- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সমাজতন্ত্র হলো এমন একটি প্রগতিশীল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবধারা, যা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখায়। এই ব্যবস্থায় উৎপাদন ও বণ্টনের মূল উপায়গুলো কোনো ব্যক্তিবিশেষের মালিকানায় না থেকে সমাজের সর্বসাধারণের বা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণের বিকল্প হিসেবে ধনকূবেরদের আধিপত্য ভেঙে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটেছিল। মূলত সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠাই হলো এই বৈপ্লবিক জীবনদর্শনের মূল কথা।
১। সামাজিক মালিকানা: সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কলকারখানা, জমিজমা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ব্যক্তির পরিবর্তে রাষ্ট্রের সার্বিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা। এই ব্যবস্থায় কোনো ধনকূপতি ব্যক্তিগত স্বার্থে জাতীয় সম্পদ বা উৎপাদনের মাধ্যমগুলো ব্যবহার বা দখল করতে পারে না। রাষ্ট্রের সকল সম্পদ সমগ্র জনগণের যৌথ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য চিরতরে দূর হয়। সাধারণ মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে সকল সম্পদ ব্যবহৃত হয়।
২। পরিকল্পিত অর্থনীতি: পুঁজিবাদী বাজারের অনিশ্চয়তা ও এলোমেলো প্রতিযোগিতার বিপরীতে সমাজতন্ত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ও কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়। দেশের উৎপাদন কী হবে, কতটুকু হবে এবং কীভাবে তা জনগণের মধ্যে বণ্টন করা হবে তা রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়। অপচয় রোধ এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই পরিকল্পিত অর্থনীতির প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো অগ্রাধিকার পায়। বাজারে কোনো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ এখানে থাকে না।
৩। শোষণহীন সমাজ: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষ কর্তৃক মানুষের ওপর যেকোনো ধরনের আর্থিক ও সামাজিক শোষণ পুরোপুরি বন্ধ করা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মালিকপক্ষ যেভাবে শ্রমিকদের উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে ধনী হয়, সমাজতন্ত্রে তার কোনো স্থান নেই। এখানে প্রতিটি মানুষ তার পরিশ্রমের ন্যায্য পাওনা পায় এবং শ্রমিকের শ্রমের মূল্য যথাযথভাবে সুরক্ষিত থাকে। শোষক ও শোষিত শ্রেণীর মধ্যবর্তী দেয়াল ভেঙে একটি সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তোলা হয়। ফলে সমাজে সর্বস্তরের মানুষের সম্মানজনক উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।
৪। সাম্য প্রতিষ্ঠা: সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সকলের সমান অধিকার ও সুষম সুযোগ তৈরি করা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি বড় প্রতিশ্রুতি। এখানে জন্ম, বংশ, ধর্ম বা শ্রেণীর ভিত্তিতে কোনো ধরনের নাগরিক বৈষম্য অনুমোদন করা হয় না। প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রীয় সেবা, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সমানভাবে পাওয়ার অধিকার রাখে। সম্পদের অতি-কেন্দ্রীকরণ রোধ করে তা সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সাম্যের নীতিই এই শাসনব্যবস্থার সার্বিক মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
৫। মৌলিক চাহিদা: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলোর দায়িত্ব রাষ্ট্র নিজে বহন করে। নাগরিকরা যাতে কোনো অবস্থাতেই জীবনের প্রাথমিক প্রয়োজনগুলো থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা হয়। রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি মানুষের কাছে তা নিখরচায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এর ফলে জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান সুনিশ্চিত হয়। মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক সংকট দূর করাই এই ব্যবস্থার সফলতা।
৬। কর্মের অধিকার: সমাজতন্ত্রে প্রতিটি সক্ষম নাগরিকের জন্য উপযুক্ত কাজ পাওয়াকে আইনি ও সামাজিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। বেকারত্ব দূর করা সমাজতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রধান বাধ্যতামূলক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব যোগ্যতা ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ পায় এবং শ্রম প্রদান করে। “যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ এবং কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক”—এই নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। ফলে সমাজে কোনো অলস বা বেকার জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সাধারণত থাকে না।
৭। শ্রেণীহীন সমাজ: শ্রেণী সংগ্রামের অবসান ঘটিয়ে একটি উচ্চ-নীচ ভাবাবিহীন ও শ্রেণীহীন সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলা সমাজতন্ত্রের পরম লক্ষ্য। পুঁজিবাদী সমাজের মতো এখানে সমাজ মালিক ও শ্রমিক কিংবা ধনী ও দরিদ্র—এই দুই বিপরীতমুখী ব্লকে বিভক্ত থাকে না। সর্বহারা ও শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যের ভিত্তিতে একটি একমুখী সমাজ গঠিত হয়। সবাই সমাজের সমান স্তরের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা পায়। শ্রেণীগত হিংসা ও সংঘাত দূর হয়ে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়।
৮। মুনাফাহীন উৎপাদন: সমাজতন্ত্রে কোনো পণ্য বা সেবা উৎপাদনের পেছনে ব্যক্তিগত মুনাফা বা লাভের লালসা কাজ করে না। কেবল মানবকল্যাণ এবং সাধারণ সামাজিক চাহিদাকে সামনে রেখে সকল ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়ে থাকে। পুঁজিবাদীদের মতো পণ্যের কৃত্রিম দাম বাড়িয়ে অধিক লাভ করার মনোভাব এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত। জনগণের আসল প্রয়োজন মেটানোই উৎপাদনের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এই নীতি সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে অত্যন্ত সহজ ও চাপমুক্ত করে তোলে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, সমাজতন্ত্র হলো একটি শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী ও মানবিক সমাজ গঠনের বৈপ্লবিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা। এটি কেবল ব্যক্তিগত মুনাফার ওপর জোর না দিয়ে সমগ্র মানবজাতির সার্বিক কল্যাণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চায়। যদিও এর বাস্তব প্রয়োগে বিভিন্ন যুগে নানান সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, তবুও এর মূল আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক। একটি বৈষম্যহীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী গঠনে সমাজতন্ত্রের মূল চেতনা চিরকাল মানবজাতিকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।