- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক দেশটির রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের একটি কেন্দ্রীয় এবং অত্যন্ত জটিল বিষয়। স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্রের এই দুটি স্তম্ভ ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং নীতির ক্ষেত্রে এক নিরন্তর টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলেছে। এই নিবন্ধে সেই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব এবং এর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি সহজ ও আকর্ষণীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো।
সামরিক বাহিনীর প্রাধান্য: পাকিস্তানের ইতিহাসে সামরিক বাহিনী বেসামরিক সরকারের ওপর সুস্পষ্ট প্রাধান্য বজায় রেখেছে। এই প্রাধান্য কেবল চারটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই প্রতিফলিত নয়, বরং নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের সময়েও সামরিক বাহিনী পর্দার আড়াল থেকে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্র নীতির সিদ্ধান্তগুলিতে প্রভাব ফেলে। এই আধা-সামরিক শাসন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের যাত্রাকে বারবার ব্যাহত করেছে, যেখানে সামরিক নেতারা প্রায়শই নিজেদেরকে জাতীয় স্বার্থের রক্ষক হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। (১)
সামরিক অভ্যুত্থান ও ক্ষমতা দখল: পাকিস্তান তার ৭৭ বছরের ইতিহাসে একাধিক সফল সামরিক অভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়েছে, যা সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের সর্বাধিক নেতিবাচক দিকটিকে তুলে ধরে। জেনারেল আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউল হক এবং পারভেজ মুশাররফের মতো সামরিক শাসকরা বারবার সংবিধান স্থগিত করে ক্ষমতা দখল করেছেন, যা গণতন্ত্রের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে ফেলেছে। এই অভ্যুত্থানগুলি জনগণের আস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভিত্তি দুর্বল করেছে। (২)
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শূন্যতা: দুর্বল রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রায়শই সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করেছে। যখন বেসামরিক সরকারগুলি দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং অন্তর্কলহে জর্জরিত হয়ে দেশের গুরুতর সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে, তখন সামরিক বাহিনী “শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার” অজুহাতে ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। এই রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে সামরিক বাহিনী নিজেদের শাসনকে ন্যায্যতা দিয়েছে। (৩)
আর্থ-সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাব: সামরিক বাহিনী কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। সামরিক সংস্থাগুলি ব্যবসায়িক উদ্যোগ, রিয়েল এস্টেট এবং অন্যান্য আর্থিক খাতে জড়িত, যা তাদের বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি প্রদান করে। এই আর্থ-সামাজিক ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর জন্য রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর এবং বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করার একটি অতিরিক্ত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। (৪)
জাতীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা: পাকিস্তানে “জাতীয় নিরাপত্তা” ধারণাটি মূলত সামরিক বাহিনীর দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত এবং পরিচালিত হয়। ভারত-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি প্রায়শই সামরিক বাহিনীর একচেটিয়া ডোমেন হিসেবে বিবেচিত হয়। বেসামরিক সরকারগুলি এই নিরাপত্তা ডোমেনে নিজেদের প্রয়োজনীয় প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় না, যা সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা বজায় রাখে। (৫)
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা: সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা, বিশেষ করে আইএসআই (ISI), পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত ভূমিকা পালন করে। এই সংস্থাগুলি রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন বা দুর্বল করা এবং নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে বেসামরিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার জন্য প্রায়শই অভিযুক্ত হয়। তাদের এই অদৃশ্য হস্তক্ষেপ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। (৬)
গণতান্ত্রিক কাঠামোর দুর্বলতা: পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি, যেমন সংসদ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশন, সামরিক বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী হস্তক্ষেপের কারণে ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল থেকেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং সাংবিধানিক শাসন কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় শক্তি ও স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। সামরিক বাজেটে সংসদের সীমিত নিয়ন্ত্রণও এই দুর্বলতার একটি প্রমাণ। (৭)
গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের ভূমিকা: সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের এই টানাপোড়েনে গণমাধ্যম এবং বিচার বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু চ্যালেঞ্জিং ভূমিকা পালন করে। একদিকে, সামরিক বাহিনীর প্রভাব এবং চাপ সত্ত্বেও কিছু সাহসী গণমাধ্যম গণতন্ত্রের পক্ষে আওয়াজ তোলে। অন্যদিকে, বিচার বিভাগ কখনও কখনও সামরিক অভ্যুত্থানকে “ডক্ট্রিন অফ নেসেসিটি”-এর অধীনে বৈধতা দিয়েছে, আবার কখনও সামরিক শাসনের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জও করেছে। (৮)
আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব: আন্তর্জাতিক শক্তিগুলি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন, পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রায়শই সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলে। এই আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলি সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক বৈধতা এবং সম্পদ সরবরাহ করে, যা বেসামরিক সরকারের কর্তৃত্বকে খর্ব করতে পারে। (৯)
সংবিধানের ভূমিকা ও ব্যর্থতা: পাকিস্তানের সংবিধান কাগজে-কলমে গণতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং বারবার হস্তক্ষেপে তা কার্যকরভাবে সংরক্ষিত হতে পারেনি। সংবিধানের ২৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো বিধানগুলি সামরিক শাসন দ্বারা বারবার খর্ব বা স্থগিত করা হয়েছে। অষ্টম ও সপ্তদশ সংশোধনীগুলি সামরিক শাসনের অপব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। (১০)
বেসামরিক সরকারের সীমাবদ্ধতা: নির্বাচিত বেসামরিক সরকারগুলি প্রায়শই সামরিক বাহিনীর ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে এবং পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে সংগ্রাম করে। এমনকি যখন তারা ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের নীতিগুলি এবং সিদ্ধান্তগুলি সামরিক বাহিনীর অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রভাবিত হতে পারে। এই সীমিত ক্ষমতা বেসামরিক সরকারকে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বাধা দেয়। (১১)
জনগণের সমর্থন ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা: এই সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের মধ্যে গণতন্ত্রের প্রতি একটি দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যায়। যদিও কিছু ক্ষেত্রে সামরিক শাসনের সুবিধা দেখা গেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে জনগণ সাংবিধানিক শাসন, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনকে সমর্থন করে। রাজনৈতিক দলগুলির মাধ্যমে এই গণতান্ত্রিক চেতনা প্রকাশ পায়। (১২)
আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষতা: পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র প্রায়শই সামরিক বাহিনীর প্রভাবের সামনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সামরিক শাসনামলে আমলারা সামরিক নেতাদের অধীনে কাজ করতে বাধ্য হয়, যা তাদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে ক্ষুন্ন করে। বেসামরিক সরকার এলে তারা আবার গণতান্ত্রিক কর্তৃত্বের অধীনে ফিরে আসে, যা দ্বৈত আনুগত্যের একটি পরিস্থিতি তৈরি করে। (১৩)
পররাষ্ট্র নীতিতে সামরিক একাধিপত্য: পররাষ্ট্র নীতি, বিশেষ করে ভারত, আফগানিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর অবিসংবাদিত একাধিপত্য রয়েছে। সামরিক বাহিনী নিজেদেরকে দেশের প্রধান কৌশলগত পরিকল্পনাকারী হিসাবে দেখে, যেখানে বেসামরিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীকে প্রায়শই সামরিক হাই কমান্ডের সিদ্ধান্তগুলিকে অনুসরণ করতে হয়। এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অভাব সৃষ্টি করে। (১৪)
গণতন্ত্রের প্রতি সামরিক প্রতিশ্রুতি: সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, সামরিক বাহিনী প্রকাশ্যে গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে এবং সরাসরি ক্ষমতা দখল থেকে বিরত রয়েছে। তবে এই প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, পর্দার আড়াল থেকে প্রভাব বিস্তার করার অভিযোগ এখনও বিদ্যমান। সামরিক বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে একটি প্রকৃত পরিবর্তন না এলে স্থিতিশীল বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন। (১৫)
ক্ষমতা ভাগাভাগির মডেল: পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ককে প্রায়শই একটি ক্ষমতা ভাগাভাগির মডেল হিসেবে দেখা হয়, যেখানে সামরিক বাহিনী নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ডোমেনগুলি ধরে রাখে এবং বেসামরিক সরকার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়গুলি পরিচালনা করে। তবে এই অসম ভাগাভাগি প্রায়শই বেসামরিক সরকারের ক্ষীণতা এবং সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত কর্তৃত্বকে তুলে ধরে। (১৬)
ভবিষ্যতের পথ ও স্থিতিশীলতা: পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি টেকসই এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর। সামরিক বাহিনীকে অবশ্যই সাংবিধানিক ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং বেসামরিক নেতৃত্বকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যা সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত কমিয়ে আনবে। (১৭)
শেষকথা: পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক একটি ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি, যা দেশটির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বারবার চ্যালেঞ্জ করেছে। এই সম্পর্কের জটিলতা এবং অসম ক্ষমতা বন্টন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা। ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন সামরিক বাহিনীর সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা মেনে চলা এবং একই সাথে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা, যা আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখবে।

