- readaim.com
- 0
উত্তর।।মুখবন্ধ: জ্যাঁ-জ্যাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) ফরাসি বিপ্লবের সময়কার এক প্রভাবশালী দার্শনিক। তার রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন, বিশেষ করে “সামাজিক চুক্তি” (Social Contract) ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেছে। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিফলন এবং এর বাইরে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ থাকতে পারে না। তার এই দর্শনের কারণে অনেকে তাকে সর্বাত্নকবাদী বা টোটালিটারিয়ান দার্শনিক হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। এই নিবন্ধে রুশোর চিন্তাভাবনা এবং তাকে কেন সর্বাত্নকবাদী বলা হয়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
রুশোর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (General Will)। তিনি মনে করতেন, একটি সমাজের সব মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছা থেকেই এই সাধারণ ইচ্ছা তৈরি হয়। এই ইচ্ছা হলো সমাজের কল্যাণের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ, যা সবার ব্যক্তিগত ইচ্ছার সমষ্টি নয়, বরং তার চেয়েও উচ্চতর কিছু। রুশো বিশ্বাস করতেন, এই সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ হলো আইন, যা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
রুশোর দর্শনের এই দিকটিই তাকে সর্বাত্নকবাদী হিসেবে তুলে ধরে। কারণ তিনি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও স্বাধীনতাকে পুরোপুরি ত্যাগ করে সাধারণ ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করবে। রুশো বলেছেন, “যে কেউ সাধারণ ইচ্ছাকে মানতে অস্বীকৃতি জানাবে, তাকে পুরো সমাজ বল প্রয়োগ করে তা মানতে বাধ্য করবে।” এই কথাটি থেকেই বোঝা যায়, রুশো ব্যক্তি স্বাধীনতার চেয়ে সমাজের সম্মিলিত ইচ্ছাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
রুশো আরও মনে করতেন যে, সমাজের সাধারণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো ভিন্ন মতের বা বিরোধী দলের কোনো স্থান নেই। তার মতে, সাধারণ ইচ্ছা যখন প্রকাশিত হয়, তখন সবারই তা মানা উচিত। কারণ এই ইচ্ছা সবার সম্মিলিত কল্যাণের জন্য গঠিত হয়। এই কারণে, তার দর্শনে একনায়কতন্ত্রের একটি ছায়া দেখা যায়। সমালোচকরা মনে করেন, রুশোর এই ধারণা পরবর্তীকালে অনেক স্বৈরাচারী শাসককে জনগণের নামে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
উপসংহার: রুশো তার সামাজিক চুক্তি মতবাদের মাধ্যমে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছিলেন, যা জনগণের সার্বিক কল্যাণের উপর ভিত্তি করে গঠিত হবে। কিন্তু তার ‘সাধারণ ইচ্ছা’ এবং এর প্রতি আনুগত্যের যে কঠোর আহ্বান, তা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করে এক সর্বাত্নকবাদী রাষ্ট্রের ধারণাকে জন্ম দিয়েছে। তাই রুশোর দর্শন একদিকে যেমন জনকল্যাণের কথা বলে, অন্যদিকে তা এক কঠোর নিয়ন্ত্রিত সমাজের চিত্রও তুলে ধরে।
রুশো ১৭৬২ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ “সামাজিক চুক্তি” প্রকাশ করেন। ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) সময় এই গ্রন্থটি জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। রুশোর দর্শন অনুযায়ী, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কোনো রাজা বা শাসক নয়, বরং জনগণের হাতেই থাকা উচিত। এটি আধুনিক গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে তার চিন্তাভাবনার কঠোরতা নিয়ে এখনো বিতর্ক চলে।

