- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: কার্ল কাউটস্কি ছিলেন মার্ক্সবাদী চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা এবং দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনালের শীর্ষস্থানীয় তাত্ত্বিক। কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর তিনিই মূলধারার অর্থোডক্স মার্ক্সবাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাখ্যাকারী হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁর সমাজতান্ত্রিক দর্শন বুর্জোয়া ব্যবস্থার পতন এবং সর্বহারা শ্রেণীর মুক্তির এক অনন্য তাত্ত্বিক রূপরেখা প্রদান করে।
১। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ: কার্ল কাউটস্কির সমাজতান্ত্রিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল মার্ক্সীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানব সমাজের রূপান্তর ও বিকাশ মূলত অর্থনৈতিক উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। ইতিহাসের গতিধারা কোনো অলৌকিক শক্তিতে নয়, বরং বস্তুগত ও অর্থনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বে পরিচালিত হয়। তাঁর মতে, পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ বিকাশই অনিবার্যভাবে সমাজতন্ত্রের পথ সুগম করে তোলে।
২। অর্থনৈতিক নিয়তিবাদ: কাউটস্কি মনে করতেন পুঁজিবাদের পতন এবং সমাজতন্ত্রের আগমন সম্পূর্ণ অবধারিত ও নিশ্চিত। তিনি অর্থনৈতিক নিয়তিবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, যেখানে মনে করা হতো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নিজেই নিজের ধ্বংসের কারণ তৈরি করে। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরের তীব্র বৈষম্য ও সংকট একসময় একে অচল করে তুলবে। ফলে শ্রমিক শ্রেণীকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তীব্র কৃত্রিম প্রচেষ্টার চেয়ে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হবে।
৩। শ্রেণী সংগ্রাম: কাউটস্কির দর্শনে শ্রেণী সংগ্রাম সমাজ পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজে মালিক পক্ষ এবং শ্রমিক পক্ষের মধ্যকার স্বার্থের সংঘাত চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়। শ্রমিক শ্রেণী যখন নিজেদের শোষণ সম্পর্কে সচেতন হবে, তখন তারা সংগঠিত হতে শুরু করবে। এই সংগঠিত শ্রেণী সংগ্রামই শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদী শোষণের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
৪। গণতান্ত্রিক রূপান্তর: সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য কাউটস্কি সশস্ত্র বিদ্রোহের চেয়ে গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় পথকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ব্যালট ও নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সর্বহারা শ্রেণী যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে, তবে সংসদের আইন কানুন ব্যবহার করেই পুঁজিবাদকে হঠানো যায়। তাঁর এই শান্তিপূর্ণ ও আইনি রূপান্তরের ধারণা মার্ক্সবাদের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিতর্কিত।
৫। সংসদীয় রাজনীতি: কাউটস্কি সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর জন্য সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন সংসদ হলো শ্রমিকদের অধিকার আদায় এবং নিজেদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার অন্যতম সেরা প্ল্যাটফর্ম। বুর্জোয়া সংসদের ভেতরে থেকে লড়াই করে শ্রমিকদের পক্ষে বিভিন্ন সংস্কারমূলক আইন পাস করা সম্ভব। তাই বিপ্লবী দলগুলোর উচিত নির্বাচন বর্জন না করে তাতে অংশ নিয়ে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করা।
৬। শ্রমিক সংগঠন: সমাজতন্ত্র অর্জনের জন্য কাউটস্কি শক্তিশালী এবং সুশৃঙ্খল শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছেন। শ্রমিকরা যদি এককভাবে লড়াই করে, তবে পুঁজিবাদের বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে তারা কখনোই টিকতে পারবে না। তাই কারখানায় কারখানায় শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলে নিজেদের দাবি আদায় করতে হবে। এই সংগঠনগুলোই পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি বা ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি মনে করতেন।
৭। সর্বহারা একনায়কত্ব: কাউটস্কির ‘সর্বহারা একনায়কত্ব’ বা ডিক্টেটরশিপ অব দ্য প্রলেতারিয়েত সংক্রান্ত ধারণা ছিল লেনিনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি একে কোনো সহিংস বা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা হিসেবে দেখতেন না। তাঁর মতে, সর্বহারা একনায়কত্ব হলো বহুদলীয় গণতন্ত্রের মধ্যে শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন। যেখানে বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বিরোধী দলের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে এবং সমাজ গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালিত হবে।
৮। লেনিনীয় সমালোচনা: ভ্লাদিমির লেনিনের সহিংস বিপ্লবী পদ্ধতি এবং বলশেভিক তত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন কার্ল কাউটস্কি। লেনিন যখন রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন, কাউটস্কি তখন তার বিরোধিতা করেন। তিনি মনে করতেন রাশিয়া সমাজতন্ত্রের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে তখনো পরিপক্ক ছিল না। লেনিনের একদলীয় শাসনকে তিনি সমাজতন্ত্রের নামে একনায়কত্ব বা ক্ষমতার অপব্যবহার বলে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানান।
৯। পুঁজিবাদের বিবর্তন: কাউটস্কি বিশ্বাস করতেন যে পুঁজিবাদ সরাসরি ধ্বংস হওয়ার আগে একটি বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা নিজে থেকেই ধীরে ধীরে একচেটিয়া রূপ ধারণ করে এবং সংকটের দিকে এগিয়ে যায়। এই বিবর্তনের ফলে একসময় বুর্জোয়া শ্রেণীর পক্ষে শাসন পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন শ্রমিক শ্রেণী খুব সহজেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হবে।
১০। সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব: সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে কাউটস্কির একটি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, যা ‘আল্ট্রা-ইম্পেরিয়ালিজম’ বা অতি-সাম্রাজ্যবাদ নামে পরিচিত। তিনি মনে করতেন বিশ্ব পুঁজিবাদী শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ না করে একজোট হতে পারে। তারা নিজেদের স্বার্থে বিশ্বকে শোষণ করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠন করতে পারে। এই তত্ত্ব তৎকালীন অনেক বিপ্লবী মার্ক্সবাদীদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও এটি ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী চিন্তা।
১১। অর্থোডক্স মার্ক্সবাদ: কাউটস্কিকে অর্থোডক্স মার্ক্সবাদের প্রধান রক্ষক বা পোপ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তিনি মার্ক্স ও এঙ্গেলসের মূল লেখার আক্ষরিক ও পদ্ধতিগত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বার্নস্টাইনের সংশোধনবাদ এবং লেনিনের উগ্র বিপ্লববাদ—উভয় সংকটের মাঝখানে তিনি মূল মার্ক্সবাদকে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁর তাত্ত্বিক লেখাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান গাইড হিসেবে কাজ করেছে।
১২। কৃষি অর্থনীতি: সমাজতান্ত্রিক দর্শনে কাউটস্কি কৃষি প্রশ্ন বা কৃষক শ্রেণীর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদ ধীরে ধীরে গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিকে গ্রাস করে এবং কৃষকদের সর্বহারায় রূপান্তর করে। তবে তিনি গ্রামীণ কৃষকদের চেয়ে শহরের শিল্প শ্রমিকদেরই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি মনে করতেন। কৃষকদের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল করার জন্য তিনি বিশেষ অর্থনৈতিক কর্মসূচির কথা বলেছিলেন।
১৩। গণতান্ত্রিক অধিকার: কাউটস্কির দর্শনে সমাজতন্ত্র এবং গণতন্ত্র ছিল একে অপরের পরিপূরক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে গণতন্ত্র ছাড়া প্রকৃত সমাজতন্ত্র কখনোই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। নাগরিক স্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা সমাজতান্ত্রিক সমাজে আরও বেশি বিকশিত হওয়া উচিত। কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে, তবে তা আর সমাজতান্ত্রিক থাকে না।
১৪। আন্তর্জাতিক সংহতি: বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাউটস্কি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির ওপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনালের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে বিশ্ব শ্রমিকদের এক প্ল্যাটফর্মে আনার কাজ করেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাদ যেহেতু একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা, তাই একে পরাজিত করতে হলে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে আন্তর্জাতিকতাবাদের চর্চা করাই ছিল তাঁর দর্শনের অন্যতম লক্ষ্য।
১৫। সামাজিক সংস্কার: বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্যের পাশাপাশি কাউটস্কি তাৎক্ষণিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পক্ষে ছিলেন। শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমানো, মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের পরিবেশ উন্নত করার আন্দোলনকে তিনি সমর্থন করতেন। তিনি মনে করতেন এই ছোট ছোট সংস্কারগুলো শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান বাড়াবে এবং তাদের আন্দোলনের প্রতি আরও আগ্রহী করবে। সংস্কারের মাধ্যমেই শ্রমিক শ্রেণী ক্রমান্বয়ে চূড়ান্ত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে ধাবিত হবে।
১৬। শিক্ষা ও সংস্কৃতি: শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশকে কাউটস্কি অত্যন্ত জরুরি মনে করতেন। বুর্জোয়া সংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে শ্রমিকদের নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য শ্রমিকদের মাঝে নিয়মিত পড়াশোনা, পত্রিকা প্রকাশ এবং তাত্ত্বিক আলোচনার আয়োজন করা প্রয়োজন। সচেতন ও শিক্ষিত শ্রমিক শ্রেণীই কেবল একটি শোষণমুক্ত ও সাম্যবাদী সমাজ পরিচালনা করতে পারে।
১৭। শান্তিবাদী অবস্থান: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কাউটস্কি যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং বিশ্ব শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং শ্রমিকদের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, যুদ্ধ কেবল শাসক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে আর সাধারণ মানুষের জীবন ধ্বংস করে। সমাজতন্ত্রীদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত যুদ্ধের বিরোধিতা করে বিশ্বজুড়ে শান্তি ও ভাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
সমাপ্ত কথা: সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, কার্ল কাউটস্কির সমাজতান্ত্রিক দর্শন ছিল মূলত গণতান্ত্রিক মার্ক্সবাদের এক অনন্য রূপরেখা। তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের চেয়ে নিয়মতান্ত্রিক, সংসদীয় ও শান্তিপূর্ণ বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী ছিলেন। যদিও সমকালীন অনেক উগ্র বিপ্লবী তাঁর তত্ত্বকে সংশোধনবাদ বলে সমালোচনা করেছেন, তবুও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধের মেলবন্ধন ঘটানোর ক্ষেত্রে কাউটস্কির অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।