- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল অবিভক্ত পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম এবং শেষ সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচন কেবল একটি ভোট যুদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা এবং স্বাধিকার আন্দোলনের এক চূড়ান্ত গণতান্ত্রিক বহিঃপ্রকাশ। এই নির্বাচনের ফলাফলই পরবর্তীকালে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে সম্পূর্ণ অনিবার্য করে তুলেছিল।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
১। ঐতিহাসিক পটভূমি: এই নির্বাচনের পেছনে ছিল দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ‘৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ‘৬৬-এর ছয় দফা এবং ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনগণের তীব্র ক্ষোভ প্রশমিত করতে এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। এটি ছিল বাঙালির দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের এক আইনি ও গণতান্ত্রিক স্বীকৃতি।
২। আওয়ামী লীগের ম্যান্ডেট: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে ছয় দফার ভিত্তিতে অংশ নেয়। ছয় দফা ছিল বাঙালির স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির এক অনন্য সনদ। নির্বাচনের মূল স্লোগান ও লক্ষ্যই ছিল এই ছয় দফার প্রতি জনগণের রায় সংগ্রহ করা। বাঙালি জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কর্মসূচিকে সমর্থন জানায় এবং এটিকে তাদের মুক্তির একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে।
৩। ভোটের পরিসংখ্যান: ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পরিষদের মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৬২টি আসন। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসনে এককভাবে জয়লাভ করে। এই বিপুল জয় বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এবং এটি দলটির প্রতি জনগণের অগাধ বিশ্বাসের প্রতীক।
৪। নারী আসনের জয়: সাধারণ আসনের পাশাপাশি জাতীয় পরিষদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ছিল মোট ১৩টি। পূর্ব পাকিস্তানের এই ১৩টি সংরক্ষিত আসনের সবকটিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। ফলে জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৭৫টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই বিজয় প্রমাণ করে যে দেশের নারী সমাজও স্বাধিকার আন্দোলনে সমভাবে অংশ নিয়েছিল।
৫। প্রাদেশিক পরিষদের ফলাফল: প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় সাফল্যের স্বাক্ষর রাখে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে। এই বিশাল জয় প্রমাণ করে যে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি কতটা অনুগত ও নিবেদিতপ্রাণ ছিল।
৬। পশ্চিম পাকিস্তানের চিত্র: পূর্ব পাকিস্তানে যখন আওয়ামী লীগের জয়জয়কার, তখন পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) জাতীয় পরিষদে ৮১টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ফলাফল স্পষ্ট করে দেয় যে, পাকিস্তানের দুই অংশের রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং জনমত সম্পূর্ণ দুই মেরুতে অবস্থান করছিল।
৭। একক নেতৃত্বের স্বীকৃতি: এই নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির একমাত্র ও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতি পান। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, ত্যাগ এবং দূরদর্শিতার প্রতি দেশের আপামর জনসাধারণ পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে। নির্বাচনটি কার্যত বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ওপর জনগণের একটি বিশাল গণভোট বা ম্যান্ডেট ছিল।
৮। ছয় দফার অনুমোদন: আওয়ামী লীগের এই বিশাল বিজয় ছিল মূলত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচির প্রতি জনগণের প্রকাশ্য ও আইনি অনুমোদন। ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছিলো যে তারা কেন্দ্রের শোষণ থেকে মুক্তি চায় এবং পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন অর্জনে বদ্ধপরিকর। এই রায়ের পর ছয় দফাকে উপেক্ষা করার বা বাতিল করার কোনো নৈতিক অধিকার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আর অবশিষ্ট ছিল না।
৯। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ: ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত ও সফল বিকাশ। ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জীর্ণ কাঠামোকে ভেঙে বাঙালিরা তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে। এই নির্বাচন প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক দূরত্ব এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্যের কারণে পাকিস্তানের দুই অংশ আসলে কখনোই এক রাষ্ট্র হতে পারেনি।
১০। দ্বি-জাতি তত্ত্বের মৃত্যু: ১৯৪৭ সালে জিন্নাহর যে ‘দ্বি-জাতি তত্ত্বের’ ভিত্তিতে ধর্মকে পুঁজি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, এই নির্বাচন তার চিরতরে মৃত্যু ঘটায়। বাঙালিরা প্রমাণ করে যে শুধু ধর্মীয় মিল একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়, যদি সেখানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার না থাকে। নির্বাচনটি পাকিস্তানের শাসক শ্রেণীর ধর্মীয় আবেগ খাটিয়ে শোষণ করার রাজনীতির অবসান ঘটায়।
১১। সামরিক জান্তার ষড়যন্ত্র: নির্বাচনের এই অভাবনীয় ফলাফল পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক চক্রকে চরমভাবে হতভম্ব ও আতঙ্কিত করে তোলে। তারা কখনোই আশা করেনি যে একটি বাঙালি দল সমগ্র পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে। ফলে তারা বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার জন্য পর্দার আড়ালে নানা রকম ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও নীল নকশা বুনতে শুরু করে।
১২। অধিবেশন স্থগিতের প্রতিক্রিয়া: ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার কথা থাকলেও ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এই অন্যায় ও স্বৈরাচারী ঘোষণার সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সাধারণ জনগণ বুঝতে পারে যে গণতান্ত্রিক উপায়ে পাকিস্তানিরা কখনোই বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না, ফলে আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়।
১৩। অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা: অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ মার্চ থেকে দেশব্যাপী সর্বাত্মক ও ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। সরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের পুরো শাসনভার ইয়াহিয়া সরকারের হাত থেকে চলে যায় এবং তা বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করে।
১৪। ৭ মার্চের ভাষণ: অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ এবং ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করেন। তিনি ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই বজ্রকণ্ঠের ভাষণটি ছিল মূলত পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক, যা নির্বাচনের রায়ের ওপর ভিত্তি করেই আইনগত বৈধতা পেয়েছিল।
১৫। গণতান্ত্রিক বৈধতা অর্জন: ১৯৭০ সালের এই নির্বাচনটি বাঙালি জাতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও নৈতিক অবস্থান তৈরি করে দিয়েছিল। বিশ্ববাসী দেখতে পেয়েছিল যে বাঙালিরা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী নয়, বরং তারা নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে বিজয়ী একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন বাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালায়, তখন বিশ্ব দরবারে তারা গণহত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়।
১৬। স্বাধীনতার মূল ভিত্তি: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রত্যক্ষ ও যৌক্তিক পরিণতিই ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। নির্বাচনে প্রাপ্ত গণরায়ের কারণেই বাঙালি জাতি পরবর্তীতে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার নৈতিক সাহস ও অধিকার পেয়েছিল। এই নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট ফলাফল না থাকলে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়তো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেতে অনেক বেশি বেগ পেত।
নতুন রাষ্ট্রের জন্ম: নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংকটের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর একটি নতুন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনই ছিল সেই স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম এবং প্রধান গণতান্ত্রিক ভিত্তিপ্রস্তর।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার এক মহাজাগরণ। এই নির্বাচনের ঐতিহাসিক ফলাফলই পাকিস্তানের কৃত্রিম রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দেয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করে। ব্যালট বিপ্লবের সেই মহান রায়ই পরবর্তীকালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকায় রূপান্তরিত হয়।