- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ফরাসি দার্শনিক, লেখিকা ও সমাজচিন্তক সিমন দ্য বোভোয়ারের (Simone de Beauvoir) অস্তিত্ববাদ মূলত জঁ–পল সার্ত্রের (Jean-Paul Sartre) অস্তিত্ববাদী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও, তিনি এতে যুক্ত করেছিলেন এক অনন্য সামাজিক, নৈতিক এবং নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
সার্ত্রের মতে, “মানুষের অস্তিত্ব তার সারবত্তার পূর্বগামী” (Existence precedes essence)—অর্থাৎ মানুষ আগে জন্মায়, তারপর নিজের কাজের মাধ্যমে পরিচয় তৈরি করে। কিন্তু বোভোয়ার এই ধারণাকে কেবল ব্যক্তিগত স্তরে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও লিঙ্গভেদের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করেছেন।
বোভোয়ারের অস্তিত্ববাদের মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. “নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, বরং নারী হয়ে ওঠে“: এটি বোভোয়ারের অস্তিত্ববাদী দর্শনের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি, যা তাঁর ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স‘ (The Second Sex)-এ উল্লেখ করেছেন। অস্তিত্ববাদের মূল নীতি অনুযায়ী—জৈবিকভাবে নারী হিসেবে জন্মগ্রহণ করা এক জিনিস (Sex), কিন্তু সমাজ যাকে ‘নারীত্ব’ বা নারীর ভূমিকা হিসেবে চাপিয়ে দেয় (Gender), তা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ। সমাজ নারীদের কিছু নির্দিষ্ট আচরণ ও সীমানায় আবদ্ধ করে তাদের স্বাধীনতা খর্ব করে।
২. ‘অদারনেস‘ বা ‘অপর‘ (The Other) তত্ত্ব: বোভোয়ার অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখান যে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ নিজেকে প্রধান বা ‘কর্তা’ (Subject) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং নারীকে দেখে ‘অপর’ বা ‘অনপেক্ষ’ (The Other) হিসেবে। পুরুষ নিজেকে স্বায়ত্তশাসিত মনে করে এবং নারীকে তার অধীনস্থ একটি বস্তু বা সংজ্ঞায় পরিণত করে। এর ফলে নারী তার নিজস্ব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করার স্বাভাবিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়।
৩. স্বাধীনতা এবং নৈতিকতা (Ambiguity and Ethics): বোভোয়ার তাঁর ‘দ্য এথিক্স অব অ্যাম্বিগুইটি‘ (The Ethics of Ambiguous) গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, মানুষের স্বাধীনতা কখনো একাকী বা বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। আমি তখনই প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন, যখন আমি অন্যদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করি। কোনো সমাজ যদি তার অর্ধেক জনসংখ্যাকে (নারী) পরাধীন করে রাখে, তবে সেই সমাজের সার্বিক স্বাধীনতা অর্থহীন। অর্থাৎ, ব্যক্তিস্বাধীনতার সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতা গভীরভাবে যুক্ত।
৪. পরিস্থিতি এবং সীমাবদ্ধতা (Facticity vs. Freedom): অস্তিত্ববাদে মানুষ পুরোপুরি স্বাধীন হলেও বোভোয়ার স্বীকার করেছেন যে, বাস্তব জীবনে মানুষের ওপর বিভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিয়ত বাধ্যবাধকতা (Situation/Facticity) আরোপ করা হয়। একজন পুরুষ এবং একজন নারীর সামনে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সবসময় সমান থাকে না। তাই তিনি কেবল তাত্ত্বিক স্বাধীনতার কথা না বলে বাস্তব সামাজিক বাধাগুলো দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সংক্ষেপে, সিমন দ্য বোভোয়ারের অস্তিত্ববাদ হলো একটি প্রয়োগমুখী ও নারীবাদী অস্তিত্ববাদ। এটি মানুষকে (বিশেষ করে নারীকে) সমাজের আরোপিত শৃঙ্খল ভেঙে নিজের সত্তা, পরিচয় ও স্বাধীনতা নিজে তৈরি করার প্রেরণা দেয়।