- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সভ্যতা বিকাশের ধারায় মানব সমাজ বিভিন্নভাবে নিজেদের সংগঠিত করেছে। নৃবিজ্ঞানী এলমান সার্ভিস (Elman Service)-এর মতে, মানুষের রাজনৈতিক সংগঠনের ইতিহাসে ব্যান্ড হলো সবচেয়ে সরলতম রূপ, যা শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে দেখা যায়। অন্যদিকে, কৃষির বিকাশের সাথে সাথে অপেক্ষাকৃত জটিল চীফডম বা সর্দারতন্ত্রের উদ্ভব হয়। এই দুটি সংগঠন কাঠামোয় আকার, নেতৃত্ব, সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং জীবনযাত্রার ধরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, যা মানব সমাজের বিবর্তনকে বুঝতে সাহায্য করে।
১।জনসংখ্যার আকার: ব্যান্ড হলো ছোট এবং গতিশীল গোষ্ঠী, যেখানে সাধারণত কয়েক ডজন বা ৫০ থেকে ১০০ জনের মতো মানুষ থাকে। এই সীমিত সংখ্যক সদস্য মূলত কয়েকটি পরিবার নিয়ে গঠিত হয়, যা তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, চীফডম হলো একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ইউনিট, যার জনসংখ্যা শত শত থেকে শুরু করে কয়েক হাজার পর্যন্ত হতে পারে। এই বৃহৎ জনসংখ্যাকে একত্রিত ও নিয়ন্ত্রিত করার জন্য একটি সুসংগঠিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়, যা চীফডমের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
২।নেতৃত্বের ধরণ: ব্যান্ড সমাজে কোনো আনুষ্ঠানিক বা স্থায়ী নেতা থাকে না। এখানে নেতৃত্ব অস্থায়ী এবং দক্ষতার ভিত্তিতে অর্জিত হয়; যেমন, একজন অভিজ্ঞ শিকারী বা জ্ঞানী প্রবীণ ব্যক্তি কোনো বিশেষ সিদ্ধান্তের জন্য নেতা হিসেবে গণ্য হতে পারেন, কিন্তু তার কোনো স্থায়ী ক্ষমতা নেই। পক্ষান্তরে, চীফডমে আনুষ্ঠানিক, স্থায়ী এবং কেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব বিদ্যমান। এখানে একজন বংশগত সর্দার বা ‘চীফ’ থাকেন, যার ক্ষমতা তার জন্মসূত্রে আসে এবং তিনি তার অঞ্চলের উপর স্থায়ী কর্তৃত্ব ভোগ করেন।
৩।সামাজিক সমতা: ব্যান্ড সমাজকে সমতাবাদী (Egalitarian) বা সমমর্যাদার সমাজ বলা হয়। এই সমাজে সম্পদ, প্রতিপত্তি বা ক্ষমতার ক্ষেত্রে খুব বেশি তারতম্য দেখা যায় না এবং প্রধানত বয়স ও লিঙ্গ ভেদে পার্থক্য থাকে। অন্যদিকে, চীফডম হলো স্তরবিন্যস্ত (Ranked) সমাজ, যেখানে ক্ষমতা এবং সম্পদ সর্দারের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকে। সর্দারের নিকটাত্মীয়রা সমাজে উচ্চ মর্যাদা ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, যা স্পষ্ট সামাজিক বৈষম্য তৈরি করে।
৪।অর্থনৈতিক ভিত্তি: ব্যান্ড সমাজের অর্থনীতি প্রধানত শিকার ও সংগ্রহ-এর উপর নির্ভরশীল। তাদের জীবনযাপন যাযাবর প্রকৃতির, যার কারণে তাদের খাদ্যের সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়াতে হয় এবং তাদের কোনো স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে না। অন্যদিকে, চীফডমের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। স্থিতিশীল কৃষি ব্যবস্থা তাদের স্থায়ী বসতি স্থাপন করতে এবং উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করতে সাহায্য করে, যা জটিল সামাজিক কাঠামো ও বিশেষায়িত কাজের সুযোগ তৈরি করে।
৫।সম্পদ বণ্টন: ব্যান্ড সমাজে সম্পদ সাধারণত প্রত্যক্ষ আদান-প্রদান বা পারস্পরিকতার মাধ্যমে বণ্টিত হয়, যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকে না। শিকার করা পশুর মাংস বা সংগৃহীত খাদ্য সকলে নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেয়, যা সমতাবাদী মনোভাবকে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে, চীফডম সমাজে পুনর্বণ্টন (Redistribution)-এর ব্যবস্থা চালু ছিল। এক্ষেত্রে উৎপন্ন ফসল বা সম্পদ প্রথমে সর্দারের কাছে জমা হতো এবং সর্দার তা পুনরায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে বিতরণ করতেন।
৬।বসতির প্রকৃতি: তাদের শিকার ও সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল জীবনযাত্রার কারণে ব্যান্ডগুলি প্রায়শই যাযাবর বা আধা-যাযাবর হয়। তারা তাদের শিকারের এলাকা ও ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের বসতি স্থান পরিবর্তন করে। এর বিপরীতে, চীফডমগুলি কৃষিভিত্তিক হওয়ায় তারা স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। তাদের গ্রামগুলো সাধারণত বৃহৎ এবং অপেক্ষাকৃত জটিল হয়, যা তাদের স্থায়ী জীবনযাত্রার প্রতিফলন ঘটায়।
৭।ক্ষমতার উৎস: ব্যান্ড নেতার ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব আসে তার ব্যক্তিগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সম্মানের মাধ্যমে, যা তিনি নিজের যোগ্যতা বলে অর্জন করেন। তার পরামর্শ মেনে চলা বাধ্যতামূলক নয়, বরং সম্মতির ভিত্তিতে কাজ হয়। কিন্তু চীফডমের সর্দারের ক্ষমতা হলো বংশগত বা জন্মসূত্রে প্রাপ্ত এবং এই ক্ষমতাকে প্রায়শই ঐশ্বরিক বা অলৌকিক উৎস থেকে আগত বলে মনে করা হতো। ফলে তার আদেশ পালন করা জনসাধারণের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল।
৮।শ্রম বিভাজন: ব্যান্ড সমাজে শ্রম বিভাজন অত্যন্ত সরল, যা সাধারণত বয়স ও লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। সেখানে বিশেষ কোনো কাজ বা পেশার জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয় না, বরং সবাই মোটামুটি সব কাজ করতে সক্ষম। তবে চীফডমে জটিল শ্রম বিভাজন দেখা যায়। কৃষি কাজের পাশাপাশি কারিগর, যোদ্ধা, ধর্মীয় নেতা ইত্যাদি বিভিন্ন বিশেষায়িত পেশার সৃষ্টি হয়, যা সমাজের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা বৃদ্ধি করে।
💡 শেষকথা: নৃবিজ্ঞানী এলমান সার্ভিসের চার-স্তরীয় মডেল অনুযায়ী, ব্যান্ড এবং চীফডম রাজনৈতিক সংগঠনের দুটি ভিন্ন পর্যায়কে তুলে ধরে। ব্যান্ড হলো ক্ষুদ্র, সমতাবাদী এবং যাযাবর প্রকৃতির সংগঠন, যা টিকে থাকার জন্য পারস্পরিক নির্ভরতা ও সম্মতির ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে, চীফডম হলো অপেক্ষাকৃত বৃহৎ, স্তরবিন্যস্ত ও স্থায়ী কৃষিভিত্তিক সংগঠন, যা কেন্দ্রীভূত বংশগত নেতৃত্ব এবং সম্পদ পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে কাজ করে। এই পার্থক্য মানব সমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবর্তনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপকে চিহ্নিত করে।

