- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে এক চরম আদর্শিক সংকট দেখা দেয়। কার্ল মার্ক্স বা ভ্লাদিমির লেলিনের ধারণা ছিল, বিশ্ববিপ্লব ছাড়া সমাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। কিন্তু বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদ শক্তিশালী হতে থাকলে জোসেফ স্ট্যালিন এক সম্পূর্ণ নতুন ও বাস্তবসম্মত তত্ত্ব নিয়ে আসেন, যা ‘এক দেশের সমাজতন্ত্র’ (Socialism in One Country) নামে পরিচিত। এই তত্ত্বটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর এক অনন্য ব্লুপ্রিন্ট।
১। পটভূমি: রুশ বিপ্লবের পর লেনিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র লড়াই শুরু হয়। তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইউরোপের অন্য কোনো দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হয়নি, ফলে রাশিয়া চারদিক থেকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এই চরম একাকীত্ব ও হতাশার মাঝে জোসেফ স্ট্যালিন অনুধাবন করেন যে বাইরের সাহায্যের আশা করা বৃথা। তিনি রুশ জনগণকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্ন দেখান এবং এই তত্ত্বের অবতারণা করেন।
২। অর্থ ও সংজ্ঞা: এক দেশের সমাজতন্ত্র তত্ত্বের মূল কথা হলো বিশ্ববিপ্লবের ওপর নির্ভর না করে এককভাবেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। স্ট্যালিন দাবি করেন যে একটি বিশাল এবং সম্পদে ভরপুর দেশে সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ সম্ভব। এর জন্য বাইরের কোনো উন্নত বা শিল্পোন্নত দেশের বৈপ্লবিক সহযোগিতার কোনো প্রয়োজন নেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও সম্পদ দিয়েই একটি সম্পূর্ণ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
৩। লেনিনের উত্তরাধিকার: স্ট্যালিন তাঁর এই নতুন ও বিতর্কিত তত্ত্বটিকে লেনিনের চিন্তাধারার ধারাবাহিকতা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি লেনিনের বিভিন্ন পূর্ববর্তী উক্তি ও লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে দেখান যে রাশিয়া নিজেই সমাজতন্ত্রের ভিত্তি। তিনি প্রচার করেন যে লেনিনও রাশিয়ার মাটিতে সমাজতন্ত্রের সফল রূপায়ণে বিশ্বাসী ছিলেন। এর মাধ্যমে স্ট্যালিন সোভিয়েত জনগণের মনে নিজের নেতৃত্বের প্রতি গভীর আস্থা ও বৈধতা তৈরি করতে সক্ষম হন।
৪। ট্রটস্কির বিরোধিতা: লিওন ট্রটস্কি স্ট্যালিনের এই তত্ত্বের প্রধান এবং সবচেয়ে কট্টর বিরোধী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ট্রটস্কি বিশ্বাস করতেন ‘স্থায়ী বিপ্লব’ বা বিশ্ববিপ্লব ছাড়া রাশিয়ার একার পক্ষে সমাজতন্ত্র ধরে রাখা অসম্ভব। স্ট্যালিন ট্রটস্কির এই ধারণাকে অবাস্তব, ক্ষতিকর এবং রাশিয়ার জনগণের আত্মবিশ্বাসের পরিপন্থী বলে কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার লড়াইয়ে স্ট্যালিন জয়ী হন এবং ট্রটস্কিকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়।
৫। বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি: স্ট্যালিনের এই তত্ত্বটি ছিল সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত এবং তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জার্মানি বা অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশে যখন সর্বহারাদের বিপ্লব ব্যর্থ হলো, তখন বিশ্ববিপ্লবের আশা করা ছিল এক প্রকার অবাস্তব কল্পনা। স্ট্যালিন বুঝতে পেরেছিলেন যে কাল্পনিক তত্ত্বের পেছনে না ছুটে রাশিয়ার বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। তাই তিনি অবাস্তব আন্তর্জাতিকতাবাদের চেয়ে দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
৬। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা: এই তত্ত্বের প্রধান লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী এবং শক্তিশালী করে গড়ে তোলা। পুঁজিবাদী দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি ছিল। স্ট্যালিন চাননি যে কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় বা যুদ্ধসামগ্রীর জন্য রাশিয়াকে বাইরের শত্রুদের ওপর নির্ভর করতে হোক। এই অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার নীতিই পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করতে মূল ভূমিকা পালন করেছিল।
৭। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা: এক দেশের সমাজতন্ত্রকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য স্ট্যালিন ১৯২৮ সালে ঐতিহাসিক পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার পশ্চাৎপদ অর্থনীতিকে দ্রুত একটি আধুনিক ও শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। এর মাধ্যমে প্রতিটি খাতের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেশজুড়ে এক বিশাল অর্থনৈতিক যজ্ঞ শুরু হয়। এই সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ফলেই রাশিয়ার শিল্পায়নের চাকা অভাবনীয় গতিতে ঘুরতে শুরু করেছিল।
৮। দ্রুত শিল্পায়ন: স্ট্যালিন খুব ভালো করেই জানতেন যে ভারী শিল্প ছাড়া একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ কখনোই টিকে থাকতে পারবে না। তাই তিনি কয়লা, লোহা, ইস্পাত, বিদ্যুৎ এবং রাসায়নিক শিল্পের প্রসারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও মনোযোগ দিয়েছিলেন। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে রাশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে শত শত নতুন কারখানা ও শিল্পনগরী গড়ে ওঠে। এই জাদুকরী ও দ্রুত শিল্পায়নের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের বুকে অন্যতম প্রধান শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
৯। কৃষির যৌথকরণ: শিল্পায়নের পাশাপাশি কৃষিখাতকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য স্ট্যালিন যৌথকরণ বা ‘কালেক্টিভাইজেশন’ নীতি প্রবর্তন করেন। ছোট ছোট ব্যক্তিগত জমিগুলোকে একত্রিত করে বিশাল রাষ্ট্রীয় খামারে রূপান্তর করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি করা। উৎপাদিত এই বাড়তি ফসল দিয়ে শিল্পের শ্রমিকদের খাদ্যের জোগান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল।
১০। সামরিক আধুনিকায়ন: পুঁজিবাদী দেশগুলোর সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণ থেকে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে রক্ষা করা স্ট্যালিনের বড় মাথা ব্যথার কারণ ছিল। তাই এক দেশের সমাজতন্ত্র তত্ত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল লাল ফৌজ বা রেড আর্মিকে আধুনিকায়ন করা। ভারী শিল্পের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে আধুনিক অস্ত্র, ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমান তৈরি শুরু হয়। এই শক্তিশালী সামরিক কাঠামোর কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তীতে যেকোনো বহিরাগত আক্রমণ প্রতিহত করার সক্ষমতা অর্জন করে।
১১। জাতীয়তাবাদী চেতনা: মার্ক্সবাদের মূল কথা বিশ্বজনীন হলেও স্ট্যালিন এই তত্ত্বের মাধ্যমে রুশ জনগণের মধ্যে গভীর জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেন। তিনি সমাজতন্ত্রের সুরক্ষাকে রাশিয়ার মাতৃভূমি রক্ষার পবিত্র কর্তব্যের সাথে চমৎকারভাবে মিলিয়ে দিয়েছিলেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করার এক অভূতপূর্ব মানসিকতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিকতাবাদের চেয়ে এই দেশপ্রেমের জোয়ারই সমাজতন্ত্রের ভিত্তিকে রাশিয়ার সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আরও দৃঢ়ভাবে গেঁথে দিয়েছিল।
১২। শ্রমিকদের ত্যাগ: এই কঠিন এবং বিশাল তত্ত্বটিকে সফল করতে সোভিয়েত শ্রমিক ও কৃষকদের অসীম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল। কঠোর পরিশ্রম, কম মজুরি এবং সীমিত জীবনযাত্রার মান সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ দেশের স্বার্থে কাজ করে গেছে। স্ট্যালিন ‘স্টাখানোভাইট’ আন্দোলনের মতো বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বেশি উৎপাদনের জন্য শ্রমিকদের সামাজিকভাবে পুরস্কৃত করতেন। শ্রমিকদের এই নিরলস ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের ওপর ভর করেই রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের নতুন ইমারত গড়ে উঠেছিল।
১৩। ধনতন্ত্রের বিরোধিতা: স্ট্যালিন প্রচার করেছিলেন যে পশ্চিমা পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক বিশ্ব সবসময়ই প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি জনগণকে সতর্ক করে দিতেন যে সমাজতন্ত্রের সাফল্যই হবে পুঁজিবাদীদের মুখে চপেটাঘাত। এই বহিঃশত্রুর ভয় দেখিয়ে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ঐক্য বজায় রাখতে সফল হয়েছিলেন। পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক দেশের সমাজতন্ত্র ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আত্মরক্ষার একটি শক্তিশালী ঢাল ও হাতিয়ার।
১৪। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ: এই মহৎ ও জটিল তত্ত্বটি বাস্তবায়নের জন্য সোভিয়েত রাষ্ট্রে এক চরম কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টির ওপর স্ট্যালিনের একক ও পরম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সকল সিদ্ধান্ত ক্রেমলিন থেকে আসত। দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এই অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণের ফলে যেমন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত, তেমনি ব্যক্তিস্বাধীনতা পুরোপুরি খর্ব হয়েছিল।
১৫। তাত্ত্বিক বিতর্ক: মার্ক্সবাদী পণ্ডিতদের মধ্যে স্ট্যালিনের এই তত্ত্বটি নিয়ে আজ পর্যন্ত তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে। অনেক সমালোচকের মতে, এটি কার্ল মার্ক্সের মূল আন্তর্জাতিকতাবাদী সমাজতন্ত্রের আদর্শের এক ধরনের বিচ্যুতি বা বিকৃতি ছিল। তবে স্ট্যালিনের অনুসারীদের দাবি, মার্ক্সবাদ কোনো জড় বস্তু নয়, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী এটি পরিবর্তনশীল। তারা মনে করেন, তৎকালীন বৈরী বিশ্ব পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায় ছিল স্ট্যালিনের এই বাস্তবমুখী তত্ত্ব।
১৬। বিশ্ব রাজনীতি: এই তত্ত্বের ফলে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল বা কমিন্টার্নের নীতিতে এক বিশাল ও আমূল পরিবর্তন আসে। বিশ্ববিপ্লব ঘটানোর চেয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থ রক্ষা করাই আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয় তারা যেন নিজ নিজ দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতিকে সমর্থন করে। এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
১৭। ঐতিহাসিক সাফল্য: সমস্ত সমালোচনা সত্ত্বেও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্ট্যালিনের এই এক দেশের সমাজতন্ত্র তত্ত্বটি দারুণভাবে সফল হয়েছিল। এই নীতির কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন হিটলারের শক্তিশালী নাৎসি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে পেরেছিল। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি বা সুপারপাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হতে সক্ষম হয়। স্ট্যালিনের এই দূরদর্শী নীতি না থাকলে হয়তো সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার অস্তিত্ব অনেক আগেই বিলীন হয়ে যেত।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, জোসেফ স্ট্যালিনের ‘এক দেশের সমাজতন্ত্র’ তত্ত্বটি ছিল নিছক কোনো তত্ত্ব নয়, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার এক বাস্তব লড়াই। তাত্ত্বিক বিচ্যুতি ও একনায়কতন্ত্রের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এর মাধ্যমেই সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি অনগ্রসর দেশ থেকে আধুনিক শিল্প ও সামরিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। বিশ্ববিপ্লবের রোমান্টিকতা বর্জন করে স্ট্যালিনের এই বাস্তববাদী নীতিই ইতিহাসের পাতায় সমাজতন্ত্রকে দীর্ঘ কয়েক দশক টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।