- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শিল্প বিপ্লবের পটভূমিতে যে কজন চিন্তাবিদ এক শোষণহীন ও সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, ফরাসি দার্শনিক ক্লদ হেনরি দ্য সেন্ট সাইমন তাদের অন্যতম। অবাস্তব ও অতি-আদর্শবাদী ভাবনার কারণে তার তত্ত্বকে ‘কাল্পনিক সমাজতন্ত্র’ বলা হলেও, এটিই পরবর্তীকালের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছিল।
১। ঐতিহাসিক পটভূমি: সেন্ট সাইমন এমন এক সময়ে তার সমাজতান্ত্রিক তত্ত্ব প্রচার করেন যখন ইউরোপে ফরাসি বিপ্লব এবং শিল্প বিপ্লবের ফলে তীব্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। সামন্তবাদের পতন এবং পুঁজিবাদের বিকাশ সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন সংকটের জন্ম দেয়। এই বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পেয়ে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকেই মূলত তার এই কাল্পনিক দর্শনের জন্ম হয়েছিল।
২। শ্রেণিহীন সমাজ: সেন্ট সাইমন সমাজে বিদ্যমান অলস ও পরজীবী শ্রেণির অবসান ঘটিয়ে একটি কর্মমুখী এবং উৎপাদনশীল সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার মতে, সমাজে কেবল তারাই সম্মানের পাত্র হবেন যারা সরাসরি উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকবেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমাজে কোনো কৃত্রিম ভেদাভেদ থাকবে না এবং প্রতিটি মানুষ তার মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সমান সুযোগ লাভ করবে।
৩। শিল্পের প্রাধান্য: সেন্ট সাইমনের কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের মূল ভিত্তি ছিল আধুনিক শিল্প ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন প্রক্রিয়া। তিনি মনে করতেন, সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শিল্পের বিকাশ এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। তার ভাবনায় একটি আদর্শ সমাজ হবে সম্পূর্ণ শিল্প-ভিত্তিক, যেখানে উৎপাদন বৃদ্ধিই হবে মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন।
৪। শ্রমিকদের গুরুত্ব: এই ফরাসি চিন্তাবিদ সমাজের চালিকাশক্তি হিসেবে বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী এবং উৎপাদনকারী শ্রমিকদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, সমাজের প্রকৃত হর্তাকর্তা হওয়া উচিত বিজ্ঞানী এবং শিল্প উদ্যোক্তারা, কোনো অলস শাসক বা সুবিধাভোগী শ্রেণি নয়। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই ছিল সেন্ট সাইমনের সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
৫। পরজীবী শ্রেণির বিলোপ: সেন্ট সাইমন তার সমাজ ব্যবস্থায় অলস অভিজাত, নিষ্ক্রিয় জমিদার এবং সুবিধাবাদী যাজক সম্প্রদায়কে পরজীবী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন যে, যারা কোনো শারীরিক বা মানসিক শ্রম না দিয়ে সমাজের সম্পদ ভোগ করে, তাদের কোনো স্থান থাকবে না। এই অলস গোষ্ঠীর বিলোপ ঘটিয়ে সমাজকে পুরোপুরি উৎপাদনশীল মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রস্তাব করেছিলেন তিনি।
৬। সম্পদের বণ্টন: সেন্ট সাইমনের অর্থনৈতিক দর্শনের একটি বড় দিক ছিল মেধা ও শ্রমের ভিত্তিতে সামাজিক সম্পদের সুষম ও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজে অবদান রাখবে এবং প্রত্যেকে তার কাজ অনুযায়ী প্রতিদান বা পারিশ্রমিক লাভ করবে। সম্পদের এই বণ্টন ব্যবস্থা সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে দারুণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন।
৭। রাষ্ট্রের ভূমিকা: সেন্ট সাইমনের কাল্পনিক সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রচলিত রাজনৈতিক ভূমিকার চেয়ে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিকার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রের মূল কাজ হবে মানুষের ওপর শাসন করা নয়, বরং উৎপাদন ও সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা করা। ফলে রাষ্ট্র একটি শাসনযন্ত্র থেকে ধীরে ধীরে একটি জনকল্যাণকর অর্থনৈতিক সংস্থায় রূপান্তরিত হবে যা সবার কল্যাণ নিশ্চিত করবে।
৮। বিজ্ঞানভিত্তিক শাসন: সমাজের শাসনভার কোনো অযোগ্য বা বংশানুক্রমিক রাজপরিবারের হাতে না রেখে বিজ্ঞানী এবং বিশেষজ্ঞদের হাতে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন সেন্ট সাইমন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং যৌক্তিক চিন্তাভাবনাই সমাজ থেকে সব ধরনের কুসংস্কার ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে পারে। বিজ্ঞানীদের পরিকল্পিত নীতিমালার আলোকেই সমাজ পরিচালিত হবে এবং এর ফলে রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমূল প্রগতি সাধিত হবে।
৯। পরিকল্পিত অর্থনীতি: সেন্ট সাইমন মুক্তবাজার অর্থনীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং তিনি একটি সুসংগঠিত ও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত অর্থনীতির কথা বলেছিলেন। তার মতে, অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা সমাজে অর্থনৈতিক সংকট এবং শোষণের জন্ম দেয় যা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে একটি সুনির্দিষ্ট এবং কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার আওতায় এনে পরিচালনা করার রূপরেখা তিনি তৈরি করেছিলেন।
১০। সামাজিক ঐক্য: সেন্ট সাইমন সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা ও পারস্পরিক ঐক্যের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, সমাজের সকল উৎপাদনশীল শক্তি যদি একসঙ্গে কাজ করে, তবে দ্রুত অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব। তার কাল্পনিক সমাজতন্ত্রে ধনী শিল্পপতি এবং দরিদ্র শ্রমিকের মধ্যে কোনো চিরস্থায়ী শত্রুতা বা শ্রেণি সংগ্রামের স্থান ছিল না।
১১। খ্রিস্টধর্মের সংস্কার: সেন্ট সাইমন তার জীবনের শেষভাগে ‘নতুন খ্রিস্টধর্ম’ বা ‘নিউ ক্রিশ্চিয়ানিটি’ নামক একটি আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ধারণার প্রবর্তন করেন। তিনি প্রচলিত ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে ধর্মের মূল নৈতিক বাণী তথা মানবপ্রেমের ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন এবং কল্যাণ সাধন করা।
১২। ব্যক্তিগত মালিকানা: ব্যক্তিগত মালিকানার বিষয়ে সেন্ট সাইমনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্যান্য চরমপন্থী সমাজতন্ত্রীদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ও মধ্যপন্থী। তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন না, বরং একে সামাজিক কল্যাণে ব্যবহারের কথা বলেছিলেন। সম্পদ যেন সমাজের ক্ষতিকর কোনো কাজে ব্যবহৃত না হয় এবং তা যেন কেবল অলসতার জন্ম না দেয়, সেটি নিশ্চিত করার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি।
১৩। উত্তরাধিকার বিলোপ: সমাজে জন্মগত সুবিধার অবসান ঘটাতে সেন্ট সাইমন উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার প্রথা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, পূর্বপুরুষের সম্পদের ওপর ভিত্তি করে কেউ যেন কাজ না করেই ধনী থাকার সুযোগ না পায়। প্রত্যেক মানুষকে নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজে নিজের স্থান তৈরি করে নিতে হবে, যা একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে সাহায্য করবে।
১৪। শিক্ষার বিস্তার: সেন্ট সাইমনের কাল্পনিক সমাজব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এবং নৈতিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একটি কুসংস্কারমুক্ত এবং প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্র নিজ দায়িত্বে সমাজ থেকে অজ্ঞতা দূর করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করবে এবং কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটাবে।
১৫। নারীর মুক্তি: সেন্ট সাইমন এবং তার অনুসারীরা সমাজে নারীর মর্যাদা রক্ষা এবং তাদের সামগ্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বেশ সোচ্চার ছিলেন। তিনি মনে করতেন, পুরুষতান্ত্রিক শৃঙ্খল থেকে নারীকে মুক্ত না করলে একটি আদর্শ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন কখনোই সম্ভব নয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকারের বিষয়টি তার কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের একটি অন্যতম প্রগতিশীল দিক ছিল।
১৬। শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন: সেন্ট সাইমন কোনো ধরনের সশস্ত্র বিপ্লব বা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের কথা বিশ্বাস করতেন না। তিনি মনে করতেন, প্রচার, আদর্শের বিস্তার এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে শাসকদের মন পরিবর্তন করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এই অতি-শান্তিবাদী ও সমঝোতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই পরবর্তীকালের সমাজবিজ্ঞানীরা তার এই তত্ত্বকে অত্যন্ত কাল্পনিক ও বাস্তববর্জিত বলে অভিহিত করেছেন।
১৭। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: সেন্ট সাইমন কেবল একটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে সামগ্রিক ইউরোপীয় ঐক্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন যে, ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের মধ্যকার যুদ্ধবিগ্রহ ভুলে একটি বিশাল শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক ফেডারেশন গঠন করবে। এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশ্বজুড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে এবং মানবজাতির সামগ্রিক প্রগতিকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে বলে তিনি মনে করতেন।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, সেন্ট সাইমনের সমাজতান্ত্রিক রূপরেখা তৎকালীন বাস্তবতায় কিছুটা অবাস্তব বা কাল্পনিক মনে হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক শোষনহীন সমাজ গঠনের যে বীজ তিনি বপন করেছিলেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এই প্রগতিশীল ভাবনাই পরবর্তী সময়ে কার্ল মার্ক্সসহ অন্যান্য সমাজতন্ত্রীদের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব গঠনে গভীর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।