- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মার্কসীয় সমাজতন্ত্র আধুনিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। জার্মান দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্কস (Karl Marx) এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels) এই মতবাদের মূল প্রবক্তা। তাঁরা সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিবৈষম্য দূর করে একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। মার্কসীয় সমাজতন্ত্র মূলত অর্থনৈতিক সাম্য, শ্রমিক শ্রেণির অধিকার এবং সামাজিক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে।
১। শ্রেণি সংগ্রাম: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শ্রেণি সংগ্রামের ধারণা। মার্কসের মতে, মানব ইতিহাস মূলত শোষক ও শোষিত শ্রেণির মধ্যকার সংঘর্ষের ইতিহাস। পুঁজিবাদী সমাজে মালিক শ্রেণি শ্রমিকদের শ্রমের ওপর নির্ভর করে লাভ অর্জন করে। এই বৈষম্যের কারণে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং এর ফলেই শ্রেণি সংগ্রামের মাধ্যমে নতুন সমাজব্যবস্থার জন্ম হয়।
২। ব্যক্তিগত মালিকানা বিলোপ: মার্কসীয় সমাজতন্ত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা উৎপাদনের উপকরণের ব্যক্তিগত মালিকানার বিরোধিতা করে। মার্কসের মতে, কলকারখানা, জমি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকলে ধনী শ্রেণি শ্রমিকদের শোষণ করার সুযোগ পায়। তাই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণ রাষ্ট্র বা সমগ্র সমাজের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বলা হয়।
৩। অর্থনৈতিক সাম্য: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা। মার্কস মনে করেন, সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে তা দূর করা প্রয়োজন। সকল মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদের বণ্টন এবং উৎপাদনের সুবিধা সবার মধ্যে সমানভাবে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই এই মতবাদের অন্যতম লক্ষ্য।
৪। শ্রমিকের অধিকার: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রে শ্রমিক শ্রেণিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মার্কসের মতে, শ্রমিকরাই উৎপাদনের মূল শক্তি, কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাই শ্রমিকদের শোষণ থেকে মুক্ত করা, ন্যায্য মজুরি প্রদান এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
৫। পুঁজিবাদের বিরোধিতা: মার্কসীয় সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে। মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী সমাজে সম্পদ অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং শ্রমিক শ্রেণি শোষণের শিকার হয়। এই ব্যবস্থার পরিবর্তে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় যেখানে উৎপাদনের উদ্দেশ্য হবে মানুষের কল্যাণ, ব্যক্তিগত লাভ নয়।
৬। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ধারণা রয়েছে। মার্কস মনে করেন, সমাজের সম্পদ সঠিকভাবে বণ্টন ও পরিচালনার জন্য রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। রাষ্ট্র উৎপাদনের উপকরণ নিয়ন্ত্রণ করে সকল মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করবে।
৭। বিপ্লবী পরিবর্তন: মার্কসীয় সমাজতন্ত্র সমাজ পরিবর্তনের জন্য বিপ্লবী আন্দোলনের কথা বলে। মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হবে। শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে একটি বিপ্লবের মাধ্যমে পুরোনো শোষণমূলক ব্যবস্থা ধ্বংস করে নতুন সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন।
৮। সাম্যবাদী সমাজ: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই সমাজে শ্রেণিভেদ থাকবে না এবং সকল মানুষ সমান সুযোগ ও অধিকার ভোগ করবে। মার্কসের মতে, এমন একটি সমাজে শোষণ, বৈষম্য ও শ্রেণি বিভাজনের অবসান ঘটবে এবং মানুষ স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারবে।
৯। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। মার্কসের মতে, সমাজের পরিবর্তন মূলত অর্থনৈতিক কাঠামো ও উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটে। মানুষের চিন্তা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অনেকাংশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই সমাজ বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
১০। সামাজিক কল্যাণ: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণের ধারণা। এই মতবাদে ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে সমাজের সকল মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
উপসংহার: মার্কসীয় সমাজতন্ত্র মূলত শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মতবাদ। শ্রেণি সংগ্রাম, ব্যক্তিগত মালিকানার বিলোপ, অর্থনৈতিক সাম্য এবং শ্রমিকের অধিকার—এসব এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। যদিও এই মতবাদ নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক রয়েছে, তবুও সমাজ ও অর্থনীতি বিশ্লেষণে মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের গুরুত্ব আজও উল্লেখযোগ্য।