- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মিশেলস রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা বিশ্লেষণ করে ‘গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহবিধি’ ধারণা দেন। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক আদর্শে গঠিত সংগঠনও সময়ের সঙ্গে অল্পসংখ্যক নেতার নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং নেতৃত্ব ক্রমে স্থায়ী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক দলে গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহবিধির কার্যকারিতা বর্ণনা:
১। নেতৃত্বের কেন্দ্রীকরণ: রাজনৈতিক দল যত বড় ও জটিল হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ তত অল্পসংখ্যক নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। সাধারণ সদস্যরা দৈনন্দিন নীতি নির্ধারণে সরাসরি অংশ নিতে পারেন না। ফলে শীর্ষ নেতৃত্ব ধীরে ধীরে দলীয় ক্ষমতার প্রধান নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়।
২। সংগঠনের জটিলতা: বৃহৎ রাজনৈতিক দল পরিচালনায় নিয়মিত প্রশাসন, যোগাযোগ, অর্থব্যবস্থা ও পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। সব সদস্যের পক্ষে প্রতিটি সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। তাই কিছু দক্ষ ব্যক্তি স্থায়ীভাবে সংগঠন পরিচালনার দায়িত্ব নেয় এবং তাদের হাতে ক্ষমতা জমা হতে থাকে।
৩। পেশাদার নেতৃত্ব: রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অভিজ্ঞতা ও বিশেষ দক্ষতা অর্জনকারী নেতারা সাধারণ সদস্যের তুলনায় বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তারা দলীয় নিয়ম, কৌশল ও প্রশাসন ভালোভাবে জানেন। ফলে নেতৃত্বের ওপর সংগঠনের নির্ভরতা বাড়ে এবং ক্ষমতার পরিবর্তন ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।
৪। তথ্যের নিয়ন্ত্রণ: শীর্ষ নেতারা দলীয় তথ্য, নথি, যোগাযোগ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সাধারণ সদস্যদের তুলনায় বেশি অবগত থাকেন। তথ্যের এই অসমতা তাদের ক্ষমতা বাড়ায়। সাধারণ কর্মীরা প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে সহজে প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না।
৫। অর্থের নিয়ন্ত্রণ: দলের তহবিল, অনুদান ও নির্বাচনী অর্থব্যবস্থা সাধারণত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে থাকে। অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে প্রার্থী নির্বাচন, সংগঠন পরিচালনা ও কর্মসূচি নির্ধারণে নেতৃত্বের প্রভাব বাড়ে। এতে ছোট একটি গোষ্ঠী দলের কার্যক্রমের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
৬। আমলাতন্ত্রের বিস্তার: দল বড় হলে স্থায়ী কর্মকর্তা, দপ্তর ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। এসব ব্যক্তি নিয়মিত সংগঠন পরিচালনা করায় সাধারণ সদস্যের তুলনায় অধিক দক্ষতা ও প্রভাব অর্জন করেন। ফলে দলীয় আমলাতন্ত্র নেতৃত্বের সঙ্গে মিলে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী সৃষ্টি করতে পারে।
৭। সদস্যের উদাসীনতা: সাধারণ সদস্যদের অনেকে নিয়মিত দলীয় সিদ্ধান্তে অংশ নিতে আগ্রহী বা সক্ষম হন না। তারা নেতৃত্বের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা শীর্ষ নেতাদের স্বাধীনতা বাড়ায় এবং ধীরে ধীরে দলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে।
৮। নেতৃত্বের মর্যাদা: জনপ্রিয় ও দীর্ঘদিনের নেতারা কর্মীদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদা ও আনুগত্য অর্জন করেন। তাদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা অনেক সময় দলীয় ঐক্যের বিরুদ্ধে মনে করা হয়। ফলে ব্যক্তিপূজা ও অন্ধ আনুগত্য বৃদ্ধি পেয়ে নেতৃত্বের ক্ষমতা আরও সুসংহত হতে পারে।
৯। দক্ষতার অসমতা: দলীয় রাজনীতি পরিচালনায় বক্তৃতা, সংগঠন, নির্বাচন ও আলোচনার বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন। সব সদস্যের মধ্যে এসব দক্ষতা সমান থাকে না। ফলে দক্ষ নেতারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ধরে রাখেন এবং সাধারণ সদস্যদের তুলনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি প্রভাব বিস্তার করেন।
১০। প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ: নির্বাচনে কে দলীয় প্রার্থী হবে, তা নির্ধারণে শীর্ষ নেতৃত্বের প্রভাব সাধারণত বেশি থাকে। মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতা নেতাদের প্রতি আনুগত্য বাড়ায়। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করলে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা কমে এবং গোষ্ঠীতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হয়।
১১। বিরোধ দমন: ক্ষমতাবান নেতৃত্ব অনেক সময় দলের ভিন্নমতাবলম্বী সদস্যদের প্রভাব সীমিত করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ পদ না দেওয়া, মনোনয়ন থেকে বাদ দেওয়া বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে বিরোধিতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এতে নেতৃত্বের বিকল্প গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
১২। স্বার্থের পরিবর্তন: মিশেলসের মতে, নেতারা প্রথমে সাধারণ সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার জন্য উঠে এলেও পরে নিজেদের পদ ও ক্ষমতা রক্ষায় বেশি আগ্রহী হতে পারেন। তখন সংগঠনের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে নেতৃত্বের ব্যক্তিগত স্বার্থের দূরত্ব তৈরি হয় এবং গোষ্ঠীতন্ত্র আরও সুদৃঢ় হয়।
১৩। ক্ষমতা সংরক্ষণ: দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে দলীয় নিয়ম, কমিটি ও সংগঠনকে প্রভাবিত করতে পারেন। নেতৃত্বের পরিবর্তন সীমিত হলে একই গোষ্ঠী বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকে। এতে নতুন নেতৃত্ব ও সাধারণ সদস্যের অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হয়।
১৪। গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা: রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হলেও তার অভ্যন্তরে সব সদস্যের সমান প্রভাব বাস্তবে নিশ্চিত করা কঠিন। নেতৃত্ব, দক্ষতা ও সংগঠনগত প্রয়োজনের কারণে ক্ষমতা অল্পসংখ্যক ব্যক্তির হাতে জমা হয়। এ কারণেই মিশেলস একে প্রায় অনিবার্য প্রবণতা হিসেবে দেখেছেন।
১৫। গোষ্ঠীর আধিপত্য: একসময় শীর্ষ নেতা, কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সমন্বয়ে একটি ক্ষুদ্র প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি হয়। তারা গুরুত্বপূর্ণ নীতি, পদ ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে দলের বৃহৎ সদস্যসমাজের ওপর অল্পসংখ্যক ব্যক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়—এটাই গোষ্ঠীতন্ত্রের মূল প্রকাশ।
১৬। পরিবর্তনের বাধা: দলের ভেতরে নির্বাচন বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের ব্যবস্থা থাকলেও প্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠী তার সংগঠন, অর্থ ও যোগাযোগের সুবিধা ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে। ফলে নিয়মতান্ত্রিক পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে নতুন নেতৃত্বের জন্য ক্ষমতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
১৭। সামগ্রিক কার্যকারিতা: গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহবিধি রাজনৈতিক দলের সংগঠনগত বাস্তবতা ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় নয়। নিয়মিত অভ্যন্তরীণ নির্বাচন, স্বচ্ছতা, নেতৃত্বের মেয়াদসীমা ও সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে অল্পসংখ্যক নেতার অতিরিক্ত আধিপত্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
উপসংহার: রবার্ট মিশেলসের গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহবিধি দেখায় যে রাজনৈতিক দল যত সংগঠিত ও বৃহৎ হয়, নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা তত বাড়ে। তবে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই গোষ্ঠীতান্ত্রিক প্রবণতা সীমিত রাখা সম্ভব।