্মের সেই ধরণ যা ব্যক্তির উপর বাহ্যিক চাপ সৃষ্টি করে এবং সমাজের সামগ্রিক কাঠামোর অংশ। এই ধারণা সমাজবিজ্ঞানকে মনস্তত্ত্ব বা জীববিদ্যা থেকে পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।
২.সামাজিক ঘটনা অধ্যয়নের পদ্ধতি:- ডুর্খেইম সামাজিক ঘটনা অধ্যয়নের জন্য বস্তুনিষ্ঠ এবং অভিজ্ঞতাবাদী পদ্ধতির উপর জোর দেন। তিনি মনে করতেন, সামাজিক ঘটনাকে বস্তুগত জিনিসের মতো পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা উচিত। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “দ্য রুলস অফ সোসিওলজিক্যাল মেথড” (১৮৯৫) এ তিনি সামাজিক ঘটনা অধ্যয়নের বিভিন্ন নিয়ম ও নীতি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন।
৩.শ্রম বিভাজন ও সামাজিক সংহতি:- ডুর্খেইমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল “দ্য ডিভিশন অফ লেবার ইন সোসাইটি” (১৮৯৩)। এই গ্রন্থে তিনি দেখান যে কিভাবে সরল সমাজের যান্ত্রিক সংহতি (mechanical solidarity), যেখানে মানুষ অভিন্ন মূল্যবোধ ও রীতিনীতির দ্বারা আবদ্ধ থাকে, আধুনিক জটিল সমাজের জৈবিক সংহতিতে (organic solidarity) রূপান্তরিত হয়, যা বিভিন্ন বিশেষায়িত কাজের উপর পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে।
৪.আত্মহত্যা তত্ত্ব:- ডুর্খেইমের “সুইসাইড” (১৮৯৭) গ্রন্থটি সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি পরিসংখ্যানগত উপাত্তের বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান যে আত্মহত্যা একটি ব্যক্তিগত ঘটনা হলেও এর মূলে সামাজিক কারণ বিদ্যমান। তিনি আত্মহত্যার চারটি প্রকারভেদ উল্লেখ করেন: আত্মকেন্দ্রিক (egoistic), পরার্থপর (altruistic), নৈরাজ্যিক (anomic) এবং নিয়তিবাদী (fatalistic) আত্মহত্যা।
৫.ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ:- ডুর্খেইমের “দ্য এলিমেন্টারি ফর্মস অফ রিলিজিয়াস লাইফ” (১৯১২) গ্রন্থে তিনি অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী সমাজের ধর্মীয় রীতিনীতির বিশ্লেষণের মাধ্যমে ধর্মের সামাজিক উৎস ও কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করেন। তিনি দেখান যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সমাজের সদস্যদের মধ্যে সামাজিক সংহতি ও অভিন্ন মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৬.নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব:- ডুর্খেইম মনে করতেন, আধুনিক সমাজে সামাজিক সংহতি বজায় রাখার জন্য একটি শক্তিশালী নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন। তিনি বিদ্যালয়কে নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছিলেন এবং শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক নিয়মকানুন ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার উপর জোর দেন।
৭.সামাজিক নৈরাজ্যের ধারণা:- ডুর্খেইম “অ্যানোমি” বা সামাজিক নৈরাজ্যের ধারণার প্রবর্তন করেন, যা আধুনিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। অ্যানোমি এমন একটি অবস্থা যেখানে সমাজের প্রচলিত নিয়মকানুন ও মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে যায় এবং ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণের অভাব দেখা দেয়, যা বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার জন্ম দেয়।
৮.সামাজিক নিয়ন্ত্রণ:- ডুর্খেইম সামাজিক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি মনে করতেন, সমাজ তার সদস্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে। এই নিয়ন্ত্রণ সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং Deviant behavior কমাতে সহায়ক।
৯.সমষ্টিগত চেতনার ধারণা:- ডুর্খেইম “সমষ্টিগত চেতনা” (collective consciousness) নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার প্রবর্তন করেন। এটি সমাজের সদস্যদের মধ্যে shared বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং রীতিনীতির সমষ্টি যা ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখে।
১০.পেশাগত নীতিশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা:- আধুনিক জটিল সমাজে বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার জন্য ডুর্খেইম পেশাগত নীতিশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, প্রতিটি পেশার নিজস্ব নৈতিক নিয়মকানুন থাকা উচিত যা সদস্যদের আচরণকে guide করবে।
ডুর্খেইম পরিবার, শিক্ষা, ধর্ম, অর্থনীতি এবং রাজনীতি সহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশ্লেষণ করেন। তিনি দেখান যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সমাজের সামগ্রিক কার্যকারিতায় কিভাবে অবদান রাখে এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
১২. অপরাধের সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা:- ডুর্খেইম অপরাধকে সমাজের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, অপরাধ সমাজের বিদ্যমান নিয়মকানুন ও মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করে এবং এর মাধ্যমে সমাজের সদস্যরা তাদের shared মূল্যবোধ সম্পর্কে পুনরায় সচেতন হয়। তবে তিনি অস্বাভাবিক মাত্রার অপরাধকে সামাজিক দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
১৩. সামাজিক পরিবর্তন অধ্যয়ন:- ডুর্খেইম সামাজিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি মনে করতেন, শ্রম বিভাজন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির মতো কারণগুলি সমাজের কাঠামো এবং সংহতির ধরণে পরিবর্তন আনতে পারে।
১৪. অভিজ্ঞতাবাদী গবেষণার উপর জোর:- ডুর্খেইম সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি অভিজ্ঞতাবাদী উপাত্তের ব্যবহারের উপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর “আত্মহত্যা” গ্রন্থটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে তিনি সরকারি পরিসংখ্যান ব্যবহার করে আত্মহত্যার সামাজিক কারণগুলি বিশ্লেষণ করেন।
১৫. সমাজবিজ্ঞানকে একটি একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা:- ডুর্খেইমের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই ফ্রান্সে এবং পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী সমাজবিজ্ঞান একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপনা শুরু করেন এবং জার্নাল প্রকাশনার মাধ্যমে এই বিষয়ের প্রসার ঘটান।
১৬. অগাস্ট কোঁতের প্রভাব:- ডুর্খেইম অগাস্ট কোঁতের পজিটিভিজম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং সমাজকে একটি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে অধ্যয়নের ধারণাকে সমর্থন করেছিলেন। তবে তিনি কোঁতের কিছু দার্শনিক ধারণার সমালোচনাও করেন।
১৭. হার্বার্ট স্পেন্সারের সমালোচনা:- ডুর্খেইম হার্বার্ট স্পেন্সারের জৈবিক সাদৃশ্যের ধারণার সমালোচনা করেন। তিনি মনে করতেন, সমাজ কেবল জৈবিক নিয়মের দ্বারা চালিত হয় না, এর নিজস্ব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও নিয়মকানুন রয়েছে।
১৮. সামাজিক বাস্তবতার ধারণা:- ডুর্খেইম “সামাজিক বাস্তবতা” (social reality) নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার প্রবর্তন করেন। তাঁর মতে, সমাজ ব্যক্তির বাইরে একটি স্বতন্ত্র বাস্তবতা যা ব্যক্তির চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করে।
১৯. আধুনিক সমাজের সংকট:- ডুর্খেইম আধুনিক সমাজের বিভিন্ন সংকট, যেমন নৈরাজ্য, বিচ্ছিন্নতা এবং নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, আধুনিক সমাজের সংহতি বজায় রাখার জন্য নতুন নৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন।
২০. সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের বিকাশ:- ডুর্খেইমের কাজ পরবর্তীকালের সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁর ধারণাগুলি প্রকার্যবাদ, কাঠামোবাদ এবং সামাজিক সংঘাত তত্ত্বের মতো বিভিন্ন তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে।
২১. দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব:- এমিল ডুর্খেইমের অবদান সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক স্থায়ী স্থান অধিকার করে আছে। তাঁর সামাজিক ঘটনা, সামাজিক সংহতি, আত্মহত্যা তত্ত্ব এবং ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আজও সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।:-
উপসংহার:- পরিশেষে বলা যায়, এমিল ডুর্খেইম সমাজবিজ্ঞানকে একটি বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন এবং সমাজের অন্তর্নিহিত নিয়ম ও প্রক্রিয়াগুলি উন্মোচন করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত ধারণা ও পদ্ধতিগুলি সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং আজও এই বিষয়ের অধ্যয়ন ও গবেষণায় অপরিহার্য।
এমিল ডুর্খেইম সমাজবিজ্ঞানের স্বতন্ত্র বিষয়বস্তু হিসেবে সামাজিক ঘটনাকে চিহ্নিত করেন এবং তা অধ্যয়নের জন্য বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতির উপর জোর দেন। তিনি শ্রম বিভাজন ও সামাজিক সংহতির ধারণা দেন এবং আত্মহত্যার সামাজিক কারণ ব্যাখ্যা করে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। ডুর্খেইম ধর্মের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেন এবং আধুনিক সমাজে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি সামাজিক নৈরাজ্য ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ধারণা প্রবর্তন করেন এবং সমষ্টিগত চেতনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। ডুর্খেইম পেশাগত নীতিশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশ্লেষণ করেন। তিনি অপরাধের সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন এবং সামাজিক পরিবর্তন অধ্যয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। ডুর্খেইম অভিজ্ঞতাবাদী গবেষণার উপর জোর দেন এবং সমাজবিজ্ঞানকে একটি একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অগাস্ট কোঁতের প্রভাব তাঁর চিন্তাভাবনায় দেখা গেলেও তিনি হার্বার্ট স্পেন্সারের সমালোচনা করেন এবং সামাজিক বাস্তবতার ধারণা দেন। ডুর্খেইম আধুনিক সমাজের সংকট নিয়ে আলোচনা করেন এবং সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেন।
এমিল ডুর্খেইম ১৮৫৮ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯১৭ সালে মারা যান। তিনি বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৮৮৭) এবং পরে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯০২) সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ১৮৯৮ সালে তিনি “ল’আন্নে সোসিওলজিক” (L’Année Sociologique) নামে একটি প্রভাবশালী সমাজতাত্ত্বিক জার্নাল প্রতিষ্ঠা করেন, যা সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডুর্খেইমের কাজ মূলত ফরাসি সমাজের উপর ভিত্তি করে হলেও, তাঁর তত্ত্বগুলি বিশ্বব্যাপী সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বিংশ শতাব্দীর সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি আজও সমাদৃত।

