- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নির্ভর করে তার বৈধতার ওপর। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সরকারের কার্যক্ষমতার মধ্যে যখন বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়, তখনই বৈধতার সংকট দেখা দেয়। সদ্য স্বাধীন বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এই রাষ্ট্রগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার এটি একটি অন্যতম প্রধান কারণ।
সংকট ও কারণসমূহের বিস্তারিত আলোচনা:
১। ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য: উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘকাল বিদেশী শাসনাধীনে ছিল। ঔপনিবেশিক শাসকেরা জনকল্যাণের চেয়ে শোষণ এবং নিজস্ব শাসন টিকিয়ে রাখাকেই বেশি প্রাধান্য দিত। স্বাধীনতার পরও এই রাষ্ট্রগুলোর প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোতে সেই আমলাতান্ত্রিক ও দমনমূলক মানসিকতা রয়ে গেছে। ফলে সাধারণ জনগণ বর্তমান স্বাধীন সরকারকে নিজেদের আপন ভাবতে পারে না, যা গভীর বৈধতার সংকট তৈরি করে।
২। অর্থনৈতিক বৈষম্য: এসব রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তার সুফল সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায় না। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন পাহাড়সম হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষ যখন মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়, তখন তারা প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। অর্থনৈতিক এই চরম অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজনৈতিক বৈধতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
৩। দুর্নীতির বিস্তার: উন্নয়নশীল দেশগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। সরকারি সেবা লাভ, চাকরি বা ব্যবসার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির শিকার হতে হয়। মেধার মূল্যায়ন না হয়ে যখন অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রাধান্য পায়, তখন জনগণের ক্ষোভ বাড়ে। এই ব্যাপক দুর্নীতি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের বিশ্বাসকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়।
৪। রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বড় দুর্বলতা। এখানে দল বা সরকার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা নীতির চেয়ে ব্যক্তির ইচ্ছায় পরিচালিত হয়। সংসদ, নির্বাচন কমিশন বা বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক এই দুর্বলতার কারণে ক্ষমতার সুষ্ঠু রূপান্তর ঘটে না এবং রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়।
৫। আইনের শাসনের অভাব: এই রাষ্ট্রগুলোতে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের পরিবর্তে প্রায়ই পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়। প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যান, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বিচারহীনতায় ভোগেন। বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের এই আস্থা হারিয়ে যাওয়া বৈধতা সংকটের অন্যতম কারণ। আইন যখন সবার জন্য সমান হয় না, তখন সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
৬। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন: উন্নয়নশীল দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রায়শই বিতর্কিত এবং অনিয়মে ভরা থাকে। ভোট কারচুপি, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের প্রবণতা দেখা যায়। জনগণ যখন বুঝতে পারে যে তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই, তখন তারা সরকারকে অবৈধ মনে করে। একটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে।
৭। নাগরিক সচেতনতা: আধুনিক যুগে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা নিজেদের অধিকার, সরকারের দায়িত্ব এবং বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখে। সরকারের যেকোনো ভুল নীতি বা স্বৈরাচারী আচরণকে তারা সহজে মেনে নিতে চায় না। এই ক্রমবর্ধমান সচেতনতা অযোগ্য বা জবাবদিহিতাহীন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
৮। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: সরকারি দপ্তরগুলোতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং কাজের ধীরগতি অত্যন্ত প্রকট। সাধারণ মানুষ সামান্য কাজের জন্য দিনের পর দিন সরকারি অফিসে ঘুরতে বাধ্য হয়। আমলাদের অহংকারী আচরণ এবং জনবিচ্ছিন্নতা নাগরিকদের মনে চরম অসন্তোষের জন্ম দেয়। প্রশাসনিক এই অদক্ষতা ও হয়রানি পরোক্ষভাবে পুরো শাসনব্যবস্থার বৈধতাকে সংকটের মুখে ফেলে দেয়।
৯। জাতীয়তাবোধের অভাব: বহু উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও উপজাতির মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে। তাদের মধ্যে শক্তিশালী একক জাতীয়তাবোধ গড়ে না উঠলে প্রায়ই অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দেয়। উপজাতীয় বা আঞ্চলিক স্বার্থ যখন জাতীয় স্বার্থের ওপর স্থান পায়, তখন কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই ধরনের জাতিগত বিভাজন রাষ্ট্রের সামগ্রিক বৈধতাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে।
১০। করিশমাটিক নেতৃত্ব: অনেক সময় এই রাষ্ট্রগুলো কোনো একক জনপ্রিয় বা অলৌকিক গুণসম্পন্ন নেতার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই নেতার অনুপস্থিতিতে বা মৃত্যুর পর রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। পরবর্তী নেতৃত্ব আর আগের মতো জনগণের ওপর গভীর প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না। যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প নেতৃত্বের এই অভাব বৈধতার সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।
১১। বহিরাগত হস্তক্ষেপ: দুর্বল অর্থনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়শই শক্তিশালী বিদেশি রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে এসব দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নীতি নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করে। সরকার যখন জনগণের স্বার্থ বাদ দিয়ে বিদেশি শক্তির ইশারায় চলে, তখন তার নিজস্ব বৈধতা ক্ষুণ্ন হয়।
১২। গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ: এই রাষ্ট্রগুলোতে প্রায়শই বাকস্বাধীনতা এবং স্বাধীন সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়। সরকার নিজের খামখেয়ালিপনা লুকাতে গণমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ বা আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে জনগণ সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর সন্দিহান হয়ে ওঠে। বিকল্প ধারার প্রচার মাধ্যমে তখন সরকারের সমালোচনা তীব্র হয়ে সংকট তৈরি করে।
১৩। মৌলিক চাহিদার অপূরণ: অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করা যেকোনো সরকারের প্রধান দায়িত্ব। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে সম্পদ সীমিত থাকা এবং সুষ্ঠু বণ্টনের অভাবে বিশাল জনগোষ্ঠী এই অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত থাকে। ক্ষুধার্ত ও আশ্রয়হীন মানুষ কোনো আদর্শ বা রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রতি অনুগত থাকতে পারে না। এই ব্যর্থতা সরকারের প্রতি জনগণের চরম অনাস্থা ডেকে আনে।
১৪। আদর্শগত দ্বন্দ্ব: সমাজতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী, ধর্মীয় বা ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের সংঘাত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খুব সাধারণ বিষয়। সমাজ পরিচালনার মূল নীতি কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য থাকে না। এক দল ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী দলের নীতি সম্পূর্ণ বদলে ফেলে, যা নীতিগত ধারাবাহিকতা নষ্ট করে। এই আদর্শিক বিশৃঙ্খলা রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতাকে সাধারণ মানুষের চোখে হালকা করে দেয়।
১৫। নাগরিক অধিকার হরণ: মানুষের মৌলিক মানবাধিকার যেমন সভা-সমাবেশ করা বা নিজের মতামত প্রকাশ করার অধিকার এখানে প্রায়ই খর্ব করা হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র যেমন পুলিশ বা প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিরোধী মতকে নির্মমভাবে দমন করা হয়। ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে সাময়িকভাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা জনগণের মন থেকে শ্রদ্ধা কেড়ে নেয়। এই দমনমূলক নীতিই বৈধতা সংকটের অন্যতম চালিকাশক্তি।
১৬। সুশাসনের অভাব: সুশাসন বলতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করাকে বোঝায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সুশাসনের এই উপাদানগুলোর তীব্র ঘাটতি স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। নীতি নির্ধারণে জনগণের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে না। সুশাসনের এই অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতাকে অকার্যকর ও ভিত্তিহীন করে তোলে।
১৭। সামরিক হস্তক্ষেপ: উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে বেসামরিক সরকার দুর্বল হলে প্রায়শই সামরিক বাহিনী ক্ষমতা হস্তগত করে। সামরিক শাসন সাময়িকভাবে শৃঙ্খলা আনলেও তা কখনোই জনগণের নির্বাচিত বা বৈধ শাসন হতে পারে না। বন্দুকের নলের মুখে প্রতিষ্ঠিত এই শাসনব্যবস্থা জনগণের স্বাভাবিক সমর্থন লাভ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সামরিক বা আধা-সামরিক সরকারগুলো সবসময়ই তীব্র বৈধতার সংকটে ভুগে থাকে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে বৈধতার সংকট কোনো একক কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতার যৌথ ফল। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। জনগণ যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজের অংশীদারিত্ব অনুভব করবে, তখনই কেবল এই বৈধতার সংকট কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে।