- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রকাকথা: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়, যা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এর পেছনে কাজ করেছিল এক দশকের সামরিক শাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের মতো বহু কারণ। ভাষা আন্দোলনের পর এটিই ছিল বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় আন্দোলন, যা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথে এক অবিস্মরণীয় পটভূমি তৈরি করেছিল।
১। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন: ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন। তার এক দশকের স্বৈরাচারী শাসনে জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়, রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করা হয় এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দমন করা হয়। আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ছিল গণতন্ত্রের একটি প্রহসন, যা জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে সীমিত করে রেখেছিল। এই স্বৈরাচারী শাসন জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দেয়।
২। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ: পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা হচ্ছিল। পূর্ব বাংলার পাট, চা, তামাকসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে পূর্ব পাকিস্তানকে চরমভাবে অবহেলা করা হয়, যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছিল। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য জনগণের মধ্যে ক্ষোভের বারুদ তৈরি করে।
৩। ৬ দফা আন্দোলন ও শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা: ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই দফাগুলো পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক স্বশাসনের দাবি করে। ৬ দফা বাঙালির মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই কর্মসূচির জনপ্রিয়তা শাসকগোষ্ঠীর জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: ৬ দফা আন্দোলনের তীব্রতা দমনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে। এই মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়, অভিযোগ ছিল তারা ভারতের সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র করছেন। এই মিথ্যা মামলা ছিল জনগণের প্রতি একটি সরাসরি আঘাত এবং এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
৫। শিক্ষাক্ষেত্রে অসন্তোষ: আইয়ুব খানের শিক্ষানীতি ছাত্রদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, উচ্চশিক্ষা সীমিতকরণ এবং ছাত্রদের অধিকার হরণকারী বিভিন্ন পদক্ষেপ ছাত্রদের আন্দোলনকে উস্কে দেয়। ১৯৬২ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট এবং পরবর্তীকালে ছাত্রদের উপর দমন-পীড়ন ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ করে এবং তারা গণঅভ্যুত্থানের অগ্রভাগে চলে আসে।
৬। রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতা ও ঐক্যবদ্ধতা: আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের কারণে তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলো অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবে, ৬ দফা আন্দোলনের পর বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল যেমন আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (ভাসানী), ন্যাপ (মোজাফ্ফর), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। এই ঐক্যবদ্ধতা গণআন্দোলনের জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।
৭। গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ: সামরিক শাসনামলে গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশন সরকারের প্রচারণামূলক যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং যেকোনো ভিন্নমতকে দমন করা হতো। জনগণের মধ্যে তথ্য প্রবাহ সীমিত হওয়ায় গুজব ছড়িয়ে পড়ত এবং এর ফলে অসন্তোষ আরও বাড়ত।
৮। আঞ্চলিক বৈষম্য ও অবহেলা: কেবল অর্থনীতিতেই নয়, চাকরির ক্ষেত্রে, সামরিক বাহিনীতে এবং প্রশাসনিক পদেও বাঙালিদের প্রতি চরম বৈষম্য করা হতো। পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি চাকরিতে বাঙালিদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। এই আঞ্চলিক বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে বঞ্চনার তীব্র অনুভূতি তৈরি করে, যা গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ ছিল।
৯। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের উপর নিষেধাজ্ঞা: পাকিস্তান সরকার বাঙালির সংস্কৃতিকে ‘হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার চেষ্টা করে। রবীন্দ্রসংগীত বন্ধ করার প্রচেষ্টা, বাংলা নববর্ষের উদযাপনকে সীমিত করার উদ্যোগ বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে হুমকির মুখে ফেলে। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বাঙালির মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়।
পরিসমাপ্তি: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা এবং স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ৬ দফা আন্দোলন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এই অভ্যুত্থানের মূল পটভূমি তৈরি করেছিল। এই আন্দোলন শুধু আইয়ুব শাহীর পতনই ঘটায়নি, বরং বাঙালি জাতীয়তাবাদকে এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথকে প্রশস্ত করেছিল।
- 📰 আইয়ুব খানের সামরিক শাসন
- 💸 অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ
- 📜 ৬ দফা আন্দোলন ও শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা
- ⚖️ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
- 🧑🎓 শিক্ষাক্ষেত্রে অসন্তোষ
- 🤝 রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতা ও ঐক্যবদ্ধতা
- 📰 গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ
- 🗺️ আঞ্চলিক বৈষম্য ও অবহেলা
- 🎭 বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের উপর নিষেধাজ্ঞা
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয় ১৯৬৮ সালের শেষ দিকে, বিশেষত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিক্রিয়ায়। এই গণঅভ্যুত্থান ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের শহীদ হওয়ার পর (শার্টে রক্তমাখা) এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. শামসুজ্জোহার শাহাদাত বরণের পর আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এই আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পথ খুলে দেয়।

