- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি সদ্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য সংবিধান হলো তার সর্বোচ্চ দলিল ও পথপ্রদর্শক। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পর পরই একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে নিজেদের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক।
১৯৭২ সালের বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ার বিবরণ:
১। পটভূমি: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। এরপর ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি দেশে ফিরেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিলম্বে একটি উপযুক্ত ও জনবান্ধব সংবিধান প্রণয়নের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
২। আদেশ জারি: ১৯৭২ সালের ১১ই জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এই আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। একই সাথে এই আদেশটি দেশে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সংবিধান প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক আইনগত ভিত্তি ও পথ উন্মোচন করে দিয়েছিল।
৩। গণপরিষদ গঠন: ১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল। এই পরিষদের মূল ও একমাত্র দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি চমৎকার ও গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র বা সংবিধান প্রণয়ন করা।
৪। প্রথম অধিবেশন: ১৯৭২ সালের ১০ই এপ্রিল শাহ আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে গণপরিষদের প্রথম ঐতিহাসিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে স্পিকার হিসেবে শাহ আবদুল হামিদ এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে মোহাম্মদ উল্লাহ নির্বাচিত হন। এই প্রথম অধিবেশনেই দেশের সংবিধান রচনার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম ও প্রক্রিয়া অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শুরু করা হয়।
৫। কমিটি গঠন: সংবিধানের খসড়া তৈরির জন্য ১৯৭২ সালের ১১ই এপ্রিল গণপরিষদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। তৎকালীন আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে এই কমিটির প্রধান বা সভাপতি নিযুক্ত করা হয়েছিল। এই কমিটিতে নারী সদস্য মেহেরুন্নেসা খাতুনসহ সর্বমোট ৩৪ জন অত্যন্ত যোগ্য সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
৬। একমাত্র বিরোধী: সংবিধান প্রণয়ন কমিটির ৩৪ জন সদস্যের মধ্যে প্রায় সকলেই ছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সদস্য। তবে এই কমিটিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন একমাত্র বিরোধী দলীয় বা ন্যাপের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া সদস্য হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাও এই কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার ও কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন।
৭। জনমত যাচাই: খসড়া সংবিধান কমিটি তাদের প্রথম বৈঠকের পর সর্বসাধারণের মতামত ও পরামর্শ আহ্বান করে। সংবিধানকে আরও সমৃদ্ধ করতে দেশের বিভিন্ন সচেতন নাগরিক, সংগঠন ও বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছিল। কমিটি বিভিন্ন পর্যায় থেকে আসা প্রায় ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা ও পর্যালোচনা করেছিল।
৮। বিদেশি অভিজ্ঞতা: সংবিধানকে আন্তর্জাতিক মানের করতে ড. কামাল হোসেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শাসনতন্ত্রের ওপর গভীর পড়াশোনা করেন। বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধান এবং তাদের সংসদীয় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিদেশি সংবিধানের ভালো দিকগুলো বাংলাদেশের বাস্তব সমাজ ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে গ্রহণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
৯। কঠোর পরিশ্রম: খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব পালন করেছিল। কমিটি সর্বমোট ৩০০টি বৈঠকে মিলিত হয়ে দীর্ঘ প্রায় ৩ মাস একটানা খসড়াটি তৈরি করে। তাঁদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধানের রূপরেখা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছিল।
১০। খসড়া অনুমোদন: সর্বসাধারণের মতামত ও দীর্ঘ পর্যালোচনার পর কমিটি চূড়ান্ত খসড়াটি প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়। ১৯৭২ সালের ১১ই অক্টোবর কমিটির শেষ বৈঠকে এই খসড়াটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছিল। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে কমিটি তাদের দায়িত্ব সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করে গণপরিষদে পেশ করার জন্য প্রস্তুত করে।
১১। বিল্লাকারে পেশ: ১৯৭২ সালের ১২ই অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে খসড়া সংবিধানটি বিল আকারে উত্থাপন করা হয়। আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন এই ঐতিহাসিক বিলটি পরিষদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করেছিলেন। বিলটি পেশ হওয়ার পর গণপরিষদের সদস্যদের মধ্যে অত্যন্ত প্রাণবন্ত, আনন্দঘন এবং উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।
১২। বিস্তারিত আলোচনা: বিলটি পেশ করার পর ১৯শে অক্টোবর থেকে শুরু হয় এর ওপর ব্যাপক ও বিস্তারিত আলোচনা। গণপরিষদের সদস্যরা খসড়া সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ, দফা এবং শব্দ নিয়ে দীর্ঘ ও গঠনমূলক বিতর্ক করেন। এই দীর্ঘ আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা স্বাধীনভাবে তাঁদের মতামত ও সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করেছিলেন।
১৩। সংবিধান গ্রহণ: দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর গণপরিষদে খসড়া সংবিধানটি চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ৪ঠা নভেম্বর বাংলাদেশে ‘সংবিধান দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হয়। সংবিধানটি পাস হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশ একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোর অধিকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
১৪। হস্তলিখিত রূপ: বাংলাদেশের মূল সংবিধানটি ছাপা অক্ষরের পাশাপাশি চমৎকার হস্তাক্ষরে বা হাতে লিখে তৈরি করা হয়েছিল। শিল্পী আবদুর রউফ অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দনভাবে মূল সংবিধানটি বাংলা ভাষায় নিজ হাতে লিখেছিলেন। পরবর্তীতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে চারুশিল্পীরা এই সংবিধানের প্রতিটি পাতা সুন্দর নকশা ও চিত্রকর্ম দিয়ে সাজিয়েছিলেন।
১৫। স্বাক্ষর প্রদান: ১৯৭২ সালের ১৪ই ডিসেম্বর গণপরিষদের সদস্যগণ মূল সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করা শুরু করেন। মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিষদের সর্বমোট ৩৯৭ জন সদস্য এই ঐতিহাসিক দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। হস্তলিখিত এই মূল কপিটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের এক পরম অমূল্য ও পবিত্র সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত।
১৬। কার্যকর ঘোষণা: ঐতিহাসিক এই সংবিধানটি ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রথম বিজয় দিবসে কার্যকর করা হয়। স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র এক বছরের মাথায় একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান কার্যকর করা ছিল বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন আইনি রূপ লাভ করে।
১৭। মূল চারস্তম্ভ: এই সংবিধানে রাষ্ট্রের চারটি মূল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রধান নীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এটি ছিল শোষিত ও বঞ্চিত বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের এক অনন্য দলিল।
জনগণের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি
১৯৭২ সালের সংবিধানটি অত্যন্ত অল্প সময়ে তৈরি হলেও এতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল। জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা হয়। তবে তৎকালীন বাস্তবতায় গণপরিষদের প্রায় সব সদস্যই একটি নির্দিষ্ট দলের হওয়ায়, সর্বস্তরের জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও সংস্কৃতির স্বীকৃতির দাবি জানালে তা সংবিধানে উপেক্ষিত থাকে। এর ফলে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও কিছু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজেদের এই সংবিধান থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন মনে করেছিল। তা সত্ত্বেও, সামগ্রিকভাবে বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হিসেবে এই সংবিধান সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা দিতে পেরেছিল।
শেষকথা: ১৯৭২ সালের সংবিধান ছিল বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য ঐতিহাসিক প্রতিফলন। শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও এত অল্প সময়ে একটি প্রগতিশীল ও মানবিক সংবিধান প্রণয়ন করা নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ রাজনৈতিক সাফল্য ছিল। এটি কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার এক শাশ্বত অঙ্গীকার। এই সংবিধানের চেতনাকে ধারণ করেই আজকের বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে।