- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক (এ.জি ফ্রাঙ্ক) প্রদত্ত নির্ভরশীলতা তত্ত্বটি বিশ্ব অর্থনীতিতে উন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যকার বৈষম্যমূলক সম্পর্ক ব্যাখ্যার একটি কালজয়ী দলিল। এই তত্ত্বটি মূলত পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় কীভাবে ধনী দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোকে শোষণ করে নিজেদের উন্নত করছে, তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।
১। কেন্দ্রের ধারণা: ফ্রাঙ্কের তত্ত্বে ‘কেন্দ্র’ বা ‘মেট্রোপলিস‘ বলতে বিশ্বের শিল্পোন্নত এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ধনী দেশগুলোকে বোঝানো হয়েছে। এই দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং অনুন্নত দেশগুলোর সম্পদ আহরণ করে। তারা মূলত প্রযুক্তি এবং পুঁজির মালিক হওয়ায় বিশ্ববাজারে চালকের ভূমিকা পালন করে। উৎপাদন ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রণ এই কেন্দ্র বা শোষক দেশগুলোর হাতেই ন্যস্ত থাকে।
২। প্রান্তের অবস্থান: ‘প্রান্ত’ বা ‘পেরিফেরি’ বলতে অনুন্নত, উন্নয়নশীল এবং প্রধানত কৃষিনির্ভর দরিদ্র দেশগুলোকে নির্দেশ করা হয়েছে। এই দেশগুলো মূলত কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে কেন্দ্রের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে থাকে। এদের নিজস্ব কোনো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকে না এবং তারা সবসময় কেন্দ্রের শোষণের শিকার হয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক পিরামিডে এদের অবস্থান একেবারে নিচের স্তরে থাকে।
৩। মহানগর-উপগ্রহ সম্পর্ক: ফ্রাঙ্ক বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে একটি শৃঙ্খল হিসেবে দেখিয়েছেন যা মহানগর বা কেন্দ্র এবং উপগ্রহ বা প্রান্তের মধ্যে আবর্তিত হয়। মহানগর সবসময় উপগ্রহের অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত অংশ শোষণ করে নিজের দেশে নিয়ে যায়। এই কাঠামোর কারণে উপগ্রহগুলো কখনোই স্বাধীনভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক পলিসি বা নীতি নির্ধারণ করতে পারে না। ফলে এই দুইয়ের মধ্যে একটি চিরস্থায়ী শোষণের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
৪। উদ্বৃত্তের পাচার: এই তত্ত্বের মূল কথা হলো অনুন্নত দেশগুলোর উৎপাদিত অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত বা মুনাফা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে উন্নত দেশে পাচার হয়ে যায়। দরিদ্র দেশগুলো কঠোর পরিশ্রম করে যে সম্পদ তৈরি করে, তা অসম বাণিজ্যের মাধ্যমে ধনী দেশগুলোর পকেটে চলে যায়। এর ফলে অনুন্নত দেশগুলোতে পুঁজি গঠনের কোনো সুযোগ থাকে না। তারা দিন দিন আরও দরিদ্র এবং পুঁজিহীন হয়ে পড়ে।
৫। ঔপনিবেশিক শোষণ: ফ্রাঙ্ক মনে করেন বর্তমান অনুন্নত দেশগুলোর অনগ্রসরতার মূল কারণ হলো দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ। অতীতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এই দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানবসম্পদকে নির্মমভাবে ব্যবহার করে নিজেদের শিল্পবিপ্লব ঘটিয়েছে। এই ঐতিহাসিক শোষণের কারণেই আজ লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত।
৬। অসম বাণিজ্য: বিশ্ববাজারে উন্নত এবং অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্কটি সবসময় অসম এবং একপেশে প্রকৃতির হয়ে থাকে। উন্নত দেশগুলো সস্তা মূল্যে প্রান্তিক দেশ থেকে কাঁচামাল কিনে নেয় এবং পরে চড়া মূল্যে তৈরি পণ্য তাদের কাছেই বিক্রি করে। এই বৈষম্যমূলক বাণিজ্য নীতির কারণে দরিদ্র দেশগুলো সবসময় বাণিজ্য ঘাটতি ও ঋণের মুখে পড়ে। ফলে ধনীরা আরও ধনী এবং গরিবরা আরও গরিব হতে থাকে।
৭। পরনির্ভরশীলতার জাল: অনুন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি এমনভাবে তৈরি করা হয় যা স্বাবলম্বী নয় বরং উন্নত দেশগুলোর চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তি, ঋণ, সাহায্য এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য এই দেশগুলোকে সবসময় কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। এই পরনির্ভরশীলতার কারণে তারা নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিতে বাধ্য হয়।
৮। কাঠামোগত অনগ্রসরতা: ফ্রাঙ্কের মতে অনুন্নত দেশগুলোর অনগ্রসরতা কোনো আদিম বা প্রাকৃতিক অবস্থা নয়, বরং এটি পুঁজিবাদের দ্বারা কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট একটি অনগ্রসরতা। উন্নত দেশগুলো নিজেদের বিকাশের স্বার্থেই এই দেশগুলোকে অনুন্নত বা অনগ্রসর করে রেখে দিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির এই বিশেষ কাঠামোটি দরিদ্র দেশগুলোকে সবসময় একটি চক্রের মধ্যে বন্দি করে রাখে। ফলে তারা চাইলেও এই শৃঙ্খল ভেঙে সহজে বের হতে পারে না।
৯। বহুজাতিক কোম্পানির ভূমিকা: বর্তমান যুগে বহুজাতিক কোম্পানি বা এমএনসিগুলো উন্নত দেশগুলোর হয়ে প্রান্তিক দেশগুলোতে শোষণের নতুন হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এই কোম্পানিগুলো সস্তা শ্রমের সুযোগ নিয়ে দরিদ্র দেশগুলোতে ব্যবসা পাতে এবং সিংহভাগ মুনাফা নিজেদের দেশে পাচার করে। তারা স্থানীয় শিল্প ও বাজারকে ধ্বংস করে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। এর ফলে অনুন্নত দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।
১০। আন্তর্জাতিক ঋণ: অনুন্নত দেশগুলো তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে চড়া শর্তে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এই ঋণগুলোর সাথে এমন কিছু নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয় যা উন্নত দেশগুলোর বাজার সুরক্ষায় কাজ করে। ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়েই দরিদ্র দেশগুলোর বাজেটের একটি বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। ফলে তারা স্থায়ীভাবে ঋণের ফাঁদে আটকে পড়ে।
১১। দ্বৈত অর্থনীতি: নির্ভরশীলতা তত্ত্ব অনুযায়ী অনুন্নত দেশগুলোতে একটি কৃত্রিম দ্বৈত অর্থনীতি বা দুই ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। একদিকে থাকে আধুনিক রপ্তানিমুখী খাত যা সরাসরি কেন্দ্রের সাথে যুক্ত এবং কেন্দ্রের স্বার্থ রক্ষা করে। অন্যদিকে থাকে সনাতন ও অবহেলিত গ্রামীণ খাত যা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করে। এই বৈষম্য দেশের অভ্যন্তরে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেয়।
১২। দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণী: প্রান্তিক দেশগুলোতে একদল মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল পুঁজিপতি শ্রেণীর জন্ম হয় যারা নিজেদের স্বার্থে কেন্দ্রের গোলামি করে। এই এলিট শ্রেণীটি নিজ দেশের মানুষের চেয়ে বিদেশি শোষণকারীদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে বেশি পছন্দ করে। তারা দেশের সম্পদ পাচারে সাহায্য করে এবং বিনিময়ে নিজেরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করার সুযোগ পায়। এদের কারণে অভ্যন্তরীণ কোনো জাতীয়তাবাদী অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে না।
১৩। মেধা পাচার: অনুন্নত দেশগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা হলো মেধা পাচার বা ব্রেন ড্রেন, যা নির্ভরশীলতার আরেকটি আধুনিক রূপ। দরিদ্র দেশের অর্থ ও সম্পদে গড়ে ওঠা দক্ষ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী উন্নত জীবনের আশায় উন্নত দেশগুলোতে চলে যায়। এর ফলে অনুন্নত দেশগুলো স্থায়ীভাবে দক্ষ জনশক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। অথচ উন্নত দেশগুলো কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই এই তৈরি মেধার সুফল ভোগ করে।
১৪। প্রযুক্তির একচেটিয়া: আধুনিক উন্নত প্রযুক্তিগুলোর প্রায় সবটুকুর মালিকানা এবং পেটেন্ট রাইটস রয়েছে কেন্দ্রের ধনী দেশগুলোর হাতে। অনুন্নত দেশগুলোকে যেকোনো আধুনিক কাজের জন্য এই প্রযুক্তি চড়া মূল্যে আমদানি করতে হয়। প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলো সবসময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যেন প্রান্তিক দেশগুলো স্বনির্ভর হতে না পারে। ফলে প্রযুক্তির এই অভাব অনুন্নত দেশগুলোকে আজীবন দাসত্ব করতে বাধ্য করে।
১৫। একমুখী উৎপাদন: ফ্রাঙ্কের মতে শোষণের সুবিধার্থে অনুন্নত দেশগুলোকে নির্দিষ্ট এক বা দুটি প্রাথমিক পণ্য বা কাঁচামাল উৎপাদনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। যেমন কোনো দেশ শুধু চা, কেউ কফি বা কেউ খনিজ সম্পদ রপ্তানির ওপর বেঁচে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই নির্দিষ্ট পণ্যের দাম পড়ে গেলে পুরো দেশের অর্থনীতি ধসে পড়ে। এই একমুখী উৎপাদন ব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করে।
১৬। বিশ্বায়ন ও পুঁজিবাদ: বর্তমান বিশ্বায়নের যুগ মূলত পুঁজিবাদকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এবং শোষণকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে অনুন্নত দেশগুলোর বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হলেও উন্নত দেশগুলো নিজেদের বাজার ঠিকই সুরক্ষিত রাখে। বিশ্বায়নের এই মোড়কে দুর্বল দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ অনায়াসে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
১৭। মুক্তির একমাত্র পথ: এ.জি ফ্রাঙ্ক মনে করেন এই শোষণমূলক বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতরে থেকে অনুন্নত দেশগুলোর পক্ষে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই পরাধীনতা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো পুঁজিবাদী বিশ্ববাজারের শৃঙ্খল ছিঁড়ে নিজেদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া। সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর এবং স্বনির্ভর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এই দেশগুলো প্রকৃত মুক্তি পেতে পারে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, এ.জি ফ্রাঙ্কের নির্ভরশীলতা তত্ত্বটি বিশ্ব অর্থনীতির ভেতরের নগ্ন শোষণের রূপটি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে উন্মোচন করেছে। যদিও বিচ্ছিন্নতাবাদের ধারণার জন্য এই তত্ত্বটি পরবর্তীতে কিছুটা সমালোচিত হয়েছে, তবুও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অনুন্নয়নের আসল কারণ বুঝতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যকার কাঠামোগত বৈষম্য দূর না হলে বিশ্ব অর্থনীতি যে কখনোই সমতাভিত্তিক হবে না, এই তত্ত্বটি আমাদের সেই সত্যই স্মরণ করিয়ে দেয়।