- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রস্তাবনা: মধ্যযুগের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ, সেন্ট টমাস একুইনাস, তার আইনি দর্শন দিয়ে মানব সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আইন হলো যুক্তির এক ধরনের আদেশ, যা সাধারণ মঙ্গলের জন্য তৈরি করা হয়। একুইনাসের মতে, আইন শুধু মানুষের তৈরি কোনো নিয়ম নয়, বরং এর উৎস ঐশ্বরিক ও প্রাকৃতিক যুক্তিতে নিহিত।
সেন্ট টমাস একুইনাস আইনকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করেছেন:
১. চিরন্তন আইন (Eternal Law):- এটি হলো ঈশ্বরের শাশ্বত জ্ঞান ও পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে তিনি সমগ্র মহাবিশ্বকে শাসন করেন। এই আইন মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। এটি চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় এবং সকল আইনের উৎস। সূর্যের গতি, গ্রহের আবর্তন, ঋতুর পরিবর্তন—সবকিছুই এই চিরন্তন আইনের অধীনে পরিচালিত হয়।
২. প্রাকৃতিক আইন (Natural Law):- চিরন্তন আইনের যে অংশ মানুষের যুক্তিবোধের মাধ্যমে বোঝা যায়, তাই হলো প্রাকৃতিক আইন। এটি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভূত। এই আইন মানুষকে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে ধারণা দেয়। যেমন: জীবন রক্ষা করা, সন্তান লালন-পালন করা, সত্য কথা বলা ইত্যাদি প্রাকৃতিক আইনের অন্তর্ভুক্ত।
৩. ঐশ্বরিক আইন (Divine Law):- এই আইন সরাসরি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে আসে এবং বাইবেল ও ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ঐশ্বরিক আইন প্রাকৃতিক আইনের পরিপূরক। এটি মানুষকে এমন কিছু বিষয়ে নির্দেশনা দেয়, যা প্রাকৃতিক আইন দ্বারা সম্পূর্ণরূপে বোঝা যায় না, যেমন: পরকালের জীবন, স্বর্গ বা নরক। এই আইন মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য অপরিহার্য।
৪. মানবীয় আইন (Human Law):- রাষ্ট্র বা সমাজের শাসকবর্গ কর্তৃক প্রণীত আইনই হলো মানবীয় আইন। এই আইন প্রাকৃতিক আইনের নীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। মানবীয় আইন মানুষের ব্যবহারিক জীবনের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তৈরি হয়, যেমন: ট্রাফিক আইন, চুক্তি আইন ইত্যাদি। একুইনাসের মতে, কোনো মানবীয় আইন যদি প্রাকৃতিক আইনের বিরুদ্ধে যায়, তবে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
শেষের কথা: সেন্ট টমাস একুইনাসের এই আইন শ্রেণিবিভাগ শুধু মধ্যযুগেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আধুনিক আইন ও রাজনৈতিক দর্শনেও এর প্রভাব অপরিসীম। তার এই তত্ত্ব আইনের নৈতিক ভিত্তি স্থাপন করে এবং আইনকে শুধু ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে না দেখে, বরং ন্যায় ও যুক্তির প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরে।
সেন্ট টমাস একুইনাস তার দর্শনে আইনকে চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন: চিরন্তন, প্রাকৃতিক, ঐশ্বরিক এবং মানবীয় আইন।
১৩ শতকে (আনুমানিক ১২২৫-১২৭৪) সেন্ট টমাস একুইনাস তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সুমা থিওলজিকা’-তে এই আইনতত্ত্ব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শনকে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করে এক নতুন চিন্তাধারা সৃষ্টি করেন, যা পরবর্তীতে ‘স্কলাসটিসিজম’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তার এই ধারণা আধুনিক আইনের নৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

