- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। একই বৃহত্তর অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি নিকটবর্তী রাষ্ট্র যখন নিজেদের অভিন্ন নিরাপত্তা সমস্যা, সীমান্ত, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা করে, তখন তাকে উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলা হয়। বর্তমান বিশ্বে ছোট পরিসরে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধিতে এর গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তার পরিচয়:
উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলতে কোনো বৃহত্তর অঞ্চলের অন্তর্গত কয়েকটি রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডের মধ্যে বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সহযোগিতাকে বোঝায়। এসব রাষ্ট্র সাধারণত ভৌগোলিক নৈকট্য, অভিন্ন নিরাপত্তা হুমকি, সীমান্ত সমস্যা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বা রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরের একটি নিরাপত্তা কাঠামো।
উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তার শাব্দিক অর্থ:
‘উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা’ শব্দটি তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত— ‘উপ’ অর্থ হলো ছোট বা অধীন, ‘আঞ্চলিক’ অর্থ হলো নির্দিষ্ট অঞ্চল সম্পর্কিত এবং ‘নিরাপত্তা’ অর্থ হলো সুরক্ষা বা ঝুঁকি থেকে রক্ষা। সুতরাং শাব্দিক অর্থে উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলতে কোনো নির্দিষ্ট বৃহত্তর অঞ্চলের ছোট অংশের দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাকে বোঝায়।
১। ব্যারি বুজান (Barry Buzan):
ব্যারি বুজান নিরাপত্তাকে সামরিক বিষয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিস্তৃত ধারণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। (Security is a broad concept involving military, political, economic, societal, and environmental dimensions among interconnected states.)
২। ওলে ওয়েভার (Ole Wæver):
ওলে ওয়েভারের নিরাপত্তা ধারণা অনুযায়ী, কাছাকাছি অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা সমস্যা পারস্পরিকভাবে যুক্ত থাকে এবং তারা একটি নিরাপত্তা কমপ্লেক্স তৈরি করে। উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। (Security issues of geographically close states are interlinked and form a regional security complex.)
৩। মোহাম্মদ আইয়ুব (Mohammed Ayoob):
মোহাম্মদ আইয়ুব উন্নয়নশীল বিশ্বের নিরাপত্তা সমস্যাগুলোকে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার ধারণা অনুযায়ী, উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থানীয় বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। (Security in the developing world is shaped by state capacity, domestic stability, and regional interactions.)
৪। জোসেফ নাই (Joseph Nye):
জোসেফ নাই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রগুলো যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে অভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে। (States can address common security challenges through cooperation and mutual interdependence.)
৫। কেনেথ ওয়াল্টজ (Kenneth Waltz):
কেনেথ ওয়াল্টজ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও রাষ্ট্রগুলোর শক্তি, স্বার্থ ও সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (The international system is shaped by interactions among states and the balance of power.)
৬। রবার্ট জার্ভিস (Robert Jervis):
রবার্ট জার্ভিসের মতে, রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নীতি একে অপরের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়। উপ-আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা, সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। (States’ security policies are influenced by the actions and perceptions of other states.)
উপরোক্ত ধারণাগুলোর আলোকে বলা যায়, উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা হলো একটি নির্দিষ্ট ছোট ভৌগোলিক অঞ্চলের কয়েকটি রাষ্ট্রের মধ্যে অভিন্ন নিরাপত্তা সমস্যা মোকাবিলা, শান্তি বজায় রাখা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার একটি ব্যবস্থা। এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, পরিবেশগত সমস্যা ও অন্যান্য অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার: উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ভৌগোলিক নৈকট্য ও অভিন্ন সমস্যার কারণে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। তাই শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় উপ-আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।