- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: সেন্ট অগাস্টিন, চতুর্থ শতাব্দীর একজন প্রভাবশালী ধর্মতত্ত্ববিদ এবং দার্শনিক, তাঁর রাষ্ট্রদর্শনকে খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের গভীর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত হয়েছিল এবং এটি পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তাধারায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন কেবল পার্থিব শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করে না, বরং মানব প্রকৃতি, পাপ, ঐশ্বরিক পরিকল্পনা এবং দুটি ভিন্ন রাজ্যের ধারণাকে একীভূত করে এক সুসংহত কাঠামো তৈরি করে। তাঁর এই চিন্তাধারা পরবর্তীকালের মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক দর্শনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।
১। পার্থিব ও ঐশ্বরিক রাজ্য: সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শনের মূল ভিত্তি হলো ‘দুটি রাজ্যের’ ধারণা—পার্থিব রাজ্য (City of Man) এবং ঐশ্বরিক রাজ্য (City of God)। পার্থিব রাজ্য হলো আমাদের এই জগতের বাস্তব রাষ্ট্র ও সমাজ, যা মানুষের স্বার্থ, ক্ষমতা এবং পার্থিব সুখের আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে গঠিত। এর বিপরীতে, ঐশ্বরিক রাজ্য হলো সেই আধ্যাত্মিক এবং আদর্শিক সমাজ, যা ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অগাস্টিন যুক্তি দেন যে, পার্থিব রাজ্য অস্থায়ী এবং পাপে পরিপূর্ণ, কিন্তু ঐশ্বরিক রাজ্য হলো চিরন্তন ও শাশ্বত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একজন সত্যিকারের খ্রিস্টান নাগরিক পার্থিব রাজ্যের অংশ হলেও তার প্রকৃত আনুগত্য ও ভালোবাসা ঐশ্বরিক রাজ্যের প্রতি থাকা উচিত।
২। পাপ ও মানব প্রকৃতি: অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন মানব প্রকৃতির একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভূত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আদি পাপের কারণে মানুষের প্রকৃতি দূষিত হয়েছে এবং মানুষ সহজাতভাবেই স্বার্থপর ও ক্ষমতা-লোভী। এই পাপপূর্ণ মানব প্রকৃতিই সমাজে অস্থিরতা, সংঘাত এবং অন্যায়ের জন্ম দেয়। তাই, একটি সুশৃঙ্খল সমাজ বজায় রাখার জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন অপরিহার্য। রাষ্ট্রকে তিনি ঈশ্বরের একটি যন্ত্র হিসেবে দেখেছিলেন, যার কাজ হলো পাপপূর্ণ মানুষের ক্ষতিকর প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করা এবং সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। অগাস্টিনের মতে, রাষ্ট্র না থাকলে মানব সমাজ বিশৃঙ্খল এবং ধ্বংসের মুখে পড়তো।
৩। ন্যায় ও শান্তি: অগাস্টিনের মতে, একটি আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু তাঁর মতে, প্রকৃত ন্যায় কেবলমাত্র ঐশ্বরিক রাজ্যে সম্ভব। পার্থিব রাষ্ট্রে যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা হয়, তা সবসময় অসম্পূর্ণ এবং আপেক্ষিক। কারণ, পার্থিব রাষ্ট্রের শাসকেরা নিজেরা পাপপূর্ণ এবং তাদের ক্ষমতা সীমিত। তবে, পার্থিব রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। অগাস্টিনের কাছে, শান্তি হলো বিশৃঙ্খলা এবং সংঘাতের অনুপস্থিতি, যা সমাজের সব নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র ঐশ্বরিক রাজ্যের এক ধরনের ছায়া হিসেবে কাজ করে। এই শান্তি পার্থিব জীবনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং মানুষকে তাদের আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জনে সুযোগ দেয়।
৪। নিরপেক্ষ রাষ্ট্র: অগাস্টিন মনে করতেন যে, রাষ্ট্র নিজে থেকে কোনো চরম ভালো বা চরম মন্দ সত্তা নয়। এটি একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য নির্ভর করে এর পরিচালকদের নৈতিকতার ওপর। রাষ্ট্র যদি ন্যায় ও শান্তির জন্য কাজ করে, তবে তা ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রতিফলন। অন্যদিকে, যদি রাষ্ট্র অত্যাচারী ও অন্যায় হয়, তবে তা পাপপূর্ণ মানব ইচ্ছার প্রতিফলন। অগাস্টিন বলেন যে, একজন খ্রিস্টানের জন্য অত্যাচারী শাসকের প্রতিও আনুগত্য দেখানো উচিত, কারণ সকল ক্ষমতা ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে। তবে, যদি রাষ্ট্র ঈশ্বরের আইন বা খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করতে বাধ্য করে, তবে খ্রিস্টানরা ঈশ্বরের আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেবে। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে এক নতুন ধারণা দেয়।
৫। আইন ও কর্তৃত্ব: সেন্ট অগাস্টিন আইনকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন: ঐশ্বরিক আইন (Divine Law) এবং মানবিক আইন (Human Law)। ঐশ্বরিক আইন হলো ঈশ্বরের দেওয়া চিরন্তন নিয়ম, যা সকল সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য। মানবিক আইন হলো রাষ্ট্রের তৈরি আইন, যা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন। অগাস্টিন বিশ্বাস করতেন যে, মানবিক আইন তখনই বৈধ হবে যখন তা ঐশ্বরিক আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। কোনো মানবিক আইন যদি ঈশ্বরের আইনের পরিপন্থী হয়, তবে সেই আইন অকার্যকর এবং নাগরিকদের তা মানতে বাধ্য করা উচিত নয়। তিনি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে বৈধ মনে করতেন, কারণ এটি ঈশ্বরের ইচ্ছা অনুযায়ী শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কাজ করে।
৬। রাষ্ট্র ও চার্চের সম্পর্ক: অগাস্টিনের যুগে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর চার্চের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তিনি চার্চকে ঐশ্বরিক রাজ্যের পার্থিব প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র হলো পার্থিব বিষয়াদি পরিচালনার জন্য আর চার্চ হলো মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের পথপ্রদর্শক। অগাস্টিন মনে করতেন যে, রাষ্ট্র ও চার্চের মধ্যে একটি সুষম সম্পর্ক থাকা উচিত, যেখানে চার্চ রাষ্ট্রের নৈতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। চার্চের ভূমিকা হলো রাষ্ট্রকে ঈশ্বরের পথে পরিচালিত করা এবং শাসকের নৈতিকতাকে সঠিক পথে রাখা। যদিও তিনি রাষ্ট্র ও চার্চের সম্পূর্ণ একীকরণ সমর্থন করেননি, তবে তিনি বিশ্বাস করতেন যে চার্চের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের পার্থিব ক্ষমতার চেয়ে উচ্চতর।
৭। স্বাধীন ইচ্ছা ও পাপ: অগাস্টিনের দর্শনে স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will) এবং পাপের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন, কিন্তু আদি পাপের পর সেই ইচ্ছা দূষিত হয়ে গেছে। মানুষ এখন তার নিজের ইচ্ছায় ভালো কাজ করার চেয়ে খারাপ কাজ করার দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। এই পাপপূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছাই সমাজে অন্যায়, সংঘাত এবং অবিচারের জন্ম দেয়। রাষ্ট্রকে তিনি এই দূষিত স্বাধীন ইচ্ছার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্য একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতেন। অগাস্টিনের মতে, কেবল ঈশ্বরের অনুগ্রহের মাধ্যমেই মানুষ তার পাপপূর্ণ ইচ্ছা থেকে মুক্তি পেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভূমিকা হলো এই পার্থিব জীবনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
৮। ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার: অগাস্টিন বিশ্বাস করতেন যে, পার্থিব রাষ্ট্রের কোনো শাসকের পক্ষে চূড়ান্ত বা নিখুঁত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কারণ, চূড়ান্ত ন্যায়বিচার কেবল ঈশ্বরের কাছেই আছে। পার্থিব রাষ্ট্রে মানুষ যে আইন ও বিচার ব্যবস্থা তৈরি করে, তা সব সময়ই অসম্পূর্ণ এবং পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। সত্যিকারের এবং সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার কেবল কেয়ামতের দিনে ঈশ্বরের বিচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয় এবং শাসকদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তাদের ক্ষমতা ও বিচার চূড়ান্ত নয়। এটি শাসকদের মধ্যে এক ধরনের নম্রতা এবং জবাবদিহিতার অনুভূতি তৈরি করে।
৯। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: অগাস্টিন মনে করতেন যে, কোনো পার্থিব শাসকের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমস্ত ক্ষমতা ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে এবং শাসকদের এই ক্ষমতা জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত। যদি কোনো শাসক তার ক্ষমতাকে অত্যাচার, অবিচার এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করে, তবে সে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করছে। যদিও অগাস্টিন সরাসরি বিদ্রোহের কথা বলেননি, তবে তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, ঈশ্বরের আইন লঙ্ঘনকারী শাসকের বৈধতা সীমিত। এই ধারণা মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক চিন্তায় শাসকদের ক্ষমতার ওপর নৈতিক এবং ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে সাহায্য করেছিল।
১০। খ্রিস্টানদের ভূমিকা: অগাস্টিন বিশ্বাস করতেন যে, খ্রিস্টানদের জন্য পার্থিব রাষ্ট্রে দুটি ভূমিকা রয়েছে। প্রথমত, একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা এবং শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করা। তিনি মনে করতেন, খ্রিস্টানদের উচিত সৎভাবে জীবনযাপন করা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করা। দ্বিতীয়ত, একজন আধ্যাত্মিক মানুষ হিসেবে তাদের প্রধান আনুগত্য থাকবে ঈশ্বরের প্রতি এবং ঐশ্বরিক রাজ্যের প্রতি। অগাস্টিন মনে করতেন, খ্রিস্টানরা পার্থিব রাজ্যে বসবাস করলেও তারা যেন নিজেদেরকে ঐশ্বরিক রাজ্যের ‘পর্যটক’ বা ‘যাত্রী’ মনে করে। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত আধ্যাত্মিক মুক্তি এবং ঐশ্বরিক রাজ্যে প্রবেশ করা।
১১। শান্তি ও যুদ্ধ: সেন্ট অগাস্টিন যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়েও আলোচনা করেছেন। তিনি একটি ‘ন্যায়সংগত যুদ্ধের’ (Just War) তত্ত্বের সূচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, যুদ্ধ কেবল তখনই ন্যায়সংগত হতে পারে যখন তা আত্মরক্ষা, অন্যায় প্রতিরোধ অথবা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ঈশ্বরের অনুমতি সাপেক্ষে করা হয়। যুদ্ধ কোনো প্রতিশোধ বা ব্যক্তিগত লোভের জন্য করা উচিত নয়। অগাস্টিন বিশ্বাস করতেন যে, সকল যুদ্ধের মূল কারণ হলো মানুষের পাপপূর্ণ প্রকৃতি। তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন, কিন্তু মনে করতেন যে, কিছু পরিস্থিতিতে শান্তি রক্ষার জন্য যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যুদ্ধের উদ্দেশ্য সর্বদা শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যায় দূর করা।
১২। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য: অগাস্টিনের মতে, রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। এটি পাপপূর্ণ মানুষের অহিতকর প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তবে, তিনি বিশ্বাস করতেন যে, রাষ্ট্র কেবল বাহ্যিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে, মানুষের মনের মধ্যে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। মনের প্রকৃত শান্তি কেবল ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস এবং ভালোবাসার মাধ্যমে আসে। অগাস্টিনের মতে, একটি রাষ্ট্র তখনই তার প্রকৃত উদ্দেশ্য সফলভাবে পালন করতে পারে, যখন সে তার নাগরিকদেরকে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয়।
১৩। ধর্ম ও রাজনীতি: অগাস্টিনের দর্শনে ধর্ম ও রাজনীতি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, রাজনীতিকে অবশ্যই ধর্মের নৈতিক ভিত্তি মেনে চলতে হবে। রাষ্ট্রের শাসক এবং আইনগুলি ঈশ্বরের নৈতিক আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত। অগাস্টিন মনে করতেন যে, ধর্ম ছাড়া রাজনীতি নৈতিকভাবে দিকনির্দেশনাহীন এবং এটি স্বৈরাচার ও অন্যায়ের দিকে পরিচালিত হতে পারে। তিনি রাষ্ট্রকে নৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য চার্চের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, একটি ন্যায়সংগত সমাজ গঠনের জন্য ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক উভয় শক্তিরই সহযোগিতা অপরিহার্য।
১৪। রাষ্ট্রের উৎপত্তি: সেন্ট অগাস্টিন মনে করতেন যে, আদি পাপের ফলস্বরূপ রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। আদি পাপের পর মানুষ যখন স্বার্থপর এবং সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একটি বাহ্যিক শক্তির প্রয়োজন হয়। এই বাহ্যিক শক্তিই হলো রাষ্ট্র। অগাস্টিন বলেন যে, যদি মানুষ পাপমুক্ত হতো, তবে রাষ্ট্রের প্রয়োজন হতো না। সবাই তখন নিজেদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্কে আবদ্ধ থাকতো। কিন্তু পাপপূর্ণ মানব সমাজের জন্য রাষ্ট্র একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান, যা ঈশ্বরের ইচ্ছানুসারে মানুষের মধ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে।
১৫। সম্পত্তির ধারণা: অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণাও স্থান পেয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আদি অবস্থায় সমস্ত সম্পত্তি সকলের জন্য সাধারণ ছিল। কিন্তু পাপের কারণে মানুষের মধ্যে লোভ ও স্বার্থপরতা তৈরি হয়, যার ফলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা উদ্ভব হয়। অগাস্টিনের মতে, রাষ্ট্র ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করতে পারে, কিন্তু এই অধিকারের ওপর নৈতিক এবং ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত। ধনী ব্যক্তিদের উচিত তাদের সম্পত্তিকে দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যবহার করা। তিনি সম্পদকে ঈশ্বরের দান হিসেবে দেখতেন, যা সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়া উচিত।
১৬। শাসনব্যবস্থার ধরন: অগাস্টিন কোনো নির্দিষ্ট ধরনের শাসনব্যবস্থাকে আদর্শ মনে করেননি। তিনি মনে করতেন যে, যেকোনো ধরনের শাসনব্যবস্থা—রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র বা গণতন্ত্র—যদি ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে তা ঈশ্বরের কাছে গ্রহণযোগ্য। তাঁর মতে, শাসনব্যবস্থার ধরন গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং শাসকের নৈতিকতা এবং তার উদ্দেশ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন সৎ ও ধার্মিক শাসক যেকোনো ব্যবস্থাতেই জনগণের কল্যাণ সাধন করতে পারে। অন্যদিকে, একজন অত্যাচারী ও অন্যায় শাসক যেকোনো ব্যবস্থাকেই জনগণের জন্য দুর্দশাগ্রস্ত করতে পারে। এই কারণে, অগাস্টিন শাসকের চরিত্রের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন।
১৭। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি: সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তাঁর ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মানব ইতিহাসকে ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখেছেন। মানব ইতিহাস হলো ঐশ্বরিক রাজ্য এবং পার্থিব রাজ্যের মধ্যে চলমান সংঘাতের ইতিহাস। অগাস্টিন বিশ্বাস করতেন যে, শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক রাজ্যই বিজয়ী হবে এবং এই পার্থিব রাজ্য একসময় বিলীন হয়ে যাবে। এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি রোমান সাম্রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে খ্রিস্টানদের মধ্যে এক ধরনের আশা ও ধৈর্য তৈরি করেছিল। তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, পার্থিব রাজ্যের পতন কোনো চূড়ান্ত পরাজয় নয়, বরং ঈশ্বরের বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি অংশ।
১৮। রোমান সাম্রাজ্যের পতন: সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন রোমান সাম্রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছিল। ৪০৫ সালে রোমান সাম্রাজ্যের উপর বারবার আক্রমণে তিনি বিচলিত হন। অনেকে এই পতনের জন্য খ্রিস্ট ধর্মকে দায়ী করেছিল। এর উত্তরে অগাস্টিন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The City of God’ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি বলেন যে, রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ী হয়েছে এবং এই পতন কোনো চূড়ান্ত বিপর্যয় নয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে তার অভ্যন্তরীণ পাপ ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে। অগাস্টিন দেখান যে, পার্থিব রাজ্যগুলি চিরন্তন নয় এবং তাদের পতন স্বাভাবিক ঘটনা। শুধুমাত্র ঈশ্বরের রাজ্যই চিরন্তন এবং শাশ্বত।
১৯। দাসপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্য: অগাস্টিন দাসপ্রথাকে পাপের ফল হিসেবে দেখেছেন। তিনি মনে করতেন যে, আদি অবস্থায় কোনো দাসপ্রথা ছিল না, কিন্তু পাপের কারণে সমাজে দাসপ্রথা এবং অন্যান্য সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। যদিও তিনি সরাসরি দাসপ্রথা উচ্ছেদের কথা বলেননি, তবে তিনি দাসদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা দেখানোর ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, দাস এবং তাদের মালিক উভয়ই ঈশ্বরের চোখে সমান। দাসদের প্রতি নিষ্ঠুরতা করা ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করা। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি দাসপ্রথাকে একটি অনৈতিক প্রথা হিসেবে দেখতে সাহায্য করেছিল এবং পরবর্তীকালে এর বিরুদ্ধে নৈতিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল।
২০। শাসকের কর্তব্য: অগাস্টিন শাসকের কয়েকটি প্রধান কর্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, শাসকের উচিত ঈশ্বরের আইন অনুযায়ী শাসন করা। দ্বিতীয়ত, তাকে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, তাকে জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং দরিদ্র ও দুর্বলদের রক্ষা করতে হবে। চতুর্থত, শাসককে অবশ্যই নিজের নৈতিকতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে শক্তিশালী করতে হবে। অগাস্টিন মনে করতেন যে, একজন ধার্মিক শাসকই কেবল এই কর্তব্যগুলি সঠিকভাবে পালন করতে পারে। শাসকের ক্ষমতা ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে, তাই তাকে ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
২১। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা: সেন্ট অগাস্টিন প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পক্ষে থাকলেও পরবর্তীকালে তিনি ধর্মীয় ভিন্নমত দমন করার পক্ষে মত দেন। তিনি মনে করতেন, চার্চের ঐক্যের জন্য ধর্মীয় ভিন্নমতকে দমন করা প্রয়োজন। ডোনাটিস্ট নামক একটি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাথে বিতর্কের সময় তিনি এই অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর মতে, ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তিরা যদি চার্চের ঐক্য নষ্ট করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ করা যেতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে ইনকুইজিশন এবং অন্যান্য ধর্মীয় দমনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা পশ্চিমা ইতিহাসে একটি বিতর্কিত বিষয়।
উপসংহার: সেন্ট অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন একদিকে যেমন খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের গভীর প্রভাব বহন করে, তেমনি তা মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করে। তাঁর ‘City of God’ এবং ‘City of Man’-এর ধারণা পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তাধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও উদ্দেশ্যকে ঈশ্বরের নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছেন যে, পার্থিব ক্ষমতা নিরঙ্কুশ নয়, বরং এটি ঈশ্বরের আইনের প্রতি দায়বদ্ধ। অগাস্টিনের রাষ্ট্রদর্শন, যা মানব প্রকৃতি, পাপ, ন্যায় ও শান্তির মতো মৌলিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত, আজও আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনে প্রাসঙ্গিক এবং সমালোচনার বিষয়।
- ১। পার্থিব ও ঐশ্বরিক রাজ্য
- ২। পাপ ও মানব প্রকৃতি
- ৩। ন্যায় ও শান্তি
- ৪। নিরপেক্ষ রাষ্ট্র
- ৫। আইন ও কর্তৃত্ব
- ৬। রাষ্ট্র ও চার্চের সম্পর্ক
- ৭। স্বাধীন ইচ্ছা ও পাপ
- ৮। ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার
- ৯। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
- ১০। খ্রিস্টানদের ভূমিকা
- ১১। শান্তি ও যুদ্ধ
- ১২। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য
- ১৩। ধর্ম ও রাজনীতি
- ১৪। রাষ্ট্রের উৎপত্তি
- ১৫। সম্পত্তির ধারণা
- ১৬। শাসনব্যবস্থার ধরন
- ১৭। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি
- ১৮। রোমান সাম্রাজ্যের পতন
- ১৯। দাসপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্য
- ২০। শাসকের কর্তব্য
- ২১। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা
সেন্ট অগাস্টিনের রাজনৈতিক দর্শন চতুর্থ শতকের শেষ ও পঞ্চম শতকের শুরুর দিকে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে বিকশিত হয়। এই সময়টা ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার এক যুগ। ৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি হিপ্পোর বিশপ নিযুক্ত হন। ৪০৫ সালে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যে জার্মানিক বারবার জাতিগোষ্ঠীর আক্রমণ, বিশেষ করে ৪১০ খ্রিস্টাব্দে ভিসিগথদের হাতে রোম লুণ্ঠন, খ্রিস্টানদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করত, রোমান সাম্রাজ্যের পতনের কারণ খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করা। এই বিতর্কিত পরিস্থিতির জবাবে সেন্ট অগাস্টিন ৪১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The City of God’ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি পার্থিব ও ঐশ্বরিক রাজ্যের ধারণা দিয়ে দেখান যে, রাষ্ট্রের পতন ঈশ্বরের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, এবং পার্থিব রাজ্যের পতন কোনো চূড়ান্ত বিপর্যয় নয়। এই গ্রন্থটি ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্কের এক শক্তিশালী জবাব, যা পরবর্তী হাজার বছর ধরে পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে।

