- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো একটি সুষ্ঠু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। বাংলাদেশ বিগত কয়েক দশকে প্রভূত উন্নতি সাধন করলেও একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে এখনো নানা ধরনের কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
১। সম্পদের সীমাবদ্ধতা: আমাদের দেশে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হলো তীব্র সম্পদ ও তহবিলের স্বল্পতা। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব বা ট্যাক্স আদায় না হওয়ায় সরকারকে প্রায়ই বিদেশি সাহায্য ও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই পরনির্ভরশীলতার কারণে অনেক সময় নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুযায়ী স্বাধীনভাবে পরিকল্পনা সাজানো সম্ভব হয় না। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে অনেক উন্নয়নমূলক প্রকল্প মাঝপথেই থমকে দাঁড়ায় বা দীর্ঘায়িত হয়।
২। উপাত্তের নির্ভরযোগ্যতা: একটি সঠিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নির্ভুল ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপাত্ত সংগ্রহ পদ্ধতিতে ত্রুটি এবং সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যায়। দারিদ্র্যের হার, কর্মসংস্থান বা প্রবৃদ্ধির সঠিক তথ্য না থাকলে পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত হয় না। ফলে কাগজের কলমে তৈরি করা নকশার সাথে বাস্তব পরিস্থিতির বিশাল অমিল দেখা দেয়।
৩। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সফল করার জন্য রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক সময় পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া ভালো উদ্যোগ ও মহাপরিকল্পনাগুলো মাঝপথে বন্ধ বা আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে ঐকমত্যের অভাব রয়েছে। এই অস্থিতিশীলতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরাও দেশে পুঁজি খাটানোর ক্ষেত্রে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন।
৪। দুর্নীতি ও অপচয়: পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতি একটি মারাত্নক ব্যাধি হিসেবে কাজ করছে। সরকারি প্রকল্পগুলোর বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার না হয়ে অপচয় ও আত্মসাৎ হওয়ার নজির অহরহ দেখা যায়। এর ফলে প্রকল্পের মান যেমন খারাপ হয়, তেমনি নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষ পরিকল্পনার আসল সুফল থেকে বঞ্চিত হয়।
৫। দক্ষতার অভাব: সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্য দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। আমাদের দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অনেক সময়ই আধুনিক অর্থনৈতিক মডেল ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে পারেন না। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে প্রকল্প মূল্যায়ণ এবং তদারকি প্রক্রিয়াটি দুর্বল থেকে যায়। এই মানবসম্পদের অদক্ষতা সামগ্রিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে ধীরগতির এবং ত্রুটিপূর্ণ করে তোলে।
৬। অবকাঠামোগত দুর্বলতা: যেকোনো বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সফল করার পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী ও আধুনিক অবকাঠামো। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি, উন্নত সড়কপথ ও বন্দর সুবিধার অভাব এখনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা। অনুন্নত অবকাঠামোর কারণে শিল্পকারখানাগুলো তাদের পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে না। অবকাঠামো খাতের এই ঘাটতি দূর করতে গিয়ে পরিকল্পনার বড় একটি অংশ ব্যয় হয়ে যায়।
৭। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: সরকারি দপ্তরগুলোর লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং দীর্ঘসূত্রতা যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের গতিকে ধীর করে দেয়। একটি প্রকল্প অনুমোদন এবং তহবিল ছাড় করার প্রক্রিয়াটি এতই জটিল যে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করাই কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। আমলাতান্ত্রিক এই জটিলতার কারণে অনেক সময় বিদেশি অনুদানও যথাসময়ে ব্যবহার করা যায় না।
৮। বৈদেশিক নির্ভরতা: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ এখনো বিদেশি ঋণ, অনুদান এবং কারিগরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। দাতা সংস্থাগুলো অনেক সময় ঋণের সাথে এমন কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দেয় যা দেশের সার্বিক স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে। এই বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও দাতা দেশগুলোর নীতির পরিবর্তনের কারণে আমাদের জাতীয় পরিকল্পনাগুলো প্রায়শই ঝুঁকির মুখে পড়ে। নিজস্ব অর্থায়নের অভাব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে দেয়।
৯। মূল্যস্ফীতির চাপ: দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় না থাকলে কোনো পরিকল্পনাই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। সাম্প্রতিক সময়ে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর নির্মাণ সামগ্রীর খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত বাজেট ফেল করে এবং পুনরায় বাজেট সংশোধন করতে হয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যা অভ্যন্তরীণ বাজারের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
১০। আঞ্চলিক বৈষম্য: বাংলাদেশে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় অনেক ক্ষেত্রেই ঢাকা বা প্রধান প্রধান শহরগুলোকে কেন্দ্র করে চিন্তা করা হয়। ফলে দেশের প্রান্তিক অঞ্চল যেমন উত্তরাঞ্চল, হাওর এলাকা বা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নের মূল ধারা থেকে পিছিয়ে পড়ে। এই আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার সুনির্দিষ্ট কৌশল পরিকল্পনায় না থাকলে সামগ্রিক দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায় না। সুষম বণ্টন না হওয়ায় সম্পদ ও সুযোগ কেবল নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণীর হাতে পুঞ্জীভূত হয়।
১১। জলবায়ু পরিবর্তন: বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি ও অবকাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়। অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের এই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে হয়। দুর্যোগের কারণে আকস্মিক ক্ষতি সামাল দিতে গিয়ে মূল উন্নয়ন বাজেট থেকে অর্থ ডাইভার্ট করতে হয়।
১২। সমন্বয়হীনতা: পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব একটি বড় সমস্যা। এক দপ্তর যখন কোনো নীতি গ্রহণ করে, অন্য দপ্তর হয়তো সেটির সাথে সংগতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এই প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সময় একই কাজের জন্য একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয় অথবা একটি প্রকল্পের কাজ অন্যটির জন্য আটকে থাকে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সময়ের এমন অপচয় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে।
১৩। মনিটরিংয়ের অভাব: প্রকল্প শুরু করার পর তার অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি বা মনিটরিং করার ব্যবস্থা আমাদের দেশে খুবই দুর্বল। প্রকল্প পরিচালকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করায় কাজগুলো সময়মতো শেষ করার তাগিদ থাকে না। সঠিক সময়ে অডিট এবং মূল্যায়ন না হওয়ার কারণে ত্রুটিগুলো যথাসময়ে ধরা পড়ে না। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয় এবং জনগণের ট্যাক্সের পয়সার অপচয় ঘটে।
১৪। বেসরকারি খাতের উদাসীনতা: একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তবে বাংলাদেশে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বেসরকারি খাতকে অনেক সময় পর্যাপ্ত নীতি সহায়তা বা প্রণোদনা দেওয়া হয় না। আইনি জটিলতা, ঋণ প্রাপ্তির অসুবিধা এবং ব্যবসার পরিবেশের ঘাটতির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ আশানুরূপ বাড়ছে না। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে অংশীদারিত্বের এই অভাব পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ সাফল্যকে সীমিত করে দেয়।
১৫। রপ্তানি বহুমুখীকরণ: বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো মূলত তৈরি পোশাক খাত এবং রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল। অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাত যেমন চামড়া, আইটি বা কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। একক কোনো খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেকোনো বৈশ্বিক মন্দার সময়ে দেশের অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। রপ্তানি ঝুড়ি সমৃদ্ধ না করতে পারলে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা অসম্ভব।
১৬। ব্যাংকিং খাতের সংকট: দেশের আর্থিক খাতের মেরুদণ্ড হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা বর্তমানে খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের অভাবে জর্জরিত। ব্যাংকগুলো থেকে বড় বড় ঋণের অর্থ পাচার বা আত্মসাৎ হওয়ার কারণে নতুন উদ্যোক্তারা পুঁজি পাচ্ছেন না। তরল্য সংকট ও আর্থিক খাতের এই বিশৃঙ্খলা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ ঋণের জোগান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর্থিক খাতের সংস্কার ছাড়া যেকোনো বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অবাস্তব।
১৭। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ: বিশাল জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারা আমাদের অন্যতম বড় একটি ব্যর্থতা। আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেয়ে প্রবৃদ্ধির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়, ফলে “বেকারত্বহীন প্রবৃদ্ধি” দেখা দিচ্ছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক শ্রমবাজারে আসলেও তাদের জন্য উপযুক্ত কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এই বিপুল অদক্ষ জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ না হয়ে উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
১৮। আইনি জটিলতা: ভূমি অধিগ্রহণ ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত প্রাচীন ও জটিল। যেকোনো বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প যেমন রাস্তা বা সেতু বানাতে গিয়ে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে বছরের পর বছর কাজ আটকে থাকে। এই আইনি ও বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের খরচ এবং সময় দুই-ই বহুগুণ বেড়ে যায়। আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই আইনগুলোর সংস্কার না হওয়ায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের এই ত্রুটিগুলো দূর করা জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সঠিক উপাত্তের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে।