- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার নতুন বিন্যাস গড়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য, চীনের উত্থান, রাশিয়ার পুনরুত্থান, আঞ্চলিক শক্তির বিকাশ ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়।
স্নায়ু যুদ্ধোত্তর বিশ্বের নতুন আন্তর্জাতিক ক্ষমতা বিন্যাস:
১। দ্বিমেরুর অবসান: স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে বিশ্ব দুটি শক্তিবলয়ে বিভক্ত ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই দ্বিমেরু কাঠামোর অবসান ঘটে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার পুরোনো ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়ে নতুন শক্তি বিন্যাসের সূচনা হয়।
২। মার্কিন প্রাধান্য: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। আন্তর্জাতিক সংকট, নিরাপত্তা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে দেশটির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এর ফলে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বের প্রথম পর্যায়ে একটি একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
৩। রাশিয়ার অবস্থান: সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি হিসেবে রাশিয়া প্রথমদিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে বিশাল সামরিক শক্তি, পারমাণবিক অস্ত্র ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার গুরুত্ব বজায় থাকে। পরবর্তী সময়ে রাশিয়া আবার বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে।
৪। চীনের উত্থান: দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও সামরিক আধুনিকায়নের মাধ্যমে চীন একটি প্রধান বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগেও দেশটির প্রভাব বেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় চীন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করছে।
৫। ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কূটনীতিতে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর যৌথ বাজার ও রাজনৈতিক সহযোগিতা এর প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমতুল্য না হলেও বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে এর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।
৬। জাপানের প্রভাব: স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে জাপান সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। উন্নত শিল্প, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে দেশটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষমতাও বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
৭। ভারতের উত্থান: বিশাল জনসংখ্যা, দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, পারমাণবিক সক্ষমতা ও সামরিক শক্তির কারণে ভারত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি হয়ে উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও মহাকাশ খাতেও দেশটির অগ্রগতি রয়েছে। ফলে নতুন আন্তর্জাতিক ক্ষমতা বিন্যাসে ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
৮। আঞ্চলিক শক্তি: স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে ব্রাজিল, তুরস্ক, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো আঞ্চলিক শক্তির গুরুত্ব বেড়েছে। তারা নিজ নিজ অঞ্চলের রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষমতা কয়েকটি বৃহৎ রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।
৯। ন্যাটোর সম্প্রসারণ: স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হলেও ন্যাটো বিলুপ্ত হয়নি; বরং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রকে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে এর পরিসর বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় পশ্চিমা শক্তির প্রভাব বেড়েছে। একই সঙ্গে ন্যাটোর সম্প্রসারণ রাশিয়া ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নতুন উত্তেজনাও সৃষ্টি করেছে।
১০। অর্থনৈতিক শক্তি: স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে শুধু সামরিক শক্তি নয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতাও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের প্রভাব নির্ধারণ করছে। ফলে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন বিশ্বব্যবস্থার ক্ষমতা বিন্যাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
১১। বিশ্বায়নের প্রভাব: বিশ্বায়নের ফলে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে। শক্তিশালী অর্থনীতি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে। এতে প্রচলিত সামরিক শক্তির পাশাপাশি বাজার, প্রযুক্তি ও তথ্য নিয়ন্ত্রণও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
১২। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান: জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠান স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রাষ্ট্রগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থনীতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তাবিষয়ক সিদ্ধান্তে অংশ নেয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবও আন্তর্জাতিক ক্ষমতা বিন্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
১৩। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান: বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানি বিশ্ব অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ছোট রাষ্ট্রের অর্থনীতির তুলনায়ও বড়। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কেবল রাষ্ট্র নয়, বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করেছে।
১৪। অরাষ্ট্রীয় শক্তি: সন্ত্রাসী সংগঠন, আন্তর্জাতিক এনজিও, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনও স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তারা রাষ্ট্রের বাইরে থেকেও নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও জনমতকে প্রভাবিত করে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ধারণা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে আরও বিস্তৃত ও জটিল হয়েছে।
১৫। নতুন নিরাপত্তা: স্নায়ুযুদ্ধের পর নিরাপত্তার ধারণা শুধু সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সন্ত্রাসবাদ, সাইবার আক্রমণ, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি ও জ্বালানি সংকট গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা নতুন ক্ষমতা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক তৈরি করছে।
১৬। বহুমেরুর বিকাশ: যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন প্রধান শক্তি থাকলেও চীন, রাশিয়া, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাব বৃদ্ধির কারণে বিশ্ব ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিক রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন শক্তি অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষমতা আগের তুলনায় আরও ছড়িয়ে পড়েছে।
১৭। নতুন ভারসাম্য: বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো একটি শক্তি সব ক্ষেত্রে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা পাশাপাশি চলছে। ফলে পরিবর্তনশীল ও জটিল এক নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
উপসংহার: স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে দ্বিমেরু ব্যবস্থার অবসান ঘটলেও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা শেষ হয়নি। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রাধান্য দেখা দিলেও পরে চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য শক্তির উত্থান ঘটেছে। ফলে বর্তমান বিশ্ব ক্রমে বহুমেরুকেন্দ্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।