- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তাত্ত্বিকভাবে আইনসভা অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে আইনসভার ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং শাসন বিভাগের ক্ষমতা একচেটিয়াভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে ‘আইনসভার Decline’ বা পতন বলা হয়। এই ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
ক্ষমতা পরিবর্তনের মূল কারণসমূহ
১। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র: আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ কেবল পুলিশি রাষ্ট্র নয়, বরং লোককল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করে। জনগণের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আইনসভার দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার চেয়ে শাসন বিভাগের দ্রুত পদক্ষেপ এক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। ফলে শাসন বিভাগের পরিধি ও ক্ষমতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
২। জরুরি পরিস্থিতি: যুদ্ধ, মহামারি, অর্থনৈতিক মন্দা বা অভ্যন্তরীণ যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। আইনসভার অধিবেশন ডেকে, দীর্ঘ বিতর্ক ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে অনেক সময় পার হয়ে যায়। এই প্রশাসনিক ধীরগতি এড়াতে শাসন বিভাগ একাই দ্রুত অধ্যাদেশ বা ডিক্রি জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে শাসন বিভাগের ওপর রাষ্ট্রের নির্ভরতা অনেক বাড়ে।
৩। দলীয় শৃঙ্খলা: আধুনিক দলীয় ব্যবস্থায় কঠোর দলীয় অনুশাসন বা ‘উইপ’ (Whip) বজায় রাখা হয়। আইনসভার সদস্যরা নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট বা মতামত দিতে পারেন না। যেহেতু শাসন বিভাগের প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হন, তাই তিনি আইনসভাকে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। দলীয় শৃঙ্খলার কারণে আইনসভা মূলত শাসন বিভাগের রবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়।
৪। প্রতিনিধিত্বমূলক আইন: আধুনিক যুগে রাষ্ট্রের কাজের পরিধি ও জটিলতা এতটাই বেড়েছে যে আইনসভার পক্ষে সব আইনের খুঁটিনাটি তৈরি করা সম্ভব হয় না। তাই আইনসভা কেবল আইনের একটি সাধারণ রূপরেখা পাস করে এবং বিস্তারিত নিয়মকানুন তৈরির দায়িত্ব শাসন বিভাগের ওপর ছেড়ে দেয়। শাসন বিভাগের এই আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে ‘অর্পিত ক্ষমতাপ্রসূত আইন’ বলা হয়, যা তাদের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৫। বিশেষজ্ঞের অভাব: আইনসভার সদস্যরা সাধারণত জনগণের প্রতিনিধি এবং তারা সব বিষয়ে টেকনিক্যাল বা কারিগরি বিশেষজ্ঞ নন। অন্যদিকে শাসন বিভাগের অধীনে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষিত আমলারা স্থায়ীভাবে কাজ করেন। বাজেট তৈরি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা পারমাণবিক নীতির মতো জটিল বিষয়ে আইনপ্রণেতারা আমলাদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। এই কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি আইনসভাকে দুর্বল করে দেয়।
৬। পররাষ্ট্র নীতি: একটি দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং কূটনীতি পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব শাসন বিভাগের হাতে ন্যস্ত থাকে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দেশের স্বার্থ রক্ষা করার কাজটি এককভাবে শাসন বিভাগই করে। আইনসভা সাধারণত এই সমস্ত চুক্তি বা বৈদেশিক সিদ্ধান্তের ওপর কেবল আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয় মাত্র। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শাসন বিভাগই প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
৭। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন ও কর ধার্যের খসড়া মূলত শাসন বিভাগের অর্থ মন্ত্রণালয় তৈরি করে। কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ হবে এবং কীভাবে রাজস্ব আদায় হবে, তার মূল পরিকল্পনা আমলা ও মন্ত্রীরাই করেন। আইনসভায় বাজেট নিয়ে আলোচনা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে শাসন বিভাগের প্রস্তাবই হুবহু পাস হয়ে যায়। ফলে রাষ্ট্রের অর্থ তহবিলের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ শাসন বিভাগের হাতেই চলে যায়।
৮। মিডিয়ার ভূমিকা: বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে টেলিভিশন, রেডিও এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো শাসন বিভাগের প্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডকে বেশি ফোকাস করে। জনগণের কাছে শাসন বিভাগের নেতাদের বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত সরাসরি পৌঁছে যায়, যা তাদের জনপ্রিয় করে তোলে। এর তুলনায় আইনসভার দীর্ঘ ও একঘেয়ে বিতর্ক মিডিয়াতে কম গুরুত্ব পায়। মিডিয়ার এই প্রচার ক্ষমতার ভারসাম্য শাসন বিভাগের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়।
৯। নেতৃত্বের প্রাধান্য: আধুনিক রাজনীতি মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা নেতৃত্বপ্রধান হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ কোনো দলের সামগ্রিক নীতি দেখার চেয়ে একজন ক্যারিশম্যাটিক বা প্রভাবশালী নেতার দিকে তাকিয়ে ভোট দেয়। নির্বাচনে জয়ী হয়ে সেই নেতা যখন শাসন বিভাগের প্রধান হন, তখন তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অপরিসীম থাকে। এই বিপুল জনসমর্থনের সামনে আইনসভার সাধারণ সদস্যরা তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না।
১০। স্থায়ী আমলাতন্ত্র: শাসন বিভাগের মূল চালিকাশক্তি হলো স্থায়ী আমলাতন্ত্র, যারা বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। আইনসভার সদস্যরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য আসেন এবং চলে যান, কিন্তু আমলারা স্থায়ীভাবে থেকে যান। এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে আমলারা যেকোনো পলিসি তৈরিতে মূল ভূমিকা রাখেন। ফলে আমলাতন্ত্রের আড়ালে শাসন বিভাগই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
১১। পরিকল্পনা প্রণয়ন: দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিকী বা দশকভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হয়। এই সমস্ত জটিল ও দূরদর্শী পরিকল্পনা তৈরির জন্য শাসন বিভাগের অধীনে আলাদা পরিকল্পনা কমিশন বা থিংক ট্যাংক থাকে। আইনসভার পক্ষে নিজে থেকে এমন বড় কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা অসম্ভব। তারা শুধু শাসন বিভাগের তৈরি করা পরিকল্পনায় সম্মতি প্রদান করে মাত্র।
১২। বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা: অনেক দেশে আইনসভার তৈরি করা কোনো আইন যদি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে বিচার বিভাগ তা বাতিল করে দিতে পারে। কিন্তু শাসন বিভাগের দৈনন্দিন প্রশাসনিক আদেশ বা নীতিমালার ওপর বিচার বিভাগের এই নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কম কার্যকর হয়। বিচার বিভাগের এই পর্যালোচনার ক্ষমতার কারণে আইনসভা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপে থাকে। এটি আইনসভার সার্বভৌমত্বকে কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করে।
১৩। অধ্যাদেশ জারি: যখন আইনসভার অধিবেশন বন্ধ থাকে, তখন দেশের প্রয়োজনে শাসন বিভাগের প্রধান বিশেষ আদেশ বা অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। এই অধ্যাদেশের কার্যকারিতা আইনসভার সাধারণ আইনের মতোই শক্তিশালী হয়ে থাকে। পরবর্তীতে আইনসভা সচল হলে এটি অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়, যা মূলত একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এই অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা শাসন বিভাগকে আইনসভার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়।
১৪। বিশাল কাজের পরিধি: আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব বিষয়ে সরকারের নজর রাখতে হয়। বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ রক্ষা, মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা পর্যন্ত কাজের পরিধি বিশাল। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করার মতো জনবল ও সাংগঠনিক কাঠামো কেবল শাসন বিভাগেরই আছে। কাজের এই বিশালতার কারণে শাসন বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি আইনসভাকে ছাড়িয়ে গেছে।
১৫। জনগণের প্রত্যাশা: বর্তমান যুগের নাগরিকরা যেকোনো সমস্যার সমাধানের জন্য সরাসরি সরকারের নির্বাহী বিভাগ বা মন্ত্রীদের কাছে দাবি জানায়। রাস্তাঘাট নির্মাণ, চাকরি কিংবা স্থানীয় সমস্যার সমাধানে মানুষ আইনপ্রণেতাদের চেয়ে শাসন বিভাগের কর্মকর্তাদের বেশি কার্যকর মনে করে। জনগণের এই মানসিকতা ও অতি-নির্ভরতা শাসন বিভাগের কর্মকর্তাদের কাজের পরিধি এবং সামাজিক ক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেয়।
১৬। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র পরিচালনা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং তথ্যপ্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে শাসন বিভাগের প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে। এই সমস্ত স্পর্শকাতর ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আইনসভার সাধারণ সদস্যদের নাগালের বাইরে থাকে। প্রযুক্তির এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের সুবিধা শাসন বিভাগকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অঙ্গে পরিণত করতে সাহায্য করে।
১৭। দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা: সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় শাসন বিভাগ গঠিতই হয় আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন নিয়ে। ফলে শাসন বিভাগ আইনসভায় যা বিল বা প্রস্তাব উত্থাপন করে, তা পাস হওয়া প্রায় নিশ্চিত থাকে। আইনসভার বিরোধী দল কেবল বিতর্ক ও সমালোচনা করতে পারে, কিন্তু বিল পাস হওয়া ঠেকাতে পারে না। এই নিশ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা শাসন বিভাগকে আইনসভার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে সাহায্য করে।
১৮। আইনসভার অধিবেশনের সীমাবদ্ধতা: আইনসভার অধিবেশন বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এবং স্বল্প মেয়াদের জন্য বসে। এই অল্প সময়ের মধ্যে দেশের হাজারো সমস্যার সমাধান বা আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে শাসন বিভাগ বছরের ৩৬৫ দিনই চব্বিশ ঘণ্টা সক্রিয় থাকে এবং প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করে। এই সময়ের সীমাবদ্ধতা আইনসভাকে দুর্বল করে এবং শাসন বিভাগকে নিরবচ্ছিন্ন ক্ষমতার অধিকারী করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিক যুগের জটিলতা এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের চাহিদা পূরণের তাগিদেই শাসন বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আইনসভার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার অর্থ এই নয় যে আইনসভা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। বরং সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাব রোধ করতে এবং জনগণের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইনসভার অস্তিত্ব ও গুরুত্ব আজও অনস্বীকার্য।