- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মানুষ সামাজিক জীব, কিন্তু কখনো কখনো ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠীগত বিভেদ সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করে। এই বিভক্তির অন্যতম একটি রূপ হলো সম্প্রদায়িকতা। এটি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কেই নয়, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক স্তরেও সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রদায়িকতা কেন তৈরি হয়, এর ফলাফল কী—এগুলো বুঝতে পারলেই আমরা একটি সহনশীল সমাজ গঠনে এগিয়ে যেতে পারব।
শাব্দিক অর্থ: সম্প্রদায়িকতা শব্দটি ‘সম্প্রদায়’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ কোনো বিশেষ ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠী। সম্প্রদায়িকতা হলো কোনো একটি গোষ্ঠীর স্বার্থকে অন্যদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার মনোভাব বা আচরণ।
পরিচয়:-
সম্প্রদায়িকতা হলো এমন একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে মানুষ শুধু নিজের ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। এটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, বৈষম্য এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টির মূল কারণ।আমরা সাধারণত মনে করি, সম্প্রদায়িকতা মানে হলো কোনো একটি গোষ্ঠী নিজেদেরকে আলাদা ভাবে এবং অন্যদের সাথে শত্রুতা রাখে। যেমন, কেউ যদি শুধু নিজের ধর্মের লোকদের সাহায্য করে এবং অন্য ধর্মের মানুষদের অবহেলা করে, তা সম্প্রদায়িকতার উদাহরণ।
১. ড. আহমদ শরীফ বলেছেন, “সম্প্রদায়িকতা হলো সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত স্বার্থে অন্ধ বিশ্বাস, যা সমাজে বিভেদ ও বিদ্বেষ ছড়ায়।” (“Communalism is blind allegiance to narrow group interests, spreading division and hatred in society.”)
২. মহাত্মা গান্ধী এর মতে, “সম্প্রদায়িকতা হলো মানবতার শত্রু, যা মানুষকে মানুষ থেকে আলাদা করে।” (“Communalism is the enemy of humanity, dividing man from man.”)
৩. বি.আর. আম্বেদকর বলেন, “সম্প্রদায়িকতা শুধু ধর্মীয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারও বটে।” (“Communalism is not just religious; it is also a political tool.”)
৪. অধ্যাপক রোমিলা থাপার (ইতিহাসবিদ) এর সংজ্ঞায়, “সম্প্রদায়িকতা হলো ইতিহাসকে বিকৃত করে গোষ্ঠীগত শত্রুতা তৈরি করা।” (“Communalism is distorting history to create group hostilities.”)
৫. এডওয়ার্ড সাইদ বলেছেন, “সম্প্রদায়িকতা ‘আমরা’ ও ‘তারা’ এই বিভেদকে চিরস্থায়ী করে।” (“Communalism perpetuates the divide between ‘us’ and ‘them’.”)
৬. ইরফান হাবিব (ঐতিহাসিক) এর মতে, “সম্প্রদায়িকতা হলো সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।” (“Communalism is a threat to social justice and democracy.”)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, সম্প্রদায়িকতা হলো কোনো বিশেষ ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য ও বিদ্বেষ পোষণ করা, যা সমাজে বিভেদ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
সমাপ্ত: সম্প্রদায়িকতা সমাজের জন্য একটি বিষের মতো কাজ করে। এটি শান্তি, সম্প্রীতি এবং উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। আমাদের উচিত সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত চিন্তা পরিহার করে মানবতা ও সহনশীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া। শুধু তখনই আমরা একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
“সম্প্রদায়িকতা হলো কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ।”
২০২০ সালের “পিউ রিসার্চ সেন্টার” এর জরিপ অনুযায়ী, ভারতে ৬৫% মানুষ মনে করেন সম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে “আইডিএস” পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০% যুবক সম্প্রদায়িকতাকে সমাজের বড় সমস্যা বলে মনে করে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় সম্প্রদায়িক সহিংসতা লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গা এবং ২০১৯ সালের দিল্লি দাঙ্গা সম্প্রদায়িকতার ভয়াবহ উদাহরণ। জাতিসংঘের মতে, বিশ্বজুড়ে ৭৫% সহিংসতার পেছনে সম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কাজ করে।

