- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে জন্ম নেয় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পুনর্গঠন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে আসছে। কেবল দেশের সীমান্ত রক্ষাই নয়, জাতীয় সংকটে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই বাহিনী আজ এক বিশ্বস্ত ও অনুকরণীয় নাম।
স্বাধীনতা পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান:
১। দেশ পুনর্গঠন: স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবকাঠামো পুনর্গঠনে সেনাবাহিনী অবতীর্ণ হয়। তারা ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট, সেতু ও কালভার্ট দ্রুত মেরামত করে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করে তোলে। দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক করতে তাদের এই প্রাথমিক অবদান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রশংসনীয়।
২। মাইন অপসারণ: যুদ্ধপরবর্তী সময়ে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও চালনায় প্রচুর মাইন ও ডুবন্ত জাহাজ ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অন্যান্য মিত্রবাহিনীর সহায়তায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই মাইন এবং বিস্ফোরক অপসারণের কাজ সম্পন্ন করে। এর ফলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং অর্থনৈতিক চাকা সচল হয়।
৩। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা: স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধী দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের অভ্যন্তরে অরাজকতা প্রতিরোধ করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা নিয়োজিত ছিল।
৪। পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি: পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছে। তারা সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা দমন করে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করেছে। বর্তমানেও সেখানে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
৫। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ এবং প্রতিটি বড় বিপর্যয়ে সেনাবাহিনী সবার আগে এগিয়ে আসে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা দুর্গতদের উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ করে। চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্বাসনে সেনাবাহিনীর তাৎক্ষণিক ভূমিকা মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
৬। অবকাঠামো উন্নয়ন: দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। রাজধানী ঢাকার ফ্লাইওভার, হাতিরঝিল প্রকল্প এবং কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক এর অন্যতম উদাহরণ। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় সড়ক নির্মাণ করে তারা দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
৭। ভোটার তালিকা: দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করতে সেনাবাহিনী জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে। ২০০৭-২০০৮ সালে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার তৈরির কাজটি তারা সফলভাবে সম্পন্ন করেছিল। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের এই ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির প্রক্রিয়াটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়।
৮। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট: বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট বা এমআরপি (MRP) চালুর দায়িত্বে ছিল সেনাবাহিনী। অতি অল্প সময়ে অত্যন্ত সফলতার সাথে তারা এই বিশাল প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে। এর ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং প্রবাসীদের যাতায়াত সহজতর হয়।
৯। পদ্মা সেতু প্রকল্প: বাংলাদেশের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তদারকির দায়িত্ব পালন করে। তারা মূল সেতুর নিরাপত্তা, নদী শাসন পর্যবেক্ষণ এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণে সরাসরি যুক্ত ছিল। সেনাবাহিনীর দক্ষ প্রকৌশলীদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির কারণে এই মেগা প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
১০। জাতিসংঘ মিশন: বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক রোল মডেল বা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। ১৯৮৮ সাল থেকে বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের সেনাসদস্যরা জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন। তাদের সততা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের কারণে বাংলাদেশ একাধিকবার জাতিসংঘ মিশনে শীর্ষ সেনা প্রেরণকারী দেশের গৌরব অর্জন করেছে।
১১। চিকিৎসা সেবা: সেনাবাহিনী দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে এবং জরুরি মুহূর্তে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল বা সিএমএইচ (CMH) সমূহের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করে অসহায় মানুষকে ওষুধ ও চিকিৎসা দেওয়া সেনাবাহিনীর নিয়মিত কাজ।
১২। শিক্ষা বিস্তার: দেশে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করছে। ক্যাডেট কলেজ, আর্মি মেডিকেল কলেজ এবং বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ এর অন্যতম উদাহরণ। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি হয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে।
১৩। করোনা মহামারী মোকাবেলা: বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারীকালীন সময়ে সেনাবাহিনী মাঠে নেমে প্রশংসনীয় মানবিক দায়িত্ব পালন করে। তারা সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ, কোয়ারেন্টাইন সেন্টার পরিচালনা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছানোর কাজ করে। সাধারণ মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাস্ক বিতরণে তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কার্যকর।
১৪। ক্রীড়া উন্নয়ন: দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে সেনাবাহিনীর ক্রীড়াবিদগণ নিরলসভাবে অবদান রেখে চলেছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুটিং, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার ও গলফসহ বিভিন্ন খেলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে পদক জয় করেছে। সেনাবাহিনীর নিজস্ব প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কারণে দেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রে দক্ষ ও পেশাদার অ্যাথলেট তৈরি হচ্ছে।
১৫। সীমান্ত নিরাপত্তা: দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং সীমান্ত সুরক্ষায় সেনাবাহিনী সবসময় সর্বোচ্চ সজাগ ও প্রস্তুত থাকে। যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে তারা অতন্দ্র প্রহরীর মতো সীমান্ত পাহারা দেয়। দুর্গম সীমান্ত এলাকায় নতুন নতুন বিওপি (BOP) এবং সড়ক নির্মাণ করে তারা দেশের নিরাপত্তা বলয় জোরদার করেছে।
১৬। শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে বিভিন্ন লাভজনক ও কল্যাণমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা, ডকইয়ার্ড এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এর প্রধান উদাহরণ। এসব প্রতিষ্ঠান দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
১৭। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা: মায়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনে সেনাবাহিনী রাতদিন কাজ করেছে। তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপন, ত্রাণ বিতরণ এবং চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন করেছে। আন্তর্জাতিক এই মানবিক সংকট অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামাল দিয়ে তারা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
১৮। জাতীয় জরুরি সেবা: দেশের যেকোনো বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনা, ভবন ধস বা বড় ধরনের বিপর্যয়ে সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর সেনাবাহিনীর পরিচালিত উদ্ধার অভিযান বিশ্ববাসী অবলোকন করেছে। অতি দ্রুত উদ্ধার কাজ পরিচালনা এবং মানবজীবন রক্ষায় তাদের এই তাৎক্ষণিক সাড়াদান অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় যে, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে সেনাবাহিনীর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তারা সর্বদা বদ্ধপরিকর। পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের এক অপূর্ব সমন্বয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ সমগ্র জাতির এক পরম গর্বের প্রতীক।