- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন ঘটে। রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ, জাতিগত সংঘাত, পারমাণবিক বিস্তার, সাইবার হুমকি, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সংকট নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা:
১। দ্বিমেরুর অবসান: স্নায়ুযুদ্ধকালে বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে দুটি শক্তিবলয়ে বিভক্ত ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই দ্বিমেরু নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় নতুন শক্তিসম্পর্ক, আঞ্চলিক সংঘাত এবং পরিবর্তিত কৌশলগত বাস্তবতা সৃষ্টি হয়।
২। মার্কিন প্রাধান্য: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, সামরিক জোট ও বিভিন্ন সংঘাতে দেশটির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। ফলে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বের প্রথম পর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একমেরুকেন্দ্রিক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৩। আঞ্চলিক সংঘাত: স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হলেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধ হয়নি। বলকান, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে জাতিগত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিরোধ নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে। ফলে বিশ্ব নিরাপত্তা রাষ্ট্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাতনির্ভর হয়ে ওঠে।
৪। সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি: স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা দেয়। সীমান্ত অতিক্রম করে পরিচালিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। এর ফলে গোয়েন্দা সহযোগিতা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসবিরোধী সামরিক তৎপরতার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
৫। পারমাণবিক বিস্তার: স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি দূর হয়নি। কিছু রাষ্ট্র নতুনভাবে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করে এবং পুরোনো শক্তিগুলো অস্ত্র আধুনিকায়ন অব্যাহত রাখে। ফলে পারমাণবিক বিস্তার রোধ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণ বিশ্ব নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে থেকে যায়।
৬। জাতিগত সংঘাত: বহু রাষ্ট্রে জাতিগত পরিচয়, ভাষা, ধর্ম ও রাজনৈতিক অধিকারকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ সংঘাত বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি মানব নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু অধিকার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্ব লাভ করে।
৭। গৃহযুদ্ধ বিস্তার: স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অনেক দেশে সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। এসব সংঘাত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করে এবং আইনশৃঙ্খলা ভেঙে ফেলে। এর ফলে শরণার্থী সমস্যা, অস্ত্র পাচার, সন্ত্রাস ও মানবিক বিপর্যয় আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করে।
৮। ন্যাটোর সম্প্রসারণ: স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ন্যাটো বিলুপ্ত না হয়ে বরং পূর্ব ইউরোপের দিকে সম্প্রসারিত হয়। এতে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী হলেও রাশিয়ার সঙ্গে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ফলে ইউরোপীয় নিরাপত্তায় পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে নতুন ভূরাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেয়।
৯। রাশিয়ার পুনরুত্থান: প্রথমদিকে দুর্বল হয়ে পড়লেও রাশিয়া ধীরে ধীরে সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধার করে। পারমাণবিক শক্তি, জ্বালানি সম্পদ ও আঞ্চলিক প্রভাব ব্যবহার করে দেশটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা আবার তীব্র হয়।
১০। চীনের উত্থান: দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামরিক আধুনিকায়নের মাধ্যমে চীন বিশ্ব নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশটির প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
১১। সাইবার হুমকি: তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সাইবার আক্রমণ নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও সামরিক তথ্যভান্ডার হ্যাকিংয়ের শিকার হতে পারে। ফলে নিরাপত্তা এখন শুধু স্থল, জল বা আকাশে সীমিত নয়; ডিজিটাল জগতেও বিস্তৃত হয়েছে।
১২। মানব নিরাপত্তা: স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে মানুষকেন্দ্রিক হয়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, পরিবেশ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানবাধিকারকেও নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখা হয়। ফলে একজন মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
১৩। শরণার্থী সংকট: যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক নির্যাতন ও দুর্যোগের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশত্যাগ বা বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে। এতে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে। ফলে শরণার্থী ও অভিবাসন সমস্যা আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
১৪। জলবায়ু হুমকি: জলবায়ু পরিবর্তনকে বর্তমানে নিরাপত্তার একটি বড় অপ্রচলিত হুমকি হিসেবে দেখা হয়। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, পানিসংকট ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব সমস্যা বাস্তুচ্যুতি ও সম্পদসংক্রান্ত সংঘাত বাড়িয়ে নিরাপত্তাকে দুর্বল করে।
১৫। মহামারি ঝুঁকি: সংক্রামক রোগ ও বৈশ্বিক মহামারি দেখিয়েছে যে স্বাস্থ্য সমস্যাও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অংশ। রোগের দ্রুত বিস্তার অর্থনীতি, যোগাযোগ, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা ও জরুরি প্রস্তুতি নিরাপত্তার নতুন উপাদান হয়ে উঠেছে।
১৬। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার অপরাধ ও মহামারির মতো হুমকি কোনো রাষ্ট্র একা মোকাবিলা করতে পারে না। তাই জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা ও বিভিন্ন জোটের মাধ্যমে নিরাপত্তা সহযোগিতা বেড়েছে। তথ্য বিনিময়, শান্তিরক্ষা ও যৌথ উদ্যোগের গুরুত্বও ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
১৭। বহুমাত্রিক নিরাপত্তা: স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্ব নিরাপত্তা এখন আর শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও মানবাধিকারের মতো বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। ফলে বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগের তুলনায় বেশি জটিল, বিস্তৃত এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
উপসংহার: স্নায়ুযুদ্ধের অবসান বিশ্বে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি; বরং নিরাপত্তার হুমকির ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ, সাইবার আক্রমণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সংকট নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তাই সমন্বিত, বহুপাক্ষিক ও মানবকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাই বর্তমান বিশ্বের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।