- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যহীনতার পেছনে দারিদ্র্য, অপুষ্টি, দূষণ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, চিকিৎসার অপ্রতুলতা ও সচেতনতার অভাব গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এসব সমস্যা দূর করতে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যহীনতার কারণ ও প্রতিকারসমূহ:
১। দারিদ্র্য: দারিদ্র্যের কারণে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারে না। ফলে ছোট রোগও বড় সমস্যায় পরিণত হয়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আয় বাড়ানো এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
২। অপুষ্টি: শিশু, নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপুষ্টি স্বাস্থ্যহীনতার একটি বড় কারণ। প্রয়োজনীয় আমিষ, ভিটামিন ও খনিজের অভাবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। পুষ্টিকর খাদ্যের সহজলভ্যতা, মাতৃ ও শিশুপুষ্টি কর্মসূচি এবং খাদ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ালে অপুষ্টি কমানো সম্ভব।
৩। দূষিত পানি: বিশুদ্ধ পানির অভাব ও দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপদ পানির উৎস বৃদ্ধি, পানি শোধন, স্যানিটেশন উন্নয়ন এবং জলাশয় দূষণ বন্ধ করলে এসব রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব এবং জনস্বাস্থ্য উন্নত হয়।
৪। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ: অপরিচ্ছন্ন বসবাস, খোলা নালা, জমে থাকা ময়লা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিভিন্ন রোগের বিস্তার ঘটায়। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকার ও জনগণের যৌথ উদ্যোগে বাসযোগ্য ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
৫। বায়ুদূষণ: যানবাহন, ইটভাটা, নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যহীনতার বড় কারণ। দূষিত বাতাস শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব যানবাহন, বৃক্ষরোপণ এবং নির্গমন কমানোর মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
৬। চিকিৎসক সংকট: দেশের অনেক গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব রয়েছে। ফলে মানুষ সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় না। চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা বাড়ানো, গ্রামে পদায়ন নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র শক্তিশালী করলে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা সম্ভব।
৭। হাসপাতাল সংকট: জনসংখ্যার তুলনায় অনেক এলাকায় হাসপাতাল, শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। এতে রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়তে হয়। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
৮। চিকিৎসা ব্যয়: চিকিৎসা ও ওষুধের উচ্চ খরচ অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থের অভাবে অনেকে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রাখে বা চিকিৎসাই নেয় না। সরকারি হাসপাতালে সাশ্রয়ী সেবা, বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করলে এ সমস্যা কমানো যায়।
৯। সচেতনতার অভাব: স্বাস্থ্যবিধি, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি ও চিকিৎসা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব অনেক অসুস্থতার কারণ। মানুষকে হাত ধোয়া, বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার, স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ ও সময়মতো চিকিৎসার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
১০। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য: অতিরিক্ত তেল, লবণ, চিনি, ফাস্টফুড ও ভেজাল খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এসব খাবার স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। নিরাপদ খাদ্য আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে প্রচার বাড়ালে এ সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
১১। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: ব্যায়ামের অভাব ও দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এতে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, খেলাধুলা এবং কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় জীবনধারা গড়ে তোলার মাধ্যমে এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব।
১২। ধূমপান আসক্তি: ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার ক্যানসার, ফুসফুস ও হৃদ্রোগের বড় কারণ। তামাকের সহজলভ্যতা ও সামাজিক অভ্যাস সমস্যাকে বাড়ায়। তামাকবিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, কর বৃদ্ধি এবং তরুণদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ালে তামাকজনিত রোগ কমানো সম্ভব।
১৩। মাদকাসক্তি: মাদকাসক্তি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তরুণরা এ সমস্যায় বেশি ঝুঁকিতে থাকে। মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, পুনর্বাসন কেন্দ্র বৃদ্ধি, পারিবারিক নজরদারি ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করলে মাদকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো যায়।
১৪। মানসিক চাপ: বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পারিবারিক সমস্যা ও কর্মক্ষেত্রের চাপ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিষণ্নতা ও উদ্বেগ অনেক সময় অচিহ্নিত থেকে যায়। সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরামর্শ কেন্দ্র এবং সামাজিক সহায়তা বাড়ালে মানুষের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
১৫। মাতৃস্বাস্থ্য দুর্বলতা: গর্ভাবস্থায় পুষ্টির ঘাটতি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা এবং দক্ষ প্রসবসেবার অভাবে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। প্রতিটি গর্ভবতী নারীকে নিয়মিত পরীক্ষা, পুষ্টি সহায়তা, নিরাপদ প্রসব এবং জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করলে মাতৃস্বাস্থ্য উন্নত করা সম্ভব।
১৬। রোগ প্রতিরোধ ঘাটতি: টিকাদান, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রাথমিক রোগ শনাক্তকরণে ঘাটতি থাকলে অনেক রোগ জটিল হয়ে যায়। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের প্রয়োজনীয় টিকা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হলে চিকিৎসার চাপ ও ব্যয় কমে।
১৭। স্বাস্থ্য বৈষম্য: শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগে বড় পার্থক্য রয়েছে। দরিদ্র, চর, হাওর ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ তুলনামূলক কম সেবা পায়। এসব এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক, টেলিমেডিসিন, চিকিৎসক ও ওষুধের সরবরাহ বাড়ালে স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কমিয়ে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব।
উপসংহার: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যহীনতার কারণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নানা সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। শুধু হাসপাতাল বাড়ালেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও রোগ প্রতিরোধে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগেই একটি সুস্থ জাতি গড়ে তোলা সম্ভব।