- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- ছয় দফা কর্মসূচি কী?
Or, ছয় দফা কর্মসূচি সম্পর্কে কি জান?
Or, ঐতিহাসিখ ৬দফা সম্পর্কে লিখ।
Or, ছয় দফার পটভূমি আলোচনা কর।
উত্তর::ভূমিকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছয় দফা কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য দূর করার দাবিতে এই কর্মসূচি উত্থাপন করা হয়। এটি বাঙালি জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুস্পষ্ট রূপ দেয় এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ছয় দফা কর্মসূচির পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: “ছয় দফা” বলতে ছয়টি নির্দিষ্ট দাবি বা প্রস্তাবকে বোঝায় এবং “কর্মসূচি” বলতে কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য গৃহীত পরিকল্পিত কার্যক্রমকে বোঝায়। তাই ছয় দফা কর্মসূচির শাব্দিক অর্থ হলো ছয়টি দাবির সমন্বয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা।
ছয় দফা কর্মসূচি: ছয় দফা কর্মসূচি হলো ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি-সম্বলিত কর্মসূচি। এটি “বাঙালির মুক্তির সনদ” হিসেবে পরিচিত ছিল।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে ২৩ মার্চ ১৯৬৬ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
ছয় দফা কর্মসূচির দাবিসমূহ:
১। শাসনতান্ত্রিক কাঠামো: ছয় দফার প্রথম দাবিতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকারের ফেডারেশন হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়। এতে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার দাবি জানানো হয়।
২। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: এই দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় রাখার কথা বলা হয়। অন্যান্য সকল বিষয় পরিচালনার ক্ষমতা প্রদেশগুলোর হাতে দেওয়ার দাবি করা হয়, যাতে পূর্ব পাকিস্তান নিজের উন্নয়ন ও প্রশাসন পরিচালনায় অধিক স্বাধীনতা লাভ করে।
৩। মুদ্রা ব্যবস্থা: ছয় দফায় পৃথক মুদ্রা ব্যবস্থা অথবা এমন ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করা হয়, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থ পাচার রোধ করা যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো সম্ভব হয়।
৪। রাজস্ব ও কর ব্যবস্থা: এই দাবিতে প্রদেশগুলোর হাতে কর নির্ধারণ ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রদেশগুলো নির্দিষ্ট অংশ প্রদান করবে—এমন ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়।
৫। বৈদেশিক মুদ্রা ও বাণিজ্য: বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। এর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং বৈদেশিক আয়ের ওপর নিজস্ব অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।
৬। আঞ্চলিক নিরাপত্তা: এই দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক সামরিক বা আধাসামরিক বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়, যাতে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যায়।
ছয় দফা কর্মসূচির গুরুত্ব:
১। স্বায়ত্তশাসনের দাবি: ছয় দফা কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে শক্তিশালী করে। এটি রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সুসংগঠিত আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
২। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ: ছয় দফা কর্মসূচি বাঙালির রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩। স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি: ছয় দফা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।
৪। অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদ: এই কর্মসূচির মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।
উপসংহার: ছয় দফা কর্মসূচি ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির একটি ঐতিহাসিক দলিল। এটি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে শুরু করে পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছয় দফা কর্মসূচির গুরুত্ব চিরস্মরণীয়।