- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দলিল। দীর্ঘকাল ব্রিটিশ শাসনের পর ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে এই আইনটি চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া এই আইনের মাধ্যমেই মূলত ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ঘটে এবং দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের বৈশিষ্ট্যসমূহ
১। দুটি ডোমিনিয়ন সৃষ্টি: এই আইনের সবচেয়ে প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ব্রিটিশ ভারতের ভূখণ্ডকে বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম ডোমিনিয়নের সৃষ্টি করা। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে এই দুটি নতুন রাষ্ট্র বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে এবং তারা নিজস্ব শাসনভার গ্রহণ করে। এর ফলে দীর্ঘ প্রায় দুইশত বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটে এবং ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়।
২। ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব বিলোপ: এই আইন পাস হওয়ার সাথে সাথে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজমুকুটের দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্বের সম্পূর্ণ অবসান ঘটে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বা সরকারের আর কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ বা আইনি অধিকার এই অঞ্চলের ওপর অবশিষ্ট ছিল না। ডোমিনিয়ন দুটির অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক কোনো বিষয়েই ব্রিটিশ সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা হারায়। এর মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান সম্পূর্ণ মুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
৩। গভর্নর জেনারেল নিয়োগ: আইন অনুযায়ী নবগঠিত প্রতিটি ডোমিনিয়নের জন্য পৃথক একজন করে গভর্নর জেনারেল নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। এই গভর্নর জেনারেলকে ডোমিনিয়নের মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুযায়ী সরাসরি ব্রিটিশ সম্রাট বা সম্রাজ্ঞী কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়। তবে উভয় রাষ্ট্র সম্মত হলে একজন সাধারণ গভর্নর জেনারেলও দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। মূলত এটি ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানের একটি পদ মাত্র।
৪। আইনসভার সার্বভৌমত্ব: নতুন রাষ্ট্র দুটির গণপরিষদ বা আইনসভাকে সম্পূর্ণ সার্বভৌম ও স্বাধীন ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এই আইনসভাগুলো নিজ নিজ দেশের জন্য যেকোনো ধরনের আইন প্রণয়ন, সংশোধন বা বাতিল করার চূড়ান্ত অধিকারী ছিল। এমনকি তারা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া যেকোনো আইনকেও তাদের ভূখণ্ডে বাতিল ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখত। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের কোনো ভেটো বা অনুমোদনের ক্ষমতা আর ছিল না।
৫। সংবিধান প্রণয়ন: নতুন রাষ্ট্রগুলোর জন্য সম্পূর্ণ নিজস্ব এবং স্বাধীন সংবিধান প্রণয়নের পূর্ণ দায়িত্ব ও ক্ষমতা নিজ নিজ গণপরিষদের ওপর ন্যস্ত করা হয়। যতদিন পর্যন্ত নতুন সংবিধান তৈরি না হচ্ছিল, ততদিন পর্যন্ত এই গণপরিষদগুলোই দেশের মূল আইনসভা হিসেবে কাজ করার স্বীকৃতি পায়। এর ফলে দেশ দুটি নিজেদের ইচ্ছা ও আদর্শ অনুযায়ী ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র গড়ে তোলার সুযোগ লাভ করে।
৬। ১৯৩৫ সালের আইন: যতদিন পর্যন্ত নতুন সংবিধান তৈরি ও কার্যকর না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের এই আইন অনুযায়ী দেশ দুটি পরিচালিত হওয়ার কথা বলা হয়। তবে সাময়িকভাবে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে শাসনকাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। রাষ্ট্র দুটি চাইলে এই ১৯৩৫ সালের আইনের যেকোনো ধারা নিজেদের প্রয়োজন অনুসারে সংশোধন বা পরিবর্তন করে ব্যবহার করতে পারত।
৭। দেশীয় রাজ্যসমূহের স্বাধীনতা: ব্রিটিশ ভারতের অধীনে থাকা প্রায় পাঁচ শতাধিক আধা-স্বাধীন দেশীয় রাজ্যগুলোর ওপর থেকে ব্রিটিশ রাজমুকুটের সব ধরনের চুক্তি ও কর্তৃত্বের অবসান ঘটানো হয়। এই রাজ্যগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয় যে তারা চাইলে ভারত বা পাকিস্তান যেকোনো একটি ডোমিনিয়নে যোগ দিতে পারত। আবার তারা চাইলে নিজেদের সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেও ঘোষণা করার আইনি অধিকার লাভ করেছিল।
৮। উপজাতীয় অঞ্চলের চুক্তি: দেশীয় রাজ্যগুলোর মতো তৎকালীন ভারতের সীমান্ত ও অন্যান্য উপজাতীয় অঞ্চলের সাথে ব্রিটিশ সরকারের সম্পাদিত সব চুক্তি ও সম্পর্ক এই আইনের মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায়। ১৫ আগস্টের পর থেকে এই অঞ্চলগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়। পরবর্তীতে তারা আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে ভারত বা পাকিস্তানের সাথে নতুন করে সম্পর্ক বা চুক্তি স্থাপনের অধিকার লাভ করে।
৯। সম্রাটের খেতাব বর্জন: এই আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রধান বা ব্রিটেনের সম্রাটের অফিশিয়াল উপাধি থেকে ‘ভারতের সম্রাট’ বা ‘Emperor of India’ পদবিটি চিরতরে বাদ দেওয়া হয়। এটি ছিল প্রতীকীভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের ওপর ব্রিটিশদের রাজকীয় ক্ষমতার সমাপ্তির একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এর ফলে ব্রিটিশ রাজা কেবল ব্রিটেনের রাজা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেন, ভারতের সাথে রাজকীয় সম্পর্ক ছিন্ন হয়।
১০। ভারত সচিব পদের বিলুপ্তি: ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় দীর্ঘদিন ধরে থাকা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ‘ভারত সচিব’ বা ‘Secretary of State for India’ পদটি এই আইনের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হয়। তার পরিবর্তে ভারতীয় উপমহাদেশের বিষয়গুলো দেখাশোনার জন্য কমনওয়েলথ বিষয়ক সচিবের দপ্তরে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। এর ফলে লন্ডনে বসে ভারত শাসনের প্রশাসনিক কাঠামোর শেষ চিহ্নটিও মুছে যায়।
১১। সীমানা নির্ধারণ কমিশন: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিশেষ করে পাঞ্জাব ও বাংলা প্রদেশের সঠিক সীমানা নির্ধারণের জন্য একটি আইনি সীমানা কমিশন গঠনের কথা বলা হয়। স্যার র্যাডক্লিফের নেতৃত্বে এই কমিশন গঠিত হয় যা ‘র্যাডক্লিফ কমিশন’ নামে পরিচিত ছিল। এই কমিশনের প্রধান কাজ ছিল বিতর্কিত জেলাগুলোর ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাভিত্তিক সীমানা নির্ধারণ করে দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করা।
১২। প্রাদেশিক আইনসভা: নতুন সংবিধান প্রণীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান প্রাদেশিক আইনসভাগুলো তাদের নিজ নিজ প্রদেশে স্বায়ত্তশাসিতভাবে আইন প্রণয়ন ও শাসনকাজ পরিচালনার ক্ষমতা ধরে রাখে। তবে গভর্নর জেনারেল বা প্রাদেশিক গভর্নরগণ আগের মতো একক স্বৈরাচারী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন না। তাদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব ধরনের প্রশাসনিক কাজ সম্পাদন করতে হতো।
১৩। সরকারি কর্মচারীদের সুরক্ষা: ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের পূর্বে নিযুক্ত বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরি ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে এই আইনে বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। যারা নতুন ডোমিনিয়নগুলোর অধীনে চাকরি চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তাদের পূর্বের বেতন, ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এর ফলে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা শূন্যতা তৈরি হয়নি।
১৪। সশস্ত্র বাহিনীর বিভাজন: অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের বিশাল সশস্ত্র বাহিনীকে দুই দেশের মধ্যে সুনির্দিষ্ট অনুপাতে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত এই আইনে অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেনা, নৌ এবং বিমানবাহিনীর সদস্য ও সামরিক সরঞ্জামাদি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার জন্য একটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়। সাময়িকভাবে একজন ফিল্ড মার্শালের অধীনে এই বিভাজন প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
১৫। যৌথ চুক্তি সম্পাদন: ক্ষমতা হস্তান্তরের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, মুদ্রা, ডাক বিভাগ এবং অন্যান্য জরুরি বিষয়ে পারস্পরিক চুক্তি সম্পাদনের স্বাধীনতা দেওয়া হয়। নতুন রাষ্ট্র দুটি যেন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক সংকটে না পড়ে, সেজন্যই এই ধারাটি রাখা হয়েছিল। এর ফলে দুই দেশের সরকার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছিল।
১৬। ব্রিটিশ রাজের ভেটো: এই আইনের মাধ্যমে গভর্নর জেনারেলকে যেকোনো প্রাদেশিক বা কেন্দ্রীয় আইন পাসের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ রাজার পক্ষে ভেটো বা সম্মতি আটকে রাখার পুরনো ক্ষমতা থেকে মুক্ত করা হয়। গভর্নর জেনারেল এখন থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজ দেশের মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বাধ্য ছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের কোনো প্রতিনিধি বা রাজার আইন বাতিলের এই ক্ষমতা বিলুপ্ত হওয়ায় ডোমিনিয়নের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়।
১৭। অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা: নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশ পরিচালনার জন্য একটি সাময়িক বা অন্তর্বর্তীকালীন শাসন কাঠামোর রূপরেখা এই আইনে দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশে যেন কোনো ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি না হয়। এই ব্যবস্থার ফলে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন ছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত আইনি দলিল। এই আইনের মাধ্যমেই দীর্ঘদিনের বিদেশি শাসনের অবসান ঘটে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের উদয় হয়। রক্তক্ষয়ী দেশভাগ ও নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই আইনটি এ অঞ্চলের মানুষের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা অর্জনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।