- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৪৭ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের জন্ম হলেও শুরু থেকেই দেশটির রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল। গণতান্ত্রিক রীতিনীতির অভাব, ক্ষমতার লোভ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য রাষ্ট্রটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। এরই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা দেশে প্রথম সামরিক শাসন জারি করেন।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ
১। রাজনৈতিক অস্থিরতা: ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পাকিস্তানে স্থায়ী কোনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। একের পর এক সরকার পরিবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রীদের পদত্যাগ বা বরখাস্তের ঘটনা দেশের শাসনব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়। মাত্র এগারো বছরে সাতজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন পাকিস্তানের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও নেতৃত্বের চরম সংকটকে স্পষ্ট করে তুলেছিল, যা সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা দখলে উৎসাহিত করে।
২। সংবিধান প্রণয়নে ব্যর্থতা: একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত হলো কার্যকর সংবিধান, যা তৈরিতে পাকিস্তান দীর্ঘ ৯ বছর সময় নেয়। ১৯৫৬ সালে একটি সংবিধান প্রণীত হলেও সেটি দেশের সকল অংশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। সংবিধানের দুর্বলতার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ ও বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পায় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
৩। ইস্কান্দার মির্জার চক্রান্ত: পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য দেশের রাজনীতিতে নোংরা চক্রান্ত শুরু করেন। তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোন্দল ও ভাঙন সৃষ্টি করতেন। নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তিনি পরিকল্পিতভাবে দেশে এমন এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেন যাতে সামরিক শাসন জারির পথ সুগম হয়।
৪। আমলাতন্ত্রের নেতিবাচক ভূমিকা: পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় রাজনীতিবিদদের চেয়ে আমলাদের আধিপত্য ও প্রভাব অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। চৌধুরী মুহাম্মদ আলী বা গোলাম মুহাম্মদের মতো আমলারা দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে বসে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতেন। তারা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অবজ্ঞা করতেন এবং দেশের শাসনব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে রাখতেন। এই প্রশাসনিক স্বৈরাচার সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিতে প্রবেশের সরাসরি সুযোগ তৈরি করে দেয়।
৫। অর্থনৈতিক চরম বিপর্যয়: ১৯৫৮ সাল নাগাদ পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়। মুদ্রাস্ফীতি, কালোবাজারি, চোরাচালান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অর্থনৈতিক এই ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলায় তৎকালীন বেসামরিক সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়।
৬। নেতৃত্বের চরম শূন্যতা: কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আকস্মিক মৃত্যু এবং লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানে কোনো যোগ্য ও দূরদর্শী জাতীয় নেতা ছিলেন না। পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা দেশের চেয়ে নিজেদের পকেট ভারী করতে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন। এই জাতীয় নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে দেশের সামগ্রিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং সামরিক বাহিনী দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অজুহাত পায়।
৭। পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য: পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রতি চরম বৈষম্যমূলক নীতি ও আচরণ প্রদর্শন করে আসছিল। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাঙালিদের ক্রমাগত বঞ্চিত করায় দুই অঞ্চলের মধ্যে ক্ষোভ ও দূরত্ব দিন দিন বাড়ছিল। এই আঞ্চলিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অসন্তোষ দূর করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে সরকার দমনপীড়নের পথ বেছে নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।
৮। সামরিক বাহিনীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা: পাকিস্তানের সেনাবাহিনী শুরু থেকেই নিজেদের দেশের একমাত্র রক্ষাকর্তা এবং রাজনীতিবিদদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতে শুরু করেছিল। সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়াল থেকে দেশের রাজনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। রাজনীতিতে বেসামরিক সরকারের দুর্বলতা ও ব্যর্থতা দেখে সামরিক বাহিনীর অফিসারদের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা সরাসরি নিজেদের হাতে নেওয়ার তীব্র রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়।
৯। মুসলিম লীগের পতন: পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা দল মুসলিম লীগ স্বাধীনতার পর সাধারণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় দলটির জনপ্রিয়তা ও ভিত্তিকে ধুলিসাৎ করে দেয়। একটি শক্তিশালী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতি দেশের রাজনীতিকে নেতৃত্বহীন ও অভিভাবকহীন করে তোলে, যার পূর্ণ সুযোগ নেয় সেনাবাহিনী।
১০। যুক্তফ্রন্ট সরকার বাতিল: ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারকে অন্যায় ও অগণতান্ত্রিকভাবে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় বরখাস্ত করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের এই স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের কারণে দেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ উঠে যায়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনোই বাঙালিদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে এবং গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে চায়নি।
১১। সংসদে স্পিকার হত্যাকাণ্ড: ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ভেতরে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পাটোয়ারীকে সংসদ সদস্যদের মারধরের মাধ্যমে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সংসদের ভেতরে এই ধরনের নজিরবিহীন সহিংসতা ও বর্বরতা দেশের আইনশৃঙ্খলার চরম অবক্ষয়কে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করে। এই ঘটনাকে পুঁজি করে সামরিক বাহিনী প্রচার করে যে রাজনীতিবিদরা দেশ চালাতে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত এবং অযোগ্য।
১২। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন: ১৯৫৬ সালের সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরও পাকিস্তানে কোনো স্থায়ী ও মজবুত সরকার গঠিত হতে পারেনি। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে চারজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হওয়ায় দেশের শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। কোনো সরকারই দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার মতো সময় বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পায়নি।
১৩। পররাষ্ট্র নীতিতে নির্ভরশীলতা: তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাগদাদ চুক্তি এবং সিয়াটো (SEATO) চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও পররাষ্ট্র নীতি চরম সংকটের মুখে পড়ে। এই অতিরিক্ত বিদেশি নির্ভরতা দেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে এবং সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
১৪। আসন্ন নির্বাচন ভীতি: ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা দেশজুড়ে চূড়ান্তভাবে ঘোষিত হয়েছিল। ইস্কান্দার মির্জা এবং আইয়ুব খান খুব ভালো করেই জানতেন যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তারা ক্ষমতাচ্যুত হবেন। নিজেদের নিশ্চিত পরাজয় ঠেকাতে এবং ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার হীন উদ্দেশ্যে তারা নির্বাচন বানচাল করার ষড়যন্ত্র করেন এবং সামরিক শাসন জারি করেন।
১৫। আইনশৃঙ্খলার চরম অবক্ষয়: ১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে সমগ্র পাকিস্তানজুড়ে চুরি, ডাকাতি, খুন এবং রাজনৈতিক সহিংসতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। সাধারণ মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা ছিল না এবং পুলিশ প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। দেশের এই নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ক্ষমতা দখল করে।
১৬। ব্যক্তিগত স্বার্থের রাজনীতি: পাকিস্তানের তত্কালীন রাজনীতিবিদরা দেশের কল্যাণ বা জনগণের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের দলবদল ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনীতিতে মগ্ন ছিলেন। প্রতিদিন নতুন নতুন দল গঠন এবং ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে মন্ত্রীদের মধ্যে কামড়াকামড়ি লেগেই থাকত। রাজনীতিবিদদের এই আদর্শহীন ও সুবিধাবাদী রাজনীতি দেশের সাধারণ মানুষের মনে রাজনীতির প্রতি চরম ঘৃণা ও অনীহা তৈরি করেছিল।
১৭। জনগণের তীব্র অসন্তোষ: বেসামরিক সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, অযোগ্যতা এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষ সরকারের ওপর চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত ছিল। তারা এই দমবন্ধ করা রাজনৈতিক পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক কষ্ট থেকে যেকোনো মূল্যে মুক্তি চাচ্ছিল। জনগণের এই তীব্র অসন্তোষ এবং নিষ্ক্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে সামরিক বাহিনী কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই খুব সহজে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যর্থতার এক অনিবার্য পরিণতি। রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার লোভ, আমলাদের চক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব পাকিস্তানকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছিল। এই সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের আলো চিরতরে নিভে যায় এবং দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসনের এক কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়।