- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: রাষ্ট্র ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে রাষ্ট্র যেমন শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, সে তার নিজের টিকে থাকার স্বার্থে তেমনই অর্থনৈতিক বা সম্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। প্লেটো, এরিস্টটল থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্স পর্যন্ত সকল মনীষী স্বীকার করেছেন যে, সরকারি ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও চরিত্র মূলত নির্ধারিত হয় তার সম্পত্তি ব্যবস্থার সুরক্ষার ওপর ভিত্তি করে।
১। পুঁজিবাদী সরকার: এই শাসনব্যবস্থা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো এমন আইন প্রণয়ন করে যাতে ধনীক শ্রেণী তাদের সম্পদ অবাধে বৃদ্ধি করতে পারে। এখানে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তিগত মালিকানা রক্ষার জন্য বিচার বিভাগ অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা পালন করে। পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষা করাই এই সরকারের মূল লক্ষ্য থাকে।
২। সমাজতান্ত্রিক সরকার: এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র উৎপাদন ও বণ্টনের সকল উপায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন করে তোলে। তারা বিশ্বাস করে যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি সমাজে বৈষম্য ও শোষণের জন্ম দেয়। তাই এই সরকার রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণকে তাদের প্রধান পবিত্র দায়িত্ব মনে করে।
৩। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা: মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই ছিল ভূমির ওপর লর্ড বা সামন্তপ্রভুদের একচ্ছত্র অধিকার। এই সরকারগুলো সাধারণ কৃষক বা ভূমিদাসদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করত যাতে প্রভুদের জমির মালিকানা অক্ষুণ্ণ থাকে। সামন্ত রাজারা আইন ও সৈন্যবাহিনী ব্যবহার করে এই সম্পত্তি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখত। ভূমিহীনদের শোষণ করাই ছিল এই ব্যবস্থার মূল চরিত্র।
৪। গণতান্ত্রিক শাসন: গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় জনগণের ব্যক্তিগত সম্পত্তির আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক সম্পত্তি ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। রাষ্ট্র নাগরিকদের সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে কর ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীদের সম্পত্তি থেকে অংশ নিয়ে দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। আইন সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে চেষ্টা করে।
৫। ফ্যাসিবাদী শক্তি: ফ্যাসিবাদী বা একনায়কতান্ত্রিক সরকারগুলো বাহ্যিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্বীকার করলেও পরোক্ষভাবে সবকিছু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখে। তারা পুঁজিপতিদের সম্পত্তি রক্ষা করে ঠিকই, তবে তা হতে হয় সরকারের আজ্ঞাবহ। যদি কোনো ব্যবসায়ী বা সম্পত্তির মালিক সরকারের বিরোধিতা করে, তবে রাষ্ট্র তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেয়। এখানে সম্পত্তি ব্যবস্থা টিকে থাকে শাসকের ইচ্ছার ওপর।
৬। অভিজাততান্ত্রিক রূপ: যখন কোনো রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা গুটি কয়েক ধনবান বা উচ্চবংশীয় মানুষের হাতে থাকে, তখন তাকে অভিজাততন্ত্র বলে। এই ধরনের সরকার স্বাভাবিকভাবেই এমন নীতি গ্রহণ করে যা তাদের নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থ ও বিশাল সম্পত্তিকে সুরক্ষিত রাখে। সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক অধিকারকে এখানে চরমভাবে খর্ব করা হয়। করের বোঝা সর্বদা দরিদ্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
৭। স্বৈরাচারী শাসন: স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থায় শাসকের ক্ষমতা থাকে অসীম এবং আইন থাকে তার পকেটে। এই ধরনের সরকার সাধারণত নিজেদের অনুগত গোষ্ঠী ও চামচাদের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি গড়ে তোলার সুযোগ করে দেয়। তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা করে। সাধারণ মানুষের সম্পত্তির কোনো আইনি নিরাপত্তা এই ব্যবস্থায় থাকে না।
৮। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র: আধুনিক কল্যাণকামী সরকারগুলো মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও সম্পত্তির সুষম বণ্টনে বিশ্বাসী। তারা একদিকে যেমন ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সম্পত্তিকে উৎসাহিত করে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও সচল রাখে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ধনীদের ওপর উচ্চহারে প্রগতিশীল কর ধার্য করা হয়। সম্পদের চরম কেন্দ্রীভবন রোধ করাই এই সরকারের লক্ষ্য।
৯। রাজতান্ত্রিক কাঠামো: ঐতিহ্যবাহী রাজতন্ত্রে সমগ্র রাজ্যের জমি ও সম্পদের প্রকৃত মালিক ধরা হতো স্বয়ং রাজাকে। রাজা তার ইচ্ছানুযায়ী অনুগত অমাত্য বা সেনাপতিদের মাঝে জমি বণ্টন করে দিতেন। এই সম্পত্তি ব্যবস্থা রাজপরিবারের শৌর্য-বীর্য ও ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ডিজাইন করা হতো। প্রজাদের সম্পত্তির অধিকার ছিল সম্পূর্ণভাবে রাজার দয়ার ওপর নির্ভরশীল।
১০। সামরিক জান্তা: সামরিক বাহিনী যখন কোনো দেশের ক্ষমতা দখল করে, তখন তারা দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তারা এমন সব অধ্যাদেশ জারি করে যা সামরিক কর্মকর্তা ও তাদের ব্যবসায়ী বন্ধুদের সম্পত্তিকে আইনি সুরক্ষা দেয়। রাষ্ট্রীয় বাজেট ও বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করাই তাদের মূল লক্ষ্য থাকে। এই ব্যবস্থায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না।
১১। ইসলামী রাষ্ট্র: ইসলামী শাসনব্যবস্থা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও সম্পদের আমানতদারিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই সরকার ব্যবস্থার অধীনে ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্বীকৃত, তবে তা অর্জনের উপায় হতে হয় সম্পূর্ণ বৈধ বা হালাল। যাকাত ও ওশর ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীদের সম্পদ দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মজুদদারি বা সুদভিত্তিক সম্পত্তি অর্জনকে এই সরকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে।
১২। ঔপনিবেশিক শাসন: বিদেশী শক্তি যখন কোনো দেশ দখল করে শাসন করে, তখন তাকে ঔপনিবেশিক সরকার বলে। এই সরকারের মূল উদ্দেশ্য থাকে বিজিত অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ নিজেদের মূল দেশে পাচার করা। তারা এমন সম্পত্তি ব্যবস্থা ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে যা তাদের রাজস্ব আদায়কে নিশ্চিত করে। স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়াই ছিল এদের নীতি।
১৩। নয়া-উদারতাবাদী সরকার: বর্তমান বিশ্বের অনেক সরকার নয়া-উদারতাবাদী অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করে তাদের শাসন পরিচালনা করছে। এই সরকারগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারীকরণ করে এবং বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব নেয়। তারা মুক্ত বাণিজ্য ও পুঁজির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে আইন সংশোধন করে। শ্রমিকের অধিকারের চেয়ে পুঁজির নিরাপত্তা এখানে অনেক বেশি গুরুত্ব পায়।
১৪। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ: কোনো কোনো রাষ্ট্রে নির্বাচিত প্রতিনিধি অপেক্ষা প্রশাসনিক আমলাদের কর্তৃত্ব অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই আমলাতান্ত্রিক সরকারগুলো লাইসেন্স রাজ ও পারমিট ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ করে। তারা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সিংহভাগ ভোগ করার জন্য জটিল আইনি কাঠামো তৈরি করে। সাধারণ মানুষের জন্য সম্পদ অর্জন করা এখানে অত্যন্ত আমলাতান্ত্রিক ও কঠিন।
১৫। ধনতান্ত্রিক রূপান্তর: যেসব রাষ্ট্র সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদের দিকে ধাবিত হয়, তাদের সরকার দ্রুত নতুন সম্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলে। তারা পূর্বের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিগুলোকে পানির দরে বেসরকারি খাতে বা নিজেদের পছন্দের লোকদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এই পরিবর্তনের সময় সমাজে এক নতুন ধনী শ্রেণীর জন্ম হয় যারা সরকারকে টিকিয়ে রাখে। রাশিয়ার ‘অলিগার্ক’ শ্রেণী এর একটি বড় উদাহরণ।
১৬। আদিম সাম্যবাদ: মানব ইতিহাসের শুরুতে যখন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সরকার ছিল না, তখন সম্পত্তি ছিল যৌথ। গোত্রের প্রধান বা প্রবীণদের নিয়ে গঠিত আদিম সরকার ব্যবস্থা এই যৌথ মালিকানাকেই রক্ষা করত। শিকার করা খাদ্য বা চারণভূমি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং কেউ তা ব্যক্তিগতভাবে দখল করতে পারত না। সরকারের কাজই ছিল গোত্রের সবার যৌথ অধিকার নিশ্চিত করা।
১৭। উন্নয়নকামী রাষ্ট্র: যেসব দেশের সরকার দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায়, তারা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করে। এই রাষ্ট্রগুলো শিল্পপতি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সম্পত্তি ব্যবস্থা ও কর অবকাশ সুবিধা প্রদান করে। দেশের কৃষিজমি বা সাধারণ মানুষের জমি অধিগ্রহণ করে তা শিল্পকারখানার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে এখানে সম্পত্তির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্পত্তি ব্যবস্থার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। কোনো সরকারই তার আদর্শিক ও কাঠামোগত ভিত্তির বাইরের কোনো সম্পত্তি ব্যবস্থাকে প্রশ্রয় দেয় না। মূলত, সরকার যেভাবে গঠিত হয় এবং যাদের সমর্থনে টিকে থাকে, তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সম্পত্তি রক্ষা করাই রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সম্পত্তি ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়ী পরিবর্তন অসম্ভব।