- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সমাজবিজ্ঞান কি? এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা ও এর মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। সমাজবিজ্ঞান হলো সমাজ, মানুষের আচরণ এবং সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে অধ্যয়নের বিজ্ঞান। মানুষের সমাজ কীভাবে গঠিত হয়, এর বিভিন্ন অংশ কীভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত, এবং সমাজ কীভাবে সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়, এসব কিছু নিয়েই সমাজবিজ্ঞান গবেষণা করে। এটি আমাদের নিজেদের সমাজকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
শাব্দিক অর্থ: সমাজবিজ্ঞান (Sociology) শব্দটি দুটি ভিন্ন ভাষার শব্দ থেকে এসেছে: একটি হলো ল্যাটিন শব্দ ‘socius’ যার অর্থ সঙ্গী বা সহচর, এবং অন্যটি হলো গ্রিক শব্দ ‘logos’ যার অর্থ জ্ঞান বা বিজ্ঞান। এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে সমাজবিজ্ঞানের আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় সমাজের বিজ্ঞান। অর্থাৎ, সমাজবিজ্ঞান হলো সেই বিজ্ঞান যা সমাজের বিভিন্ন দিক, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গবেষণা করে।
উপরে উল্লিখিত অনেক গবেষক সরাসরি সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দেননি, বরং তারা সমাজ বা রাষ্ট্র সম্পর্কিত অন্য কোনো শাখায় কাজ করেছেন। তবে, যারা সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিয়েছেন তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন:
১। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte): তিনি সমাজবিজ্ঞানের জনক হিসেবে পরিচিত। তার মতে, “সমাজবিজ্ঞান হলো সামাজিক শৃঙ্খলা ও প্রগতির বিজ্ঞান।” (Sociology is the science of social order and progress.)
২।এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): তিনি বলেন, “সমাজবিজ্ঞান হলো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিজ্ঞান।” (Sociology is the science of social institutions.)
৩। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): তাঁর মতে, “সমাজবিজ্ঞান হলো সেই বিজ্ঞান যা সামাজিক কার্যকলাপের ব্যাখ্যামূলক অনুধাবন করতে চায়, যাতে এর কার্যকারণগত ফলাফল ব্যাখ্যা করা যায়।” (Sociology is a science which attempts the interpretative understanding of social action in order thereby to arrive at a causal explanation of its course and effects.)
৪। অগবার্ন (Ogburn) এবং নিমকফ (Nimkoff): তাদের মতে, “সমাজবিজ্ঞান হলো সামাজিক জীবন নিয়ে বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন।” (Sociology is the scientific study of social life.)
৫। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অক্সফোর্ড ডিকশনারির মতে, “সমাজবিজ্ঞান হলো মানুষের সমাজ, সামাজিক সম্পর্ক, এবং প্রতিষ্ঠানগুলির অধ্যয়ন।” (Sociology is the study of the development, structure, and functioning of human society.)
৬। কার্ল মার্কস (Karl Marx): তিনি সরাসরি সংজ্ঞা না দিলেও তার গবেষণা সমাজের শ্রেণী সংঘাত এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর জোর দেয়, যা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার কাজকে “সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ক বিজ্ঞান” হিসেবে দেখা যায়।
৭। এল. ডি. হোয়াইট (L. D. White): তিনি সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দেননি, তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও জনপ্রশাসনের ক্ষেত্রে তার অবদান রয়েছে।
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি, সমাজবিজ্ঞান হলো সমাজের বিজ্ঞানসম্মত অধ্যয়ন, যা সমাজের গঠন, মানুষের আচরণ, সামাজিক পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেমন পরিবার, রাষ্ট্র, ধর্ম, এবং অর্থনীতির মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে।
উপসংহার: সমাজবিজ্ঞান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ এটি সমাজের বিভিন্ন সমস্যার উৎস ও কারণ খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা আমাদের সামাজিক সম্পর্ক, অসমতা, সংঘাত এবং পরিবর্তন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দেয়। এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে, যা একটি উন্নত ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ গঠনে সহায়ক হতে পারে।
সমাজবিজ্ঞান হলো সমাজের বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ, যা সামাজিক জীবনের বিভিন্ন দিককে বুঝতে সাহায্য করে।
১৯ শতকে শিল্প বিপ্লবের পরে ইউরোপে সমাজবিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। ১৮৩৮ সালে ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ প্রথম ‘Sociology’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে এমিল ডুর্খেইম ফরাসি সমাজবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং ১৮৯৫ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Rules of Sociological Method’ প্রকাশ করেন। সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রায়শই বিভিন্ন জরিপ ও পরিসংখ্যান ব্যবহৃত হয়। যেমন, ১৯২৫ সালে শিকাগো স্কুল অফ সোসিওলজি ‘শহুরে জীবন’ নিয়ে প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলো পরিচালনা করে।

