- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ একটি অত্যন্ত জটিল ও বহুল আলোচিত অধ্যায়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন এই রাষ্ট্রে বারবার গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হয়েছে সেনাশাসনের আগমনে। মূলত বেসামরিক প্রশাসনের দুর্বলতা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সুযোগেই বারবার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে সামরিক বাহিনী।
সামরিক হস্তক্ষেপের প্রধান কারণসমূহ
১। রাজনৈতিক অস্থিরতা: স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল। দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সংঘাত এবং পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন নিজেদের মধ্যকার কোন্দল ও দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অজুহাতে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা হস্তগত করার সুযোগ পায়।
২। নেতৃত্বের শূন্যতা: পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশ এক ভয়াবহ ও অভূতপূর্ব নেতৃত্বের সংকটে পড়ে। অভিজ্ঞ এবং দূরদর্শী রাজনৈতিক অভিভাবকের এই আকস্মিক অনুপস্থিতি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে এক গভীর দিশেহারা ভাব ও শূন্যতার মধ্যে ঠেলে দেয়। এই চরম নেতৃত্বহীনতার সুযোগ নিয়ে উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পথ প্রশস্ত করেন।
৩। বেসামরিক দুর্বলতা: সদ্য স্বাধীন দেশের বেসামরিক প্রশাসন রাষ্ট্র পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি, চোরাচালান, কালোবাজারি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের তীব্র সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। বেসামরিক সরকারের এই প্রশাসনিক শিথিলতা এবং সার্বিক ব্যর্থতা সামরিক বাহিনীকে দেশের শাসনভার হাতে তুলে নেওয়ার একটি বড় অজুহাত জুগিয়েছিল।
৪। অর্থনৈতিক বিপর্যয়: যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেশকে এক চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তৎকালীন বেসামরিক সরকার এই বিশাল অর্থনৈতিক সংকট ও জনদুর্ভোগ মোকাবিলায় কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারেনি। ফলে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়, যা সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য একটি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।
৫। প্রাতিষ্ঠানিক অনুন্নয়ন: বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ সঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন, সংসদ কিংবা বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলো শুরু থেকেই দুর্বল ও ক্ষমতাসীনদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে রাজনৈতিক সংকটগুলো আইনি বা সাংবিধানিক উপায়ে সমাধান করা সম্ভব হয়নি, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে সামরিক শক্তি ক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভূত হয়।
৬। উচ্চাভিলাষী মনোভাব: সামরিক বাহিনীর ভেতরের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা হস্তক্ষেপের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। তারা নিজেদেরকে দেশের একমাত্র ত্রাণকর্তা মনে করতেন এবং বেসামরিক নেতাদের চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য ভাবতেন। এই মনস্তাত্ত্বিক অহংকার এবং ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাদেরকে বারবার ব্যারাকে বন্দি না থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে প্ররোচিত করেছিল।
৭। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সামরিক কর্মকর্তাদের একাংশের মধ্যে এক ধরনের বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ বা গর্ব কাজ করত। তারা মনে করতেন যে দেশ স্বাধীনতায় তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, অথচ বেসামরিক শাসনে তারা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। এই অসন্তোষ এবং দেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় নিজেদের মূল অংশীদার ভাবার প্রবণতা তাদেরকে সরাসরি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করে।
৮। বিদেশী প্রভাব: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ক্ষমতার পটপরিবর্তনে তৎকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর পরোক্ষ প্রভাব ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। স্নায়ুযুদ্ধের ওই সময়ে অনেক বিদেশী রাষ্ট্র তাদের নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশে একটি শক্ত ও অনুগত সামরিক শাসন দেখতে চেয়েছিল। এই ধরনের বাহ্যিক সমর্থন বা সবুজ সংকেত সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা লোভী অংশকে ক্যু বা অভ্যুত্থান ঘটাতে দারুণভাবে উৎসাহিত করেছিল।
৯। আইনশৃঙ্খলা অবনতি: দেশের ভেতরে চরম আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, গুপ্তহত্যা এবং রাজনৈতিক ক্যাডারদের সহিংসতা সাধারণ মানুষের মনে এক তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছিল। সাধারণ মানুষ যখন দেখল বেসামরিক সরকার তাদের জানমালের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে পারছে না, তখন তারা বিকল্প খুঁজতে শুরু করে। এই অরাজক পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে সামরিক বাহিনী খুব সহজেই জনগণের সামনে নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়।
১০। দুর্নীতি বৃদ্ধি: তৎকালীন সময়ে সরকারি ও প্রশাসনিক স্তরে ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং কালোবাজারি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছিল। এতে করে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয় এবং সাধারণ জনগণের সাথে শাসকগোষ্ঠীর এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়। সামরিক বাহিনী এই দুর্নীতি দূর করার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্লোগান দিয়ে খুব সহজেই ক্ষমতা দখল করে এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে।
১১। উপদলীয় কোন্দল: সামরিক বাহিনীর ভেতরেই জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অফিসারদের মধ্যে তীব্র উপদলীয় কোন্দল ও দলাদলি বিদ্যমান ছিল। এই অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার লড়াই প্রায়শই রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের রূপ ধারণ করত। এক দল আরেক দলকে হটিয়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার এই নোংরা প্রতিযোগিতাই বারবার সামরিক হস্তক্ষেপকে ডেকে এনেছিল।
১২। রক্ষীবাহিনী গঠন: তৎকালীন সরকারের জাতীয় রক্ষীবাহিনী নামক একটি সমান্তরাল বিশেষ বাহিনী গঠন নিয়মিত সামরিক বাহিনীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দেয়। সেনাবাহিনী মনে করত এই বাহিনী তাদের সমান্তরাল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে এবং এর ফলে তাদের নিজস্ব গুরুত্ব ও মর্যাদা হ্রাস পাচ্ছে। সেনাবাহিনীর বাজেট ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির পেছনে রক্ষীবাহিনীকে দায়ী করে তারা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
১৩। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ: বেসামরিক সরকারের আমলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ এবং একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের ফলে মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ না থাকায় দেশের ভেতরে এক দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার পরিবর্তনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামরিক অভ্যুত্থানই ক্ষমতা বদলের একমাত্র বিকল্প মাধ্যম হয়ে ওঠে।
১৪। নির্বাচনী জালিয়াতি: নির্বাচনের ওপর থেকে জনগণের আস্থা হারিয়ে যাওয়া সামরিক হস্তক্ষেপের পেছনে একটি অত্যন্ত বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। যখনই সাধারণ মানুষ দেখল যে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হচ্ছে না এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, তখন তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই সুযোগে সামরিক বাহিনী দাবি করে যে তারা একটি সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য সাময়িকভাবে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে।
১৫। আমলাতান্ত্রিক সমর্থন: বেসামরিক আমলারা যখন রাজনৈতিক নেতাদের অদক্ষতায় অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন, তখন তারা পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানান। আমলাতন্ত্র সবসময় নিজেদের ক্ষমতা ও পদের স্থায়িত্ব চায়, যা তারা একজন শক্তিশালী সামরিক শাসকের অধীনে বেশি নিরাপদ মনে করত। সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের এই গোপন আঁতাত এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া সামরিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করেছিল।
১৬। জনগণের হতাশা: ক্রমাগত রাজনৈতিক সহিংসতা, হরতাল, মারামারি এবং অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার কারণে সাধারণ জনগণের মনে বেসামরিক রাজনীতির প্রতি চরম ক্লান্তি ও হতাশা চলে এসেছিল। মানুষ যেকোনো মূল্যে তাদের দৈনন্দিন জীবনে একটু শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা কামনা করছিল। জনগণের এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা এবং রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণাকে কাজে লাগিয়েই সামরিক বাহিনী খুব সহজে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পেরেছিল।
১৭। বিচারহীনতার সংস্কৃতি: সমাজে আইন ও বিচারের শাসন ভেঙে পড়া এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার ঘটনা সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। যখন অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াত আর সাধারণ মানুষ বিচার পেত না, তখন মানুষ কঠোর কোনো শাসনের প্রত্যাশা করত। সামরিক বাহিনী এসে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির আশ্বাস দিয়ে জনগণের এই সেন্টিমেন্টকে নিজেদের ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ কোনো একক কারণে ঘটেনি, বরং এটি ছিল বহুবিধ রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার যৌথ ফল। বারবার সামরিক শাসন দেশের দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং পেছনের দিকে ধাবিত করেছে। একটি টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে ব্যারাকে সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব বজায় রাখা এবং রাজনীতিতে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের হাতকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।