- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা: মানবসভ্যতার বিকাশের ধারায় কৃষিভিত্তিক সমাজের পর শিল্প সমাজের উদ্ভব ঘটে। পরবর্তীতে প্রযুক্তি, তথ্য ও জ্ঞানের দ্রুত প্রসারের ফলে সমাজে নতুন পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থাকেই শিল্পোত্তর সমাজ বা উত্তর আধুনিক সমাজ বলা হয়। এটি এমন একটি সমাজ যেখানে উৎপাদনের চেয়ে তথ্য, প্রযুক্তি, গবেষণা ও সেবাখাত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শিল্পোত্তর সমাজ বা উত্তর আধুনিক সমাজ:
১৯৬৯ সালে আলাঁ তুরেন শিল্পোত্তর সমাজ ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন। ১৯৭৩ সালে ড্যানিয়েল বেল তাঁর গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ১৯৮০ সালে অ্যালভিন টফলার “তৃতীয় তরঙ্গ” ধারণার মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করেন।
শিল্পোত্তর সমাজ হলো শিল্পভিত্তিক সমাজের পরবর্তী পর্যায়ের সমাজব্যবস্থা। এই সমাজে কলকারখানা ও বস্তু উৎপাদনের পাশাপাশি জ্ঞান, তথ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সেবা প্রধান ভূমিকা পালন করে। আধুনিক বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এই ধরনের সমাজব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য বেশি লক্ষ্য করা যায়।
শিল্পোত্তর সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
১. জ্ঞান ও তথ্যের গুরুত্ব বৃদ্ধি: এই সমাজে জ্ঞানকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষণা, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিচালিত হয়। এ ছাড়া তথ্যপ্রবাহ, যোগাযোগ ও শিক্ষার প্রসার এই সমাজের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে। গবেষণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২. সেবাখাতের সম্প্রসারণ: শিল্প সমাজে উৎপাদন খাত প্রধান হলেও শিল্পোত্তর সমাজে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, যোগাযোগ, সফটওয়্যার ও পরামর্শমূলক সেবার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এসব সেবা অর্থনীতির মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে এবং কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে। এভাবে নাগরিক জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
৩. প্রযুক্তিনির্ভর জীবনব্যবস্থা: কম্পিউটার, ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের কাজ, যোগাযোগ ও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এই প্রযুক্তি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, কৃষি ও প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে দ্রুততা, দক্ষতা ও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সমাজ ক্রমশ ডিজিটাল নির্ভর হয়ে উঠছে।
৪. নতুন ধরনের কর্মসংস্থান: এই সমাজে শ্রমিকের পাশাপাশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষক, তথ্য বিশ্লেষক ও প্রযুক্তিবিদদের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের কাজে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বেশি প্রয়োজন হয়। ফলে শ্রমবাজারে নতুন চাহিদা ও প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই পরিবর্তন দ্রুত।
৫. বিশ্বায়নের প্রভাব: উত্তর আধুনিক সমাজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ প্রযুক্তির মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ব্যবসা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সীমান্তের গুরুত্ব কমে যায়, বৈশ্বিক সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় নতুন মাত্রা পায়। এটি স্পষ্ট।
৬. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন: এই সমাজে মানুষের চিন্তা, জীবনধারা ও মূল্যবোধে পরিবর্তন দেখা যায়। মানুষ নিজের পছন্দ, স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন কিছুটা শিথিল হয় এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনদর্শন প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এটি লক্ষণীয়।
শিল্পোত্তর সমাজের ধারণাটি সমাজবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বেল ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তাঁর The Coming of Post-Industrial Society গ্রন্থের মাধ্যমে জনপ্রিয় করেন। তিনি দেখিয়েছেন যে আধুনিক সমাজে শিল্প উৎপাদনের পাশাপাশি জ্ঞান ও তথ্যের ভূমিকা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে শিল্পোত্তর সমাজের কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বেকারত্বের নতুন ধরন, ডিজিটাল বৈষম্য এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাই প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্পোত্তর সমাজ বা উত্তর আধুনিক সমাজ হলো এমন একটি আধুনিক সমাজব্যবস্থা যেখানে জ্ঞান, তথ্য, প্রযুক্তি ও সেবাখাত শিল্প উৎপাদনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উপসংহার: শিল্পোত্তর সমাজ মানবসভ্যতার একটি নতুন ধাপ, যেখানে জ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। এই সমাজ মানুষের জীবনকে সহজ করেছে এবং নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।