- readaim.com
- 0
উত্তর।।ভূমিকা: সুশাসন এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে সরকারের ক্ষমতা ও জনগণের চাহিদা এবং অধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকে। এটি শুধু ভালো শাসন নয়, বরং এমন একটি শাসনব্যবস্থা যা সমাজের সকল স্তরে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করে।
সুশাসন একটি বহুমাত্রিক ধারণা যা একটি দেশের শাসনব্যবস্থা, প্রশাসন, এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। সহজ কথায়, এটি এমন এক ধরনের শাসন যেখানে জনগণের অধিকার, কল্যাণ এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। সুশাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।
শাব্দিক অর্থ: ‘সুশাসন’ (Good Governance) শব্দটি দুটি আলাদা শব্দ নিয়ে গঠিত: ‘সু’ এবং ‘শাসন’। এখানে ‘সু’ বলতে ‘ভালো’, ‘ন্যায়সঙ্গত’, বা ‘সঠিক’ বোঝায়। অন্যদিকে, ‘শাসন’ বলতে বোঝায় ক্ষমতা প্রয়োগ, নিয়ন্ত্রণ, এবং পরিচালনা। সুতরাং, সুশাসন বলতে ‘ভালো বা সঠিক উপায়ে শাসন পরিচালনা করা’ বোঝায়।
বিভিন্ন মনীষী ও গবেষক সুশাসনের ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন, যা এর বহুমুখী ধারণাটিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। নিম্নে তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১। প্লেটো (Plato): প্লেটো বিশ্বাস করতেন যে, সুশাসন হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে শাসকগণ জ্ঞানী, দার্শনিক এবং ন্যায়পরায়ণ। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো সমাজের সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন করা। (Plato believed that good governance is a system where rulers are wise, philosophical, and just, with the sole aim of achieving the highest good for society.)
২। অ্যারিস্টটল (Aristotle): অ্যারিস্টটলের মতে, সুশাসন হলো একটি মিশ্র শাসনব্যবস্থা যেখানে আইনের শাসন, ক্ষমতা বিভাজন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এটি গণতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও রাজতন্ত্রের উত্তম সংমিশ্রণ। (According to Aristotle, good governance is a mixed system of government where the rule of law, separation of powers, and public participation are ensured. It is a virtuous blend of democracy, aristocracy, and monarchy.)
৩। জন লক (John Locke): জন লকের মতে, সুশাসন হলো এমন এক শাসনব্যবস্থা যা জনগণের সম্মতি ও প্রাকৃতিক অধিকারের (জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি) ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এটি সরকারের ক্ষমতার উপর সীমা আরোপ করে। (According to John Locke, good governance is a system based on the consent of the people and the protection of their natural rights (life, liberty, and property). It imposes limits on the power of the government.)
৪। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski): হ্যারল্ড জে. লাস্কি বলেছেন যে, সুশাসন হলো সরকারের এমন এক কাঠামো যা জনগণের চাহিদা ও কল্যাণের প্রতি সংবেদনশীল এবং সাড়া দিতে পারে। এটি সরকারের জবাবদিহিতা ও জনগণের অধিকারের উপর জোর দেয়। (Harold J. Laski stated that good governance is a governmental structure that is sensitive and responsive to the needs and well-being of the people. It emphasizes government accountability and people’s rights.)
৫। এল.ডি. হোয়াইট (L.D. White): এল.ডি. হোয়াইটের মতে, সুশাসন বলতে বোঝায় একটি দক্ষ, স্বচ্ছ এবং কার্যকর প্রশাসন, যা জনগণের সেবার জন্য গঠিত। এটি সরকারি কার্যক্রমে পেশাদারিত্ব ও সততাকে গুরুত্ব দেয়। (According to L.D. White, good governance refers to an efficient, transparent, and effective administration designed for public service. It emphasizes professionalism and integrity in government operations.)
৬। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): ডোয়াইট ওয়াল্ডো বলেন যে, সুশাসন হলো একটি নৈতিক ও প্রযুক্তিগত ধারণা, যা প্রশাসনকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। (Dwight Waldo states that good governance is an ethical and technical concept that makes the administration accountable to the people and ensures social justice.)
৭। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): তাদের মতে, সুশাসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন বজায় থাকে। (According to them, good governance is a process in which transparency, participation, accountability, and the rule of law are maintained in the government’s decision-making and implementation processes.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায় যে, সুশাসন হলো একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যা জনগণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং দক্ষতার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করে। এটি এমন একটি শাসনব্যবস্থা যা সমাজের সকল স্তরে ন্যায্যতা ও কল্যাণ নিশ্চিত করে এবং জনগণের অধিকার ও চাহিদা পূরণে সচেষ্ট থাকে।
উপসংহার: সংক্ষেপে বলা যায়, সুশাসন শুধু একটি আদর্শিক ধারণা নয়, বরং একটি কার্যকর প্রক্রিয়া যা একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এটি একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়তা করে। যখন একটি রাষ্ট্র সুশাসনের নীতি অনুসরণ করে, তখন তা জনগণের আস্থা অর্জন করে এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
সুশাসন হলো জনগণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রকে কল্যাণকরভাবে পরিচালনা করার প্রক্রিয়া।
বিশ্বব্যাংক ১৯৯২ সালে সুশাসনের ধারণাটিকে গুরুত্বের সাথে প্রচার করে, যার লক্ষ্য ছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রশাসনিক দক্ষতা ও দুর্নীতি কমানো। জাতিসংঘ ২০০৬ সালের এক জরিপে সুশাসনকে উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। এছাড়া, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী, সুশাসন একটি দেশের দুর্নীতিমুক্ত অবস্থা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

