- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে নোবেলজয়ী দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের রাষ্ট্রদর্শন এক অনন্য ও যুগান্তকারী অধ্যায়। তিনি কেবল তত্ত্বীয় পন্ডিত ছিলেন না, বরং মানবতার মুক্তি ও বিশ্বশান্তির সপক্ষে একজন সক্রিয় কণ্ঠস্বর ছিলেন। ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতা রক্ষা এবং রাষ্ট্রের অহেতুক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে তাঁর বলিষ্ঠ চিন্তাভাবনা সমকালীন ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
১। ব্যক্তি স্বাধীনতা: রাসেল তাঁর দর্শনে ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যক্তির সৃজনশীল ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশে সহায়তা করা। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে, তবে সমাজের প্রগতি থমকে যায়। তাই তিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে ব্যক্তির মৌলিক চিন্তার স্বাধীনতাকে স্থান দিয়েছেন।
২। কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা: ফ্যাসিবাদের মতো চরম কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাসেল আজীবন সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র যখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে, তখন তা নাগরিকদের দাসত্বে বাধ্য করে। ক্ষমতার এই কেন্দ্রীভূত রূপ মানুষের স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয় বলে তিনি মনে করতেন। তাই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা ছিল।
৩। শান্তিবাদ প্রচার: প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে রাসেল বিশ্বব্যাপী শান্তিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী চেতনা প্রচার করেন। তিনি যুদ্ধের চরম বিরোধিতা করেন এবং পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রগুলোর উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতিই মূলত যুদ্ধের জন্ম দেয়, যা মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। তাই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি যুদ্ধ বর্জনের ডাক দেন।
৪। বিশ্বরাষ্ট্রের ধারণা: আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের স্থায়ী অবসান ও মানবজাতির সুরক্ষায় রাসেল একটি শক্তিশালী ‘বিশ্বরাষ্ট্র’ বা বিশ্বসরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। তিনি মনে করতেন, একক রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব অনেক সময় আন্তর্জাতিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি কেন্দ্রীয় বিশ্বসংস্থা থাকলে তা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করতে পারবে। ফলে বিশ্বজুড়ে চিরস্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
৫। উগ্র জাতীয়তাবাদ: রাসেল উগ্র জাতীয়তাবাদকে মানবজাতির জন্য একটি বড় অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নিজের দেশকে ভালোবাসার নামে অন্য দেশের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করাকে তিনি সমর্থন করেননি। তাঁর মতে, এই সংকীর্ণ মানসিকতাই বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও হানাহানির মূল কারণ। তিনি আন্তর্জাতিকতাবাদের পক্ষে কথা বলেন, যেখানে সব মানুষ সমান মর্যাদা পাবে।
৬। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি রাসেলের ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও অটুট বিশ্বাস। তবে তিনি কেবল সংখ্যাগুরুদের শাসন নয়, বরং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে, প্রকৃত গণতন্ত্রে প্রতিটি নাগরিকের মত প্রকাশের সমান সুযোগ থাকতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।
৭। সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি: রাসেল সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক সমতার নীতিকে পছন্দ করলেও সোভিয়েত ধাঁচের বলপ্রয়োগের সমাজতন্ত্রের বিরোধী ছিলেন। তিনি এমন এক সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে অর্থনৈতিক মুক্তি থাকবে কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে না। তাঁর এই চিন্তাধারাকে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র বা গিল্ড সমাজতন্ত্রের কাছাকাছি বলা যায়। তিনি পুঁজিবাদের শোষণেরও তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
৮। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা এক জায়গায় পুঞ্জীভূত রাখার ঘোর বিরোধী ছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি মনে করতেন, ক্ষমতা একমুখী হলে তা স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করতে বাধ্য। তাই স্থানীয় সরকার এবং বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেন। ক্ষমতার এই বণ্টন নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং শাসনকাজ পরিচালনায় গতিশীলতা আনে।
৯। শিক্ষা সংস্কার: রাসেলের রাষ্ট্রচিন্তার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল প্রগতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থা। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে অন্ধ অনুগত নাগরিক বানায়। এর পরিবর্তে তিনি এমন শিক্ষার কথা বলেছেন যা মানুষের মধ্যে মুক্তচিন্তা ও প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি করবে। রাষ্ট্রকে একটি কুসংস্কারমুক্ত ও বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনে ভূমিকা নিতে হবে।
১০। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: একটি আদর্শ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। রাসেলের মতে, আইনের চোখে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকা আবশ্যক। রাষ্ট্র যদি দুর্বলকে সবলের অত্যাচার থেকে রক্ষা করতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারই রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব বাড়ায়।
১১। শিল্পায়ন ও মানুষ: আধুনিক শিল্পায়নের ফলে মানুষের যান্ত্রিক হয়ে পড়ার বিষয়টি রাসেলকে গভীরভাবে ভাবিয়েছিল। তিনি লক্ষ্য করেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো যান্ত্রিক উৎপাদনে যতটা মনোযোগী, মানুষের মানসিক বিকাশে ততটা নয়। অতিরিক্ত কাজের চাপে মানুষের ভেতরের সৃজনশীল সত্তা যেন মরে না যায়, সেদিকে নজর দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি কাজের সময় কমিয়ে বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানান।
১২। বিজ্ঞান ও রাজনীতি: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতিকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের ওপর রাসেল জোর দিয়েছেন। তবে বিজ্ঞানের অপব্যবহার করে রাষ্ট্রগুলো যেভাবে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরি করছে, তার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। রাজনীতিবিদেরা যেন বিজ্ঞানকে যুদ্ধের হাতিয়ার না বানিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যবহার করেন, সেটাই ছিল তাঁর মূল দর্শন। বিজ্ঞানের নৈতিক ব্যবহারই মানবজাতিকে বাঁচাতে পারে।
১৩। আইনের শাসন: রাসেল বিশ্বাস করতেন যে, সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আইনের শাসন অপরিহার্য। তবে সেই আইনকে অবশ্যই মানবিক, যৌক্তিক এবং জনগণের কল্যাণমুখী হতে হবে। কোনো স্বৈরাচারী আইন যা মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়, তা মানতে তিনি রাজি ছিলেন না। আইন হবে নাগরিকের স্বাধীনতার রক্ষাকবচ, কোনো শোষণের হাতিয়ার নয়।
১৪। নৈতিকতার গুরুত্ব: রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতি রাসেলকে ব্যথিত করেছিল। তিনি মনে করতেন, কেবল ক্ষমতার লোভ বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজনীতি করা উচিত নয়। বিশ্বনেতাদের কর্মকাণ্ডে যদি সততা, পরোপকার এবং দয়া না থাকে, তবে পৃথিবী কখনো নিরাপদ হবে না। রাজনীতিকে অবশ্যই মানবপ্রেম ও নৈতিকতার আদর্শে চালিত হতে হবে।
১৫। শ্রমিক অধিকার: সমাজ গঠনে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অবদানকে রাসেল অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে দেখতেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকদের যে নির্মম শোষণ করা হতো, তার বিরুদ্ধে তিনি কলম ধরেছিলেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র প্রকৃত উন্নত হতে পারে না।
১৬। মুক্তচিন্তার বিকাশ: আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত নাগরিকদের মুক্তচিন্তার সুযোগ দেওয়া। রাসেল মনে করতেন, কোনো রাষ্ট্র যদি নতুন আইডিয়া বা ভিন্নমতের পথ রুদ্ধ করে, তবে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। প্রগতির জন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই সমালোচকদের প্রতি সহনশীল হতে হবে। ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা সমাজকে অন্ধত্ব ও স্থবিরতা থেকে মুক্ত রাখে।
১৭। মানবতাবাদের জয়গান: রাসেলের সমগ্র রাষ্ট্রদর্শনের মূল সুর ছিল খাঁটি ও আপসহীন মানবতাবাদ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সমগ্র মানবজাতিকে এক করে দেখতেন। রাষ্ট্রের নীতিগুলো যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে না হয়ে সমগ্র মানবতার কল্যাণে উৎসর্গীকৃত হয়, এটাই ছিল তাঁর চাওয়া। মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসাই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে অমর করে রেখেছে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, বার্ট্রান্ড রাসেলের রাষ্ট্রদর্শন কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং তা মানবমুক্তির এক বাস্তব রূপরেখা। বিশ্বযুদ্ধ, পরমাণু অস্ত্রের হুমকি এবং একনায়কতন্ত্রের অন্ধকার সময়ে তিনি মানবজাতিকে আশার আলো দেখিয়েছেন। ব্যক্তি স্বাধীনতা, বিশ্বশান্তি এবং মুক্তচিন্তার পক্ষে তাঁর দেওয়া নীতিগুলো আজকেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের পথচলায় রাসেলের অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।