- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা:- মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সমাজের এক চিরন্তন বাস্তবতা। জন্মলগ্ন থেকে জীবনের প্রতিটি স্তরে এই ভেদাভেদ নানা রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বয়স, লিঙ্গ এবং জাতিতত্ত্ব—এই তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে সমাজে যে বৈষম্য তৈরি হয়, তা বহু মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে, তাদের সুযোগ সীমিত করে এবং সমাজে অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। এই প্রবন্ধে আমরা এই তিনটি ভিত্তির ওপর সামাজিক অসমতার স্বরূপ উন্মোচন করব।
১. বয়সের ভিত্তিতে বৈষম্য: বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিভাজনকারী উপাদান। শৈশব, যৌবন, এবং বার্ধক্য জীবনের তিনটি প্রধান পর্যায়। প্রতিটি পর্যায়ে সমাজের প্রত্যাশা এবং সুযোগ ভিন্ন ভিন্ন। শিশুরা অসহায় এবং সম্পূর্ণরূপে প্রাপ্তবয়স্কদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের অধিকার প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে লক্ষ লক্ষ শিশু দারিদ্র্য, অপুষ্টি এবং শিক্ষার অভাবের শিকার। অন্যদিকে, বয়স্ক ব্যক্তিরা কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে প্রায়শই অবহেলিত হন। অনেক সমাজে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া হয় না, ফলে তারা একাকীত্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি ছয়জন বয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে একজন কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হন।
২. লিঙ্গের ভিত্তিতে অসমতা: লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন এবং বিস্তৃত সামাজিক অসমতার রূপ। নারী এবং পুরুষের মধ্যে জৈবিক পার্থক্য থাকলেও, সমাজ আরোপিত ভূমিকা এবং প্রত্যাশার কারণে নারীরা প্রায়শই পিছিয়ে থাকেন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা বহু বাধা ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বে পুরুষদের তুলনায় নারীদের কর্মসংস্থানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং তারা একই কাজের জন্য কম মজুরি পান। বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকারও নারীরাই বেশি। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে লক্ষ লক্ষ নারী বিভিন্ন ধরনের লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন।
৩. জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিভাজন: জাতিতত্ত্ব বা জাতিগত পরিচয় সামাজিক অসমতার আরেকটি শক্তিশালী ভিত্তি। একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে মানুষ সুযোগ এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে। ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন সমাজে জাতিগত সংখ্যালঘুরা নিপীড়ন, দাসত্ব এবং গণহত্যার শিকার হয়েছে। আজও অনেক দেশে জাতিগত বিদ্বেষ এবং বৈষম্য বিদ্যমান। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিভিন্ন প্রতিবেদনে জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি পুলিশের দুর্ব্যবহার, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সামাজিক অংশগ্রহণে বাধার চিত্র উঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুরা দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার।
৪. বয়স এবং শিক্ষার সুযোগ: শৈশবে মানসম্মত শিক্ষার অভাব ভবিষ্যতের সুযোগগুলিকে সীমিত করে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুরা প্রায়শই বিদ্যালয় ছেড়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়, যা তাদের জীবনচক্রকে দারিদ্র্যের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে। বয়স্ক বয়সে নতুন করে শেখা বা প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাব তাদের কর্মজীবনে টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
৫. লিঙ্গ এবং কর্মক্ষেত্র: কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশাধিকার এখনও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং প্রচলিত ধ্যানধারণার কারণে অনেক নারীকেই গৃহস্থালির কাজের দায়িত্ব নিতে হয়, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে ব্যাহত করে। একই পদে কাজ করেও পুরুষদের তুলনায় নারীরা কম বেতন পান, যা একটি সুস্পষ্ট বৈষম্য।
৬. জাতিতত্ত্ব এবং স্বাস্থ্যসেবা: জাতিগত সংখ্যালঘুরা প্রায়শই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন। ভাষাগত বাধা, সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের মধ্যে সংবেদনশীলতার অভাব এর প্রধান কারণ। ফলস্বরূপ, তাদের মধ্যে অসুস্থতা এবং শিশুমৃত্যুর হার বেশি দেখা যায়।
৭. বয়স এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ: তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ অনেক সময় সীমিত থাকে। অন্যদিকে, বয়স্ক ব্যক্তিরা শারীরিক দুর্বলতা বা তথ্যের অভাবে রাজনৈতিক আলোচনা থেকে দূরে থাকেন। এর ফলে নীতি নির্ধারণে তাদের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয় না।
৮. লিঙ্গ এবং নেতৃত্ব: রাজনৈতিক ও কর্পোরেট নেতৃত্ব পদে নারীদের উপস্থিতি এখনও অপ্রতুল। সামাজিক বাধা, লিঙ্গভিত্তিক স্টেরিওটাইপ এবং সুযোগের অভাব নারীদের উচ্চপদে আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
৯. জাতিতত্ত্ব এবং আইনি সুরক্ষা: জাতিগত সংখ্যালঘুরা অনেক সময় আইনি সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। জাতিগত বিদ্বেষের কারণে পুলিশি হয়রানি এবং অন্যায্য গ্রেফতারের শিকার হওয়ার ঝুঁকি তাদের বেশি থাকে।
১০. বয়স এবং সামাজিক মর্যাদা: সমাজে বয়সভেদে মানুষের সামাজিক মর্যাদা ভিন্ন হয়। সাধারণত, কর্মক্ষম যুবক-যুবতীদের সামাজিক মর্যাদা বেশি থাকে, যেখানে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পান।
১১. লিঙ্গ এবং সম্পত্তির অধিকার: বিশ্বের অনেক দেশে নারীদের সম্পত্তির অধিকার সীমিত। উত্তরাধিকার আইন এবং সামাজিক রীতিনীতির কারণে তারা পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন, যা তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে দুর্বল করে তোলে।
১২. জাতিতত্ত্ব এবং ভূমি অধিকার: আদিবাসী এবং জাতিগত সংখ্যালঘুরা প্রায়শই তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি থেকে উচ্ছেদ হন। উন্নয়ন প্রকল্প বা বাণিজ্যিক স্বার্থে তাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়, যা তাদের জীবন ও সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে তোলে।
১৩. বয়স এবং প্রযুক্তিগত বিভাজন: প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য নতুন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হতে পারে। ডিজিটাল যুগে পিছিয়ে থাকার ফলে তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
১৪. লিঙ্গ এবং শিক্ষা: এখনও অনেক সমাজে মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব কম দেওয়া হয়। বাল্যবিবাহ এবং পারিবারিক চাপের কারণে তারা বিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সীমিত করে।
১৫. জাতিতত্ত্ব এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: জাতিগত সংখ্যালঘুদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য অনেক সময় মূলধারার সমাজে অবহেলিত বা উপহাসের পাত্র হয়। এর ফলে তাদের আত্মপরিচয় এবং আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।
১৬. বয়স এবং মানসিক স্বাস্থ্য: শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পারিবারিক অবহেলা, একাকীত্ব এবং সামাজিক সমর্থন ব্যবস্থার অভাব তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
১৭. লিঙ্গ এবং সহিংসতা: লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা। নারী ও মেয়েরা ঘরে-বাইরে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হন, যার দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক প্রভাব পড়ে।
১৮. জাতিতত্ত্ব এবং প্রতিনিধিত্ব: রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব প্রায়শই অপ্রতুল থাকে। এর ফলে নীতি নির্ধারণে তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়।
১৯. বয়স, লিঙ্গ ও জাতিতত্ত্বের আন্তঃসম্পর্ক: প্রায়শই এই তিনটি ভিত্তি একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে বৈষম্যের একটি জটিল রূপ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন বয়স্ক কৃষ্ণাঙ্গ নারী একইসাথে বয়স, লিঙ্গ এবং জাতিগত পরিচয়ের কারণে বহুবিধ বৈষম্যের শিকার হতে পারেন।
উপসংহার: বয়স, লিঙ্গ ও জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সামাজিক অসমতা একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক সমস্যা। এই তিনটি ভিত্তি সমাজের প্রতিটি স্তরে বিদ্যমান এবং বহু মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। এই বৈষম্য দূর করতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে, সংবেদনশীল হতে হবে এবং একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যেতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই একটি উন্নত ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
বয়স, লিঙ্গ ও জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বৈষম্য; বয়স এবং শিক্ষার সুযোগ; লিঙ্গ এবং কর্মক্ষেত্র; জাতিতত্ত্ব এবং স্বাস্থ্যসেবা; বয়স এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ; লিঙ্গ এবং নেতৃত্ব; জাতিতত্ত্ব এবং আইনি সুরক্ষা; বয়স এবং সামাজিক মর্যাদা; লিঙ্গ এবং সম্পত্তির অধিকার; জাতিতত্ত্ব এবং ভূমি অধিকার; বয়স এবং প্রযুক্তিগত বিভাজন; লিঙ্গ এবং শিক্ষা; জাতিতত্ত্ব এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য; বয়স এবং মানসিক স্বাস্থ্য; লিঙ্গ এবং সহিংসতা; জাতিতত্ত্ব এবং প্রতিনিধিত্ব; বয়স, লিঙ্গ ও জাতিতত্ত্বের আন্তঃসম্পর্ক; বৈষম্য হ্রাসে পদক্ষেপ; ভবিষ্যতের পথে।
বাংলাদেশে ২০২৩ সালে নারী শ্রমিকের গড় মজুরি পুরুষের তুলনায় ৩০% কম (বিবিএস)। ২০২১ সালে বিশ্বে ১৫ কোটি শিশু শ্রমিক ছিল (ইউনিসেফ)। ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান-আমেরিকানদের বেকারত্বের হার ১১% ছিল, যা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় দ্বিগুণ। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আপারথেইড বিলুপ্ত হয়, কিন্তু জাতিগত বৈষম্য এখনও রয়েছে।

