- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: নিরাপত্তা বলতে সাধারণত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষাকে বোঝায়। প্রচলিত বা প্রথাগত নিরাপত্তা মূলত সামরিক শক্তি, যুদ্ধ ও বহিঃশত্রুর মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেয়। এটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তার একটি প্রাচীন ধারণা।
প্রচলিত বা প্রথাগত নিরাপত্তার বৈশিষ্ট্যগুলো
১। রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ধারণা: প্রচলিত নিরাপত্তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। এখানে ব্যক্তি বা সমাজের নিরাপত্তার চেয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২। সামরিক গুরুত্ব: প্রচলিত নিরাপত্তায় সামরিক শক্তিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়। শক্তিশালী সেনাবাহিনী, আধুনিক অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে রাষ্ট্র সম্ভাব্য শত্রুর মোকাবিলা করে। যুদ্ধ প্রতিরোধ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সামরিক সক্ষমতাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
৩। বহিঃশত্রুর আশঙ্কা: প্রথাগত নিরাপত্তা মূলত বাইরের শত্রুর আক্রমণের ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেয়। অন্য রাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন, সীমান্ত সংঘাত ও যুদ্ধের সম্ভাবনাকে প্রধান নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করে।
৪। যুদ্ধভিত্তিক চিন্তা: প্রচলিত নিরাপত্তার ধারণা যুদ্ধ ও সংঘাতের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এতে রাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক প্রতিযোগিতা, অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রতিরক্ষা কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। শান্তি বজায় রাখার জন্যও অনেক সময় সামরিক প্রস্তুতিকে প্রয়োজনীয় মনে করা হয়।
৫। অস্ত্র প্রতিযোগিতা: প্রচলিত নিরাপত্তার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো অস্ত্র সংগ্রহের প্রবণতা। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উন্নত অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করে। তবে অতিরিক্ত অস্ত্র প্রতিযোগিতা অনেক সময় আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি করতে পারে।
৬। সীমান্ত সুরক্ষা: প্রথাগত নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। সীমান্তে শত্রুর অনুপ্রবেশ, আক্রমণ বা দখল ঠেকাতে সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
৭। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা: প্রচলিত নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য হলো জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করা। রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সম্পদ, ভূখণ্ড ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করে। জাতীয় স্বার্থকে এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
৮। শক্তির ভারসাম্য: প্রচলিত নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের তুলনায় বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠলে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করে।
৯। গোপনীয়তা ও প্রতিরক্ষা নীতি: প্রথাগত নিরাপত্তায় সামরিক পরিকল্পনা, প্রতিরক্ষা কৌশল ও গোয়েন্দা তথ্য গোপন রাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাষ্ট্র সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করে। এসব পরিকল্পনা সাধারণত জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে।
১০। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন: প্রচলিত নিরাপত্তায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার সক্ষমতা অর্জন করে।
১১। আন্তর্জাতিক সংঘাতের গুরুত্ব: প্রচলিত নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক সংঘাত ও রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। বিভিন্ন দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ, সীমান্ত সমস্যা ও সামরিক উত্তেজনাকে নিরাপত্তার প্রধান বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১২। সার্বভৌমত্ব রক্ষা: রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষা প্রচলিত নিরাপত্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোনো বাইরের শক্তি যেন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এজন্য রাষ্ট্র সামরিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
উপসংহার: প্রচলিত বা প্রথাগত নিরাপত্তা মূলত রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, সার্বভৌমত্ব ও বহিঃশত্রুর মোকাবিলার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আধুনিক সময়ে নিরাপত্তার ধারণা আরও বিস্তৃত হলেও রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রচলিত নিরাপত্তার পাশাপাশি নতুন নিরাপত্তা বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।