- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সুশাসন হলো একটি রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি, যা নাগরিকের অধিকার ও কল্যাণের নিশ্চয়তা দেয়। বাংলাদেশ একটি উদীয়মান ও প্রান্তিক রাষ্ট্র হিসেবে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পথচলায় টেকসই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি অসম্ভব নয়। বর্তমান প্রেক্ষিতে এর অন্তরায় এবং উত্তরণের উপায় জানা জরুরি।
১। রাজনৈতিক সদিচ্ছা: যেকোনো রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত হলো শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বাংলাদেশে অনেক ভালো আইন ও নীতি থাকা সত্ত্বেও কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন থমকে যায়। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করা এক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। এটি নিশ্চিত হলে প্রশাসনের সকল স্তরে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা শতভাগ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
২। দুর্নীতি প্রতিরোধ: দুর্নীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব। দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিলে অপরাধীরা পার পাবে না। সমাজ থেকে দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল করা গেলে টেকসই উন্নয়নের সুফল প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছাবে।
৩। আইনের শাসন: আইনের চোখে সবাই সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, এই নীতিটি কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ধনী-দরিদ্র বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা সুশাসনের অন্যতম মূল ভিত্তি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে আসবে। এর ফলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে এবং শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
৪। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত রাখা সুশাসন কায়েমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিচারকগণ যদি কোনো রাজনৈতিক বা বাহ্যিক চাপ ছাড়া ফ্রিল্যান্সিং বা স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন, তবেই প্রকৃত বিচার সুনিশ্চিত হবে। মামলা জট কমানো এবং বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে সাধারণ মানুষ খুব কম সময়ে এবং কম খরচে ন্যায়বিচার লাভ করতে পারবে।
৫। আমলাতান্ত্রিক সংস্কার: বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আধুনিক, গতিশীল এবং জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে আমলাতান্ত্রিক সংস্কার অপরিহার্য। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করলে প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকারি সেবার মান উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।
৬। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করা প্রয়োজন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তবে রাষ্ট্রের ভারসাম্য বজায় থাকে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া একটি প্রান্তিক রাষ্ট্রে কখনো টেকসই সুশাসন কায়েম করা সম্ভব নয়।
৭। তথ্যের অধিকার: জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা সুশাসনের একটি বড় এবং শক্তিশালী হাতিয়ার। সরকারি কাজের সকল তথ্য যদি জনগণের কাছে উন্মুক্ত থাকে, তবে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ অনেক কমে যায়। তথ্য অধিকার আইনের সঠিক ও ব্যাপক বাস্তবায়ন নাগরিক সমাজকে আরও বেশি সচেতন করে তোলে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হলে সরকারের কাজের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
৮। ডিজিটাল বাংলাদেশ: প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সুশাসনের একটি অন্যতম আধুনিক মাধ্যম। ই-গভর্নেন্স চালু করার ফলে সরকারি দপ্তরে দালাল চক্রের উৎপাত এবং ঘুষের লেনদেন অনেকাংশে কমে গেছে। ভূমি ব্যবস্থাপনা, কর প্রদান এবং বিভিন্ন লাইসেন্স প্রাপ্তি ডিজিটাল হওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেছে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাকে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।
৯। বিকেন্দ্রীকরণ নীতি: ক্ষমতা ও সেবাকে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া বা বিকেন্দ্রীকরণ করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি শক্তিশালী, স্বায়ত্তশাসিত এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে ঢাকার ওপর মানুষের অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং গ্রামীণ জনগণের সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে। স্থানীয় উন্নয়নের সিদ্ধান্ত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নেওয়া হলে সুশাসন নিশ্চিত হবে।
১০। মানবাধিকার রক্ষা: প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক ও মানবাধিকার রক্ষা করা একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসনের পরিবেশ তৈরি হয়। রাষ্ট্রে যদি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা এবং আত্মমর্যাদা বজায় থাকে, তবে দেশের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
১১। জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: সরকারি কর্মকর্তা এবং জনপ্রতিনিধিদের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহিতা থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। জবাবদিহিতা না থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বেচ্ছাচারিতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা প্রবল থাকে। নিয়মিত অডিট বা নিরীক্ষা এবং কাজের মূল্যায়ন করার পদ্ধতি চালু রাখলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। যেকোনো ভুলের জন্য শাস্তির বিধান থাকলে প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব সতর্কতার সাথে পালন করবে।
১২। নাগরিক অংশগ্রহণ: রাষ্ট্রের যেকোনো নীতি নির্ধারণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় সাধারণ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের মতামত নিলে কাজের মান উন্নত হয়। নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজকে স্বাধীনভাবে গঠনমূলক সমালোচনা করার সুযোগ দেওয়া উচিত। জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রের যেকোনো সংস্কার কর্মসূচি সফল হওয়া সহজ হয়।
১৩। জেন্ডার সমতা: নারী ও পুরুষের সমান অধিকার এবং অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা সুশাসনের একটি বড় মাপকাঠি। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারীকে পেছনে রেখে টেকসই উন্নয়ন বা সুশাসন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র এবং রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নারী নির্যাতন রোধ এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
১৪। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: একটি প্রান্তিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সুশাসন কায়েমের পথকে অনেক বেশি মসৃণ ও সহজ করে তোলে। সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং রাজস্ব খাতের সংস্কার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নাগরিকরাই রাষ্ট্রের সুশাসন বজায় রাখতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে।
১৫। পরিবেশগত সুশাসন: জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সুশাসনের অংশ। নদী দূষণ রোধ, বনায়ন বৃদ্ধি এবং অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগ না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন চরম হুমকির মুখে পড়বে। টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
১৬। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেম সমৃদ্ধ আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা সুনাগরিক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেবল জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতা না রেখে নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। সচেতন ও শিক্ষিত নাগরিকরাই রাষ্ট্রের কাছে নিজের অধিকার দাবি করতে পারে এবং কর্তব্য পালন করে। যুবসমাজকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুললে তারা দেশের জন্য বড় সম্পদে পরিণত হবে।
১৭। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমকে বলা হয় গণতন্ত্র এবং সুশাসনের চতুর্থ স্তম্ভ। সংবাদপত্রের ওপর কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি না করে সত্য প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। গণমাধ্যম যখন সরকারের ভুলত্রুটি ও দুর্নীতি তুলে ধরে, তখন সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়। গঠনমূলক সমালোচনা রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে এবং সুশাসন বজায় রাখতে সাহায্য করে।
১৮। নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়ন: একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা সুশাসন প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি। জনগণ যখন স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে, তখন গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের মতো একটি প্রান্তিক রাষ্ট্রের জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কেবল একটি লক্ষ্য নয়, বরং টিকে থাকার অনন্য উপায়। আইনের শাসন, দুর্নীতি দমন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে এই পথের অন্তরায়গুলো দূর করা সম্ভব। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তবেই রূপকল্প বাস্তবায়িত হবে এবং বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি বৈষম্যহীন ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।