- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রস্তাবনা: সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা, যা একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে নির্দেশ করে। এটি এমন একটি ধারণা যা একটি দেশকে অন্য কোনো বাহ্যিক শক্তি বা অভ্যন্তরীণ প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার অধিকার দেয়। সার্বভৌমত্ব ছাড়া একটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব পরিচিতি এবং ক্ষমতা হারায়। এর মাধ্যমেই একটি দেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার স্বকীয়তা ও সম্মান বজায় রাখে।
সার্বভৌমত্ব শব্দটি দুটি অংশ থেকে এসেছে: ‘সার্ব’ এবং ‘ভৌমত্ব’। ‘সার্ব’ অর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ বা সর্বোচ্চ এবং ‘ভৌমত্ব’ অর্থ ভূমি বা ভূখণ্ড। শাব্দিকভাবে, সার্বভৌমত্ব বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের উপর সর্বোচ্চ এবং অবিসংবাদিত ক্ষমতা।
সার্বভৌমত্ব একটি রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় ক্ষমতাকেই বোঝায়। অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব বলতে রাষ্ট্রের নিজস্ব সীমানার মধ্যে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে বোঝায়। অন্যদিকে, বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব বলতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনভাবে কাজ করার এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজস্ব নীতি নির্ধারণ করার ক্ষমতাকে বোঝায়।
সাধারণভাবে আমরা যখন সার্বভৌমত্বের কথা চিন্তা করি, তখন আমাদের মনে একটি স্বাধীন দেশের চিত্র ভেসে ওঠে। এমন একটি দেশ যা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে, যার নিজস্ব আইন আছে, নিজস্ব সরকার আছে এবং যা কোনো পরাশক্তির অধীনে নয়। সার্বভৌমত্ব মানে হলো, আমাদের দেশের ভূখণ্ডে অন্য কোনো দেশ জোর করে কিছু চাপিয়ে দিতে পারবে না বা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। সহজ কথায়, এটি একটি দেশের নিজস্ব মালিকানা এবং তার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
১।ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): “সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার।” (“Sovereignty is the monopoly of the legitimate use of physical force by a state.”)
২।টমাস হবস (Thomas Hobbes): “সার্বভৌমত্ব হলো সমাজের সমস্ত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, যা শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখে।” (“Sovereignty is the central power that maintains peace and order in society.”)
৩।এ. ভি. ডাইসি (A. V. Dicey): “সার্বভৌমত্ব হলো এমন একটি ক্ষমতা যার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র আইন তৈরি, বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারে।” (Sovereignty is the power by which a state can make, unmake, or alter any law.)
৪।হুগো গ্রোশিয়াস (Hugo Grotius): “সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সেই অধিকার, যা অন্য কোনো শক্তির কাছে জবাবদিহি করে না।” (“Sovereignty is the power of a state not answerable to any higher authority.”)
৫।হ্যান্স কেলসেন (Hans Kelsen): “সার্বভৌমত্ব হলো একটি আইনি ধারণা, যা একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ করে।” (Sovereignty is a legal concept that refers to the supreme legal authority of a state.)
৬।জ্যাঁ-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau): “সার্বভৌমত্ব হলো সাধারণ ইচ্ছা (General Will), যা জনগণের সমষ্টিগত ইচ্ছার প্রকাশ।” (Sovereignty is the general will, which is the expression of the collective will of the people.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা সার্বভৌমত্বকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি যে, সার্বভৌমত্ব হলো একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ডের উপর চরম, অবাধ এবং অবিভাজ্য ক্ষমতা, যা রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদান করে। এর মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র নিজস্ব আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে পারে এবং কোনো বাহ্যিক শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের নীতি নির্ধারণ করতে পারে।
উপসংহার: সার্বভৌমত্ব একটি রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর এবং এর আত্মমর্যাদার প্রতীক। এটি শুধু একটি আইনি ধারণা নয়, বরং একটি জাতির স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের স্মারক। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রই পারে তার জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে তার ন্যায্য স্থান করে নিতে। এই ক্ষমতা একটি জাতিকে তার নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার দেয় এবং তাকে বহিরাগত যেকোনো আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে। সার্বভৌমত্ব ছাড়া কোনো দেশই সত্যিকারের অর্থে স্বাধীন হতে পারে না।
সার্বভৌমত্ব হলো একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা ও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।
সার্বভৌমত্ব হলো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের উপর একটি রাষ্ট্রের চূড়ান্ত এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা।
১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার পর আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি সার্বভৌমত্বের ধারণাকে আরও সংহত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৩৩ সালের মন্টেভিডিও কনভেনশন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বৈশ্বিক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ক আন্তর্জাতিক উদ্বেগগুলো কখনও কখনও সার্বভৌমত্বের প্রথাগত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যেমন, ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যা এবং ১৯৯৫ সালের বসনিয়া যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে “হস্তক্ষেপের অধিকার” নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিল, যা সার্বভৌমত্বের ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

