- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিষ্ণুতা, সংলাপ ও সমঝোতার অভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই অভাবই গণতান্ত্রিক সরকারের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করছে। এ নিবন্ধে সেই বাস্তবতা তুলে ধরা হবে।
১। সংঘাতময় রাজনীতি: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতময় রাজনীতিতে অভ্যস্ত। একপক্ষ আরেকপক্ষকে ‘শত্রু’ হিসেবে দেখে। আলোচনার টেবিলে না বসে রাস্তায় নামার সংস্কৃতি প্রবল। ফলে সংসদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এই সংঘাতময় মনোভাব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে তুলছে।
২। আলোচনার অভাব: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থবহ আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। নির্বাচন কমিশন, সংবিধান সংস্কার কিংবা নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে দলগুলো একসাথে বসে সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। আলোচনা ছাড়া যে কোনো সিদ্ধান্ত টেকসই হয় না। ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
৩। সমঝোতার সংকট: সমঝোতার রাজনীতি বাংলাদেশে প্রায় অনুপস্থিত। দলগুলো নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নেই। আসন বণ্টন, জোট গঠন কিংবা সংস্কার প্রস্তাবে সমঝোতা ভেস্তে যায়। সমঝোতা ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অসম্ভব। আর স্থিতিশীলতা ছাড়া সরকার কার্যকর হতে পারে না।
৪। সংসদ অকার্যকর: সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। আলোচনা, বিতর্ক ও সমালোচনার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বিরোধী দল সংসদে না গেলে সিদ্ধান্তের বৈধতা কমে যায়। একপক্ষীয় সংসদ গণতন্ত্রের চেতনার পরিপন্থী। ফলে সরকারের জবাবদিহিতা কমে যায়।
৫। সহিংসতার রাজনীতি: রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। নির্বাচনী সহিংসতায় শত শত প্রাণ ঝরেছে। সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে দলীয় কর্মীরা। এই সহিংসতা সহিষ্ণুতার অভাবের সরাসরি ফল। সহিংসতা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধ্বংস করে। এতে সাধারণ মানুষ ভোটের মাঠ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
৬। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব: দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র নেই। নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনুপস্থিত। দলের সিদ্ধান্তে সাধারণ সদস্যদের অংশগ্রহণ কম। যে দলে গণতন্ত্র নেই, তারা রাষ্ট্রে গণতন্ত্র চর্চা করতে পারে না। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব নেতৃত্বের সংকট তৈরি করে।
৭। মতাদর্শগত কঠোরতা: দলগুলো নিজেদের মতাদর্শকেই একমাত্র সত্য মনে করে। ভিন্নমতকে সহজে মেনে নিতে পারে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনার পথ বন্ধ করে দেয়। মতাদর্শগত কঠোরতা আপসের রাজনীতিকে অসম্ভব করে তোলে। ফলে জাতীয় ঐক্য গঠন ব্যর্থ হয়।
৮। বিশ্বাসের সংকট: দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব প্রকট। একপক্ষ আরেকপক্ষের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে। বিশ্বাসের অভাবে ছোট ছোট বিষয়ও বড় সংঘাতে রূপ নেয়। আস্থা ছাড়া কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি হয় না। এই সন্দেহের রাজনীতি গণতন্ত্রকে অচল করে দেয়।
৯। সংলাপের নামে শোডাউন: কখনো কখনো সংলাপের নামে দলগুলো শোডাউন করে। আসলে সেখানে সমাধান খোঁজা হয় না, বক্তৃতা দিয়েই ক্ষান্ত হয়। ফলাফল থাকে শূন্য। এই ধরনের নাটকীয় সংলাপ জনগণের আস্থা কমায়। প্রকৃত সংলাপ তখনই সফল হয় যখন পক্ষগুলো নমনীয় থাকে।
১০। নির্বাচনী সংস্কার আটকে থাকে: নির্বাচনী সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে না। কে নির্বাচন কমিশন গঠন করবে, ভোটের তত্ত্বাবধান করবে—এসব প্রশ্নে分歧 থাকে। আলোচনার অভাবে সংস্কার আটকে থাকে। পুরনো ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে প্রশ্ন ওঠে। এতে নির্বাচিত সরকারের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
১১। সরকারের জবাবদিহিতা কমে: বিরোধী দল কার্যকরভাবে সমালোচনা করতে না পারলে সরকার স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে。 শক্ত বিরোধী দল ছাড়া জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় না। সংলাপের অভাবে সরকার বিরোধী মত শুনতে আগ্রহী হয় না। ফলে ভুল নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই অবস্থা গণতান্ত্রিক শাসনকে দুর্বল করে।
১২। নাগরিক সমাজের দুর্বলতা: রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণুতা নাগরিক সমাজকেও প্রভাবিত করে। সহনশীলতার চর্চা না থাকলে সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ে। নাগরিক সমাজ তখন দলীয় লাইনে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে স্বাধীন মত প্রকাশের পরিবেশ সংকুচিত হয়। এই অবস্থা গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
১৩। সংবিধান সংকট: সংবিধান সংস্কার নিয়ে দলগুলোর মধ্যে গভীর分歧 রয়েছে। কেউ চায় মৌলিক পরিবর্তন, কেউ চায় সংস্কার। সমঝোতার অভাবে সংবিধান সংকট চলতেই থাকে। এই অনিশ্চয়তা সরকার পরিচালনায় অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সংবিধানিক স্থিতিশীলতা ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না।
১৪। তরুণ নেতৃত্বের সংকট: নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব দলীয় কাঠামোয় জায়গা পায় না। পুরনো নেতৃত্ব পরিবর্তনে অনীহা দেখায়। ফলে নতুন চিন্তা ও উদ্যম রাজনীতিতে আসতে পারে না। তরুণদের অংশগ্রহণ কমলে দলগুলো জনগণের সাথে সংযোগ হারায়। এই সংযোগহীনতা গণতন্ত্রকে জনবিচ্ছিন্ন করে তোলে।
১৫। জনগণের আস্থা হ্রাস: রাজনৈতিক দলগুলোর অকার্যকারিতা জনগণের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। ভোটার turnout কমছে, মানুষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আস্থা ছাড়া গণতান্ত্রিক সরকার জনসমর্থন পায় না। জনসমর্থনহীন সরকার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ফলে গণতন্ত্র ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
১৬। আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ: রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় ভোগে, উন্নয়ন সহযোগীরা সন্দিহান হয়। সহিষ্ণুতা ও সংলাপের অভাব এই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে বাধা। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই অবস্থা কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে।
১৭। সমাধানের পথ: এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম শর্ত সহিষ্ণুতা ও সংলাপ। দলগুলিকে সংসদে ও বাইরে নিয়মিত আলোচনায় বসতে হবে। জাতীয় স্বার্থে আপস করতে শিখতে হবে। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে। তবেই গণতান্ত্রিক সরকার কার্যকর হতে পারে। জনগণের আস্থা ফিরবে। বাংলাদেশ টেকসই গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে।
উপসংহার: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিষ্ণুতা, আলোচনা ও সমঝোতার অভাব বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে গভীর সংকটে ফেলেছে। এই অভাব সংসদ, নির্বাচন, সংবিধান ও সরকার পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। উত্তরণের একমাত্র পথ mutual respect ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। দলগুলো যদি জাতীয় স্বার্থে একসাথে কাজ করতে না শেখে, তবে গণতান্ত্রিক সরকার কখনোই কার্যকর হবে না। সময় এসেছে সংঘাতের রাজনীতি ছেড়ে সহনশীলতার রাজনীতিতে ফিরে আসার।