- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রাককথা: প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হই। কোনটি খাব, কোন পথে যাব, কী পরব থেকে শুরু করে কর্মজীবন বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আমাদের সঠিক পথ বেছে নিতে হয়। এই যে বিভিন্ন বিকল্প থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত একটিকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া, সহজ ভাষায় একেই আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলি। এটি মানব জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে রূপদান করে।
শাব্দিক অর্থ: “সিদ্ধান্ত গ্রহণ” কথাটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘সিদ্ধান্ত’ শব্দটি সংস্কৃত ‘সিদ্ধ’ এবং ‘অন্ত’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো চূড়ান্ত বা স্থিরকৃত বিষয়। অন্যদিকে, ‘গ্রহণ’ অর্থ হলো কোনো কিছুকে মেনে নেওয়া বা বেছে নেওয়া। সুতরাং, শাব্দিক অর্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলো কোনো চূড়ান্ত বিষয়কে বেছে নেওয়া। ইংরেজিতে একে “Decision Making” বলা হয়।
সাধারণভাবে বলতে গেলে, কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য বা কোনো লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য একাধিক বিকল্প পথের মধ্য থেকে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সর্বোত্তম পথটি বেছে নেওয়ার মানসিক প্রক্রিয়াই হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এটি একটি যৌক্তিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।
বিভিন্ন দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের সংজ্ঞা উপস্থাপন করা হলো:
১। লুথার গুলিকের (Luther Gulick) মতে, “সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলো अनेक বিকল্পের মধ্য থেকে একটি কর্মপন্থা বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া।” (In English: “Decision-making is the process of choosing a course of action from among many alternatives.”)
২। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary) অনুযায়ী, “সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলো কোনো বিষয় বিবেচনা করার পর সে সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া।” (In English: “Decision-making is the process of reaching a decision about something after considering it.”)
৩। গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ডের (Gabriel Almond) দৃষ্টিতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কাজ, যার মাধ্যমে সমাজের জন্য মূল্যবান নীতি নির্ধারণ করা হয়। যদিও তিনি সরাসরি এক বাক্যে সংজ্ঞা দেননি, তবে তাঁর কার্যাবলীমূলক তত্ত্বে (functional approach) সিদ্ধান্ত গ্রহণকে নীতি প্রণয়নের মূল হিসেবে দেখেছেন।
৪। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির (Niccolò Machiavelli) লেখনীতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণকে শাসকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা রাষ্ট্রকে রক্ষা এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় দৃঢ় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার সামর্থ্যকে বোঝায়।
৫। টমাস হবসের (Thomas Hobbes) মতে, মানুষ প্রাকৃতিক অবস্থায় স্বার্থ দ্বারা চালিত হয় এবং তাদের সিদ্ধান্তগুলো মূলত আত্মরক্ষা ও ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে উদ্ভূত হয়।
৬। হ্যারল্ড জে. লাস্কির (Harold J. Laski) মতে, “রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলো সার্বভৌম ক্ষমতার অনুশীলন, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার ইচ্ছাগুলোকে নীতির আকারে প্রকাশ করে।” (In English: “State decision-making is the exercise of sovereign power, through which the state expresses its will in the form of policy.”)
৭। ম্যাক্স ওয়েবারের (Max Weber) যুক্তিবাদীতার তত্ত্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে আমলাতন্ত্র নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলো একটি সুচিন্তিত, সচেতন এবং যৌক্তিক মানসিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সম্ভাব্য বিকল্প থেকে তথ্য, অভিজ্ঞতা ও বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে সবচেয়ে কার্যকর ও ফলপ্রসূ কর্মপন্থাটি নির্বাচন করা হয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেবল একটি কাজ নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই সাফল্য নির্ধারণ করে। ভুল সিদ্ধান্ত যেমন ব্যর্থতার কারণ হতে পারে, তেমনই একটি সঠিক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। তাই এর প্রক্রিয়া এবং প্রভাব সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি।
একাধিক বিকল্প থেকে সর্বোত্তম কর্মপন্থা বেছে নেওয়ার সচেতন প্রক্রিয়াই হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫,০০০ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৭ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, শুধুমাত্র খাদ্য বিষয়েই একজন ব্যক্তি প্রতিদিন ২২৫টির বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আধুনিক ব্যবসায়িক জগতে ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Data-Driven Decision Making) ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে, যা অনুমাননির্ভরতার পরিবর্তে তথ্য ও পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

