- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক জোট বা সংগঠনগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সংগঠন হলো সার্ক। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
সার্কের পরিচয়:
সার্ক (SAARC) বা South Asian Association for Regional Cooperation হলো দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা, যা ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে আফগানিস্তান এর সদস্যপদ লাভ করে। সার্কের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
সার্কের শাব্দিক অর্থ:
SAARC-এর পূর্ণরূপ হলো South Asian Association for Regional Cooperation। এর বাংলা অর্থ হলো দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। এখানে ‘South Asian’ অর্থ দক্ষিণ এশীয়, ‘Association’ অর্থ সংস্থা এবং ‘Regional Cooperation’ অর্থ আঞ্চলিক সহযোগিতা। সুতরাং শাব্দিক অর্থে সার্ক হলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার একটি আঞ্চলিক সংগঠন।
১। আবুল ফজল এলাহী (Abul Fazal Elahi):
আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা অনুযায়ী, সার্ককে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে দেখা হয়। এর মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো অভিন্ন সমস্যা সমাধান ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পায়। (Regional cooperation organizations provide institutional frameworks for states to work together on common challenges and development goals.)
২। জোসেফ নাই (Joseph Nye):
জোসেফ নাই আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। সার্কের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। (Regional organizations increase interdependence among states through economic, social, and political cooperation.)
৩। আর্নেস্ট হ্যাস (Ernst Haas):
আর্নেস্ট হ্যাসের মতে, আঞ্চলিক সংগঠনগুলো যৌথ স্বার্থ অর্জনের জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় সৃষ্টি করে। সার্কও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যৌথ উন্নয়ন ও সহযোগিতার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (Regional organizations promote cooperation and coordination among states to achieve common objectives.)
৪। লিওনার্ড বায়ন্ডার (Leonard Binder):
বায়ন্ডারের মতে, আঞ্চলিকতাবাদ হলো নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অভিন্ন পরিচয় ও সহযোগিতার বিকাশ। সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক ঐক্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি উদাহরণ। (Regionalism involves the development of shared identity and cooperation among states within a particular region.)
৫। ব্রুস রাসেট (Bruce Russett):
ব্রুস রাসেটের ধারণা অনুযায়ী, ভৌগোলিক নৈকট্য ও অভিন্ন স্বার্থ আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে। সার্কের সদস্য দেশগুলো ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হওয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। (Geographical proximity and shared interests create the foundation for regional cooperation among states.)
৬। সার্ক সনদ (SAARC Charter):
সার্ক সনদ অনুযায়ী, এই সংস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কল্যাণ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা। (The SAARC Charter aims to promote the welfare of South Asian peoples and accelerate economic and social development through mutual cooperation.)
উপরোক্ত ধারণাগুলোর আলোকে বলা যায়, সার্ক হলো দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক জোট, যার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে কাজ করে। যদিও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে এর কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ হয়েছে, তবুও এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
উপসংহার: সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম। অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা রয়েছে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংহতি ও সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সার্কের গুরুত্ব অপরিসীম।