- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার এক মহত্তম অধ্যায়। এই নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ ভোটযুদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত গণতান্ত্রিক বহিঃপ্রকাশ, যার অনিবার্য পরিণতিতে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত
১। ঐতিহাসিক পটভূমি: ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পেছনে ছিল দীর্ঘ ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৬-র সংবিধান আন্দোলন, ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন এবং বিশেষ করে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি বাঙালির মাঝে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তীব্র করে তোলে। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খোঁজার চেষ্টা করেছিল।
২। ছয় দফার ম্যান্ডেট: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ মূলত ছয় দফার ওপর এক গণভোট হিসেবে রূপান্তর করেছিল। বাংলার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে প্রমাণ করেছিল যে, তারা ছয় দফার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চায় এবং এই ম্যান্ডেটই পরবর্তীতে স্বাধীনতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
৩। বাঙালির জাতীয়তাবাদ: ১৯৭০ সালের নির্বাচন বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তানের অবাস্তব ধারণাকে ফুঁত্কারে উড়িয়ে দিয়ে এদেশের মানুষ নিজেদের বাঙালি পরিচয়কে প্রধান করে তোলে। এই নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির বিজয় ঘটে এবং তা একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
৪। আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়: নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে। এই বিপুল এবং অভূতপূর্ব বিজয় প্রমাণ করে যে, পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষ একক নেতৃত্বে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ছিল। এই ঐতিহাসিক নিরঙ্কুশ বিজয়ই বাঙালিকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ জানানোর আইনি অধিকার দেয়।
৫। আইনি বৈধতা: ১৯৭০ সালের নির্বাচনের বিজয় বাঙালি জাতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক বিশাল রাজনৈতিক ও আইনি বৈধতা এনে দিয়েছিল। এই বিজয়ের ফলে বাঙালিরা আর কেবল বিদ্রোহী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিল না, বরং তারা ছিল পাকিস্তানের বৈধ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এই আইনি ভিত্তি থাকার কারণেই ১৯৭১ সালে বিশ্ব সম্প্রদায় বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রামকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিল।
৬। বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্ব: এই নির্বাচন শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এবং একক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সমগ্র বাংলার মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ভোট বাক্সে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। নির্বাচনের পর তাঁর যেকোনো নির্দেশ বা আহ্বানকে দেশের মানুষ পরম সত্য বলে মেনে নিয়েছিল, যা একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে দেখা যায়।
৭। পশ্চিম পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র: নির্বাচনের পর যখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করবে, তখন থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায় এবং জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বারবার স্থগিত করতে থাকে। এই নগ্ন ষড়যন্ত্রই বাঙালিকে বুঝতে বাধ্য করে যে, পাকিস্তান কাঠামোর মধ্যে তাদের মুক্তি অসম্ভব।
৮। ভুট্টোর নেতিবাচক ভূমিকা: পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ‘ইধরের হাম, উধরের তুম’ নীতি গ্রহণ করে পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিভাজনের দেয়াল তুলে দেন। তিনি মেজরিটি বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণতান্ত্রিক নীতিকে অস্বীকার করে ক্ষমতা ভাগাভাগির অবাস্তব দাবি তোলেন। ভুট্টোর এই একগুঁয়েমি এবং নেতিবাচক অবস্থান পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার শেষ সুযোগটিকেও চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।
৯। ইয়াহইয়ার সামরিক চক্রান্ত: প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের রায়কে নস্যাৎ করার জন্য পর্দার আড়ালে সামরিক চক্রান্তের জাল বুনতে থাকেন। তিনি একদিকে আলোচনার নাটক করছিলেন, অন্যদিকে গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও অস্ত্র আনায়ন করছিলেন। সামরিক জান্তার এই কুৎসিত চক্রান্ত ও বিশ্বাসঘাতকতা বাঙালির মনে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি শেষ মোহটুকুও সম্পূর্ণভাবে দূর করে দেয়।
১০। অসহযোগ আন্দোলন: ১৯৭১ সালের ১ মার্চ যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়, তখন পূর্ব বাংলায় দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ২ মার্চ থেকে শুরু হয় ঐতিহাসিক ও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের পুরো শাসনভার বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে পরিচালিত হতে শুরু করে।
১১। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ: অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণ দেন। নির্বাচনের গণরায় সাথে থাকায় তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করতে পেরেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এই ভাষণের মাধ্যমেই তিনি পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং গেরিলা যুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়ে দেন।
১২। গণতান্ত্রিক চেতনার জয়: ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল মূলত অস্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যালটের এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের এক অনন্য সাধারণ বিজয়। বাঙালি জাতি বুলেটের ভয়কে উপেক্ষা করে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের চূড়ান্ত রায় জানিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন সেই গণতান্ত্রিক রায়কে স্তব্ধ করতে চাইল, তখনই বাঙালি জাতি ব্যালটের চেতনাকে বুলেটে রূপান্তর করতে বাধ্য হয়।
১৩। একাত্তরের ২৫শে মার্চ: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বাংলার নিরস্ত্র মানুষের ওপর ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করে। তারা মূলত ১৯৭০ সালের নির্বাচনের রায়কে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য এই নৃশংস পথ বেছে নিয়েছিল। এই কালরাতের পর বাঙালির সামনে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও স্বাধীনতা অর্জন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
১৪। স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা: ২৫শে মার্চ মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার মূল শক্তি ও নৈতিক ভিত্তি ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের দেওয়া সেই বিশাল গণরায়। নির্বাচনের ম্যান্ডেট না থাকলে এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেবল একটি সামরিক বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য হতে পারত।
১৫। মুজিবনগর সরকার গঠন: ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার বা মুজিবনগর সরকারের বৈধতার উৎস ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচন। এই নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই কুষ্টিয়ার বৈদ্যনাথতলায় সমবেত হয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন। ফলে এই সরকার বিশ্ব দরবারে একটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে স্বীকৃতি ও সমর্থন লাভ করতে পেরেছিল।
১৬। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভোট দেওয়া সাড়ে সাত কোটি মানুষই ১৯৭১ সালে এক হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং সামরিক-আধা সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা যে অভূতপূর্ব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তার ভিত্তি ছিল ৭০-এর একতা। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
১৭। স্বাধীনতার মূল বীজ: সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ অত্যন্ত সুপ্ত ও সুসংহতভাবে নিহিত ছিল। এই নির্বাচন বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন, একতাবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা প্রদান করেছিল। নির্বাচনের রায়কে কেন্দ্র করেই স্বাধিকার আন্দোলন ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয় এবং যার সুফল আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতি তাদের রাজনৈতিক অধিকারের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছিল এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রকৃত রূপ উন্মোচন করেছিল। অতএব, নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের ব্যালট বাক্সের ভেতরেই স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার বীজ রোপিত হয়েছিল।