- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রস্তাবনা: সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পেশাগত বা সাংগঠনিক ক্ষেত্র—সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। সুচিন্তিত এবং পদ্ধতিগতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা গেলে অপ্রত্যাশিত জটিলতা ও ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। এই নিবন্ধে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন ধাপ ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করব।খ
১। সমস্যা বা সুযোগ শনাক্তকরণ: সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রথম ধাপ হলো সমস্যাটি চিহ্নিত করা। এটি কোনো অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ হতে পারে, আবার নতুন কোনো সুযোগও হতে পারে। সঠিকভাবে সমস্যা বা সুযোগটি না বুঝলে ভুল পথে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ধাপে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে, আসলে কী পরিবর্তন প্রয়োজন বা কোন লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধান করা এবং এর প্রভাব সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর ওপরই পরবর্তী সব পদক্ষেপ নির্ভর করে। যদি একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মুনাফা হারাতে থাকে, তাহলে শুধু বিক্রয় বাড়ানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে, মূল কারণ যেমন—পণ্যের গুণগত মান, বাজার চাহিদা বা প্রতিযোগীদের কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে।
২। তথ্য সংগ্রহ: সমস্যা বা সুযোগ চিহ্নিত করার পর, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এই ধাপে আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করি, যেমন—বই, ইন্টারনেট, বিশেষজ্ঞের মতামত, গবেষণাপত্র ইত্যাদি। যত বেশি এবং নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া তত সহজ হবে। সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি নতুন পণ্য বাজারে আনার আগে তার বাজার চাহিদা, সম্ভাব্য গ্রাহক, প্রতিযোগীদের কৌশল এবং পণ্যের উৎপাদন খরচ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা অপরিহার্য।
৩। বিকল্প সমাধান তৈরি: সংগৃহীত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এখন বিভিন্ন ধরনের বিকল্প সমাধান তৈরি করতে হবে। এই ধাপে আমাদের সৃজনশীল হতে হয় এবং এক বা একাধিক সম্ভাব্য পথ খুঁজে বের করতে হয়। কোনো একটি সমস্যা সমাধানের জন্য শুধুমাত্র একটি উপায় নিয়ে ভাবা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যত বেশি বিকল্প থাকবে, সঠিক সিদ্ধান্ত বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে। একটি নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট স্থানে দোকান খোলার বিকল্প না ভেবে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা হোম ডেলিভারির মতো বিকল্পগুলোও বিবেচনা করা যেতে পারে।
৪। বিকল্পগুলো মূল্যায়ন: এই ধাপে তৈরি করা প্রতিটি বিকল্পের সুবিধা ও অসুবিধাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিটি বিকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল, ঝুঁকি, খরচ এবং উপকারের দিকগুলো তুলনা করা হয়। এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি বস্তুনিষ্ঠ হওয়া উচিত। কোনো একটি নির্দিষ্ট বিকল্পের প্রতি ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। প্রতিটি বিকল্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও লাভ সম্পর্কে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে তালিকা তৈরি করা যেতে পারে, যা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। যেমন, একটি কোম্পানি নতুন সফটওয়্যার কেনার সময় একাধিক সফটওয়্যার পরীক্ষা করে দেখে তাদের কার্যকারিতা, খরচ এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ততা বিচার করে।
৫। সিদ্ধান্ত গ্রহণ: সব বিকল্প মূল্যায়ন করার পর, সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্পটি বেছে নিতে হবে। এই সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক এবং সুচিন্তিত হওয়া উচিত। অনেক সময় আমরা আবেগের বশে বা তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যা ভবিষ্যতে অনুশোচনার কারণ হতে পারে। তাই এই ধাপে সবদিক বিবেচনা করে, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবং ঝুঁকির মাত্রা বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় যদি একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকে, তাহলে তাদের সবার মতামত এবং সম্মতি নেওয়া জরুরি, কারণ এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা নিশ্চিত করে।
৬। কর্মপরিকল্পনা তৈরি: চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। এই ধাপে নির্দিষ্ট করা হয় কে কী কাজ করবে, কখন করবে এবং কীভাবে করবে। একটি পরিষ্কার এবং সময়সীমা-ভিত্তিক পরিকল্পনা থাকলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হয়। এই পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট লক্ষ্য, দায়িত্ব, সময়সীমা এবং প্রয়োজনীয় সংস্থান (যেমন—অর্থ ও মানবসম্পদ) উল্লেখ করা হয়। পরিকল্পনা ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেবল একটি চিন্তাভাবনা হয়েই থেকে যায়, যা কখনো বাস্তব রূপ পায় না। একটি কোম্পানি যখন নতুন কোনো বিপণন কৌশল গ্রহণ করে, তখন তারা সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক করে কোন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে, কত বাজেট থাকবে এবং এর দায়িত্বে কারা থাকবেন।
৭। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন: কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি বাস্তবে রূপ দেওয়া হয়। এই ধাপে সব কর্মীকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংস্থান সরবরাহ করা হয়। সফল বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত তদারকি এবং সমন্বয় অপরিহার্য। কোনো বাধা বা সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত তার সমাধান করতে হয়। সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং উৎসাহ প্রদান করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই ধাপটি সবচেয়ে বেশি শ্রম ও ধৈর্যের দাবি রাখে। একটি নতুন উৎপাদন কৌশল বাস্তবায়নের জন্য কর্মীদের নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
৮। ফলাফল পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন: সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর এর ফলাফল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। লক্ষ্য অনুযায়ী ফলাফল অর্জিত হচ্ছে কিনা, তা যাচাই করতে হয়। যদি কোনো ত্রুটি বা অপ্রত্যাশিত সমস্যা দেখা দেয়, তবে তা দ্রুত সংশোধন করতে হয়। এই ধাপে সিদ্ধান্তটি কতটা সফল হয়েছে, তার একটি মূল্যায়ন করা হয়। এই মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজ করে। যেমন, কোনো নতুন বিপণন প্রচারাভিযানের পর এর বিক্রয় বৃদ্ধি, গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া এবং বিনিয়োগের উপর আয়ের অনুপাত (ROI) পর্যবেক্ষণ করা হয়।
৯। প্রতিক্রিয়া গ্রহণ: সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষ (stakeholders), যেমন—গ্রাহক, কর্মী, সরবরাহকারী ইত্যাদি—থেকে মতামত ও প্রতিক্রিয়া নেওয়া যেতে পারে। এই প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হয় এবং ভুলগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। গ্রাহকদের সন্তুষ্টি এবং কর্মীদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানা গেলে পণ্যের মান বা সেবার উন্নতি ঘটানো সম্ভব। একটি নতুন পরিষেবা চালু করার পর গ্রাহকদের কাছ থেকে তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ চাওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে আরও ভালো সেবা প্রদান করা যায়।
১০। নিয়মিত পর্যালোচনা: যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যালোচনা করা উচিত। পরিবেশ, বাজার এবং অন্যান্য পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে, তাই পূর্বে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকারিতা পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। যদি কোনো সিদ্ধান্ত আর কার্যকর না হয়, তবে নতুন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করতে হতে পারে। এটি নিশ্চিত করে যে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সর্বদা সঠিক পথে রয়েছে। যেমন, প্রযুক্তি পরিবর্তনের সাথে সাথে একটি কোম্পানির উৎপাদন প্রক্রিয়া বা বিপণন কৌশল পরিবর্তন করতে হতে পারে।
১১। ঝুঁকি বিশ্লেষণ: প্রতিটি সিদ্ধান্তের সাথে কিছু না কিছু ঝুঁকি জড়িত থাকে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো মোকাবিলার জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করা অপরিহার্য। ঝুঁকি বিশ্লেষণ করলে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকা যায় এবং সম্ভাব্য ক্ষতি কমানো যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের অনিশ্চয়তা, আর্থিক ঝুঁকি এবং প্রতিযোগিতার ঝুঁকিগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।
১২। আনুষ্ঠানিকতা ও অনানুষ্ঠানিকতা: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক হতে পারে। বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত একটি সুসংগঠিত এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেওয়া হয়, যেখানে অনেক ব্যক্তি ও দল জড়িত থাকে। অন্যদিকে, দৈনন্দিন ছোটখাটো সিদ্ধান্তগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে, দ্রুত এবং ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং জটিলতা অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন, একটি নতুন অফিস ভবন কেনার সিদ্ধান্ত একটি দীর্ঘ এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যেখানে দুপুরের খাবার কী হবে তা সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি অনানুষ্ঠানিক বিষয়।
১৩। সময়সীমা নির্ধারণ: সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা জরুরি। তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতিরিক্ত সময় নেওয়াও ক্ষতির কারণ হতে পারে। সময়সীমা থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি সুশৃঙ্খল থাকে এবং কোনো সিদ্ধান্ত দীর্ঘায়িত হয় না। উদাহরণস্বরূপ, একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য সময় মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে পুরো প্রকল্পটি বিলম্বিত হতে পারে।
১৪। নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনা: সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এর নৈতিক এবং সামাজিক প্রভাবগুলো বিবেচনা করা উচিত। একটি সিদ্ধান্ত শুধু আর্থিক দিক থেকে লাভজনক হলেই যথেষ্ট নয়, এর মাধ্যমে সমাজ বা পরিবেশের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা, তা খেয়াল রাখতে হবে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া বা কর্মীদের অধিকারের মতো বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন, একটি কোম্পানি যখন কোনো রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে, তখন তার পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়।
১৫। দলগত সিদ্ধান্ত বনাম একক সিদ্ধান্ত: গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো একা নেওয়া বা দলগতভাবে নেওয়া যায়। দলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভিন্ন মতামত ও দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়, যা ভালো ফলাফল দেয়। তবে এর জন্য সময় বেশি লাগে এবং মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, একক সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া যায়, তবে এতে ভুলের সম্ভাবনা থাকে। প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি এবং সিদ্ধান্তটির গুরুত্বের উপর ভিত্তি করে এই পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়।
১৬। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য: প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তির মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। কোনো সিদ্ধান্ত যদি মূল লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে তা গ্রহণ করা উচিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি কোম্পানির মূল লক্ষ্য যদি হয় সর্বোচ্চ মানের পণ্য তৈরি করা, তাহলে শুধুমাত্র কম খরচে উৎপাদন করার জন্য পণ্যের গুণগত মান কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল হবে।
১৭। স্বজ্ঞাত সিদ্ধান্ত গ্রহণ: অনেক সময় অভিজ্ঞতা ও সহজাত প্রবৃত্তির উপর ভিত্তি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা স্বজ্ঞাত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিটি সাধারণত অভিজ্ঞ ম্যানেজার বা বিশেষজ্ঞদের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়, যখন সময় খুব কম থাকে। তবে এই পদ্ধতিতে ভুল হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে, বিশেষ করে যদি সমস্যাটি নতুন হয় বা কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকে। তাই এটি সব সময় নিরাপদ নয়।
১৮। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন: সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বাহ্যিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি যেমন—অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন—বিবেচনা করা জরুরি। বাজারের পরিবর্তন বা সরকারি নীতির পরিবর্তনের ফলে একটি সিদ্ধান্ত অকার্যকর হতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এই বিষয়গুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়। একটি নতুন ব্যবসা শুরু করার আগে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারি নিয়ম-নীতি সম্পর্কে জানতে হয়।
১৯। ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব পরিহার: অনেক সময় আমাদের ব্যক্তিগত আবেগ, বিশ্বাস বা পূর্ব অভিজ্ঞতা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। এই পক্ষপাতিত্বগুলো পরিহার করে বস্তুনিষ্ঠ এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দ যেন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ম্যানেজার তার পছন্দের কর্মীকে সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে যোগ্য এবং দক্ষ কর্মীকে সুযোগ দেওয়া উচিত।
উপসংহার: সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি চলমান এবং পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়া। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নয়, বরং সমস্যা থেকে শুরু করে তার সমাধান ও পর্যবেক্ষণের একটি পূর্ণাঙ্গ চক্র। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সমস্যাটি ভালোভাবে বোঝা, পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করা, বিকল্পগুলো বিশ্লেষণ করা এবং বাস্তবায়নের জন্য একটি কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা অপরিহার্য। এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে আমরা কেবল ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়াই এড়াতে পারি না, বরং প্রতিটি সিদ্ধান্ত থেকে শেখার সুযোগ পাই এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বা ধাপসমূহ
- ⭐ সমস্যা বা সুযোগ শনাক্তকরণ
- 💡 তথ্য সংগ্রহ
- 🧩 বিকল্প সমাধান তৈরি
- ⚖️ বিকল্পগুলো মূল্যায়ন
- 🎯 সিদ্ধান্ত গ্রহণ
- 📋 কর্মপরিকল্পনা তৈরি
- 🛠️ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন
- 📊 ফলাফল পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন
- 💬 প্রতিক্রিয়া গ্রহণ
- 🔄 নিয়মিত পর্যালোচনা
- ⚠️ ঝুঁকি বিশ্লেষণ
- formality আনুষ্ঠানিকতা ও অনানুষ্ঠানিকতা
- ⏳ সময়সীমা নির্ধারণ
- 🤝 নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনা
- 👥 দলগত সিদ্ধান্ত বনাম একক সিদ্ধান্ত
- 🔭 উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য
- 🧠 স্বজ্ঞাত সিদ্ধান্ত গ্রহণ
- 🌎 পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন
- ❌ ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব পরিহার
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে প্রায়ই ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারিগর’ বলা হয়, কারণ তিনি জটিল এবং সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। ২০০২ সালে মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ক্যানেম্যান তার গবেষণায় দেখান যে, মানুষ প্রায়শই লজিক্যাল সিদ্ধান্তের চেয়ে স্বজ্ঞাত বা আবেগমূলক সিদ্ধান্ত বেশি নেয়, যার জন্য তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। ২০১৯ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে যে, বিশ্বের প্রায় ৮০% ব্যবসায়িক ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এটি প্রমাণ করে যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বা ব্যর্থতার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সঠিক সময়ে ঝুঁকির মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যা তাদের দেউলিয়া হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল।

