- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ধনতান্ত্রিক শোষণ ও শিল্প বিপ্লবের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে যে মানবিক প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল, তারই অনন্য ফসল কাল্পনিক সমাজতন্ত্র। সমাজবিজ্ঞানী সেন্ট সাইমন এবং শিল্পপতি রবার্ট ওয়েন এই ধারার প্রধান পুরোধা ছিলেন। তাঁরা বিপ্লব ছাড়াই নিছক নৈতিক আবেদন ও আদর্শিক রূপরেখার মাধ্যমে এক শোষণহীন, সমতাভিত্তিক শান্তিময় সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
১। পটভূমি গঠন: সেন্ট সাইমন ও রবার্ট ওয়েনের চিন্তাধারার মূল ভিত্তি ছিল শিল্প বিপ্লব পরবর্তী ইউরোপের চরম শ্রমিক শোষণ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপজুড়ে কলকারখানা গড়ে উঠলে পুঁজিপতিরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং সাধারণ শ্রমিকেরা মানবেতর জীবনযাপন শুরু করে। এই অমানবিক পরিস্থিতি দুই মনীষীকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তাঁরা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তাঁদের এই মহৎ ভাবনাই ইতিহাসে কাল্পনিক সমাজতন্ত্র বা ইউটোপিয়ান সোশ্যালিজম নামে পরিচিতি লাভ করে।
২। শ্রেণিহীন সমাজ: সেন্ট সাইমন এমন একটি সমাজ ব্যবস্থার কথা কল্পনা করেছিলেন যেখানে কোনো কৃত্রিম সামাজিক বা অর্থনৈতিক শ্রেণিভেদ থাকবে না। তাঁর মতে, সমাজে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হবে বংশমর্যাদা বা অলস পুঁজির দ্বারা নয়, বরং ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও কাজের ভিত্তিতে। সমাজের পরজীবী বা অলস শ্রেণির মানুষ, যারা কোনো উৎপাদনশীল কাজ না করেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়, তাদের তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমাজে কেবল উৎপাদনকারী ও মেহনতি মানুষেরাই প্রকৃত সম্মানের অধিকারী হওয়া উচিত।
৩। শ্রমের মূল্যায়ন: রবার্ট ওয়েন মনে করতেন শ্রমিকদের উৎপাদিত শ্রমই হলো সমস্ত সম্পদের মূল উৎস এবং এর সঠিক মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকেরা তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হতো এবং সমস্ত লভ্যাংশ মালিকের পকেটে চলে যেত। ওয়েন এই শোষণের তীব্র বিরোধিতা করে ঘোষণা করেন যে, শ্রমিকের শ্রমের প্রকৃত মূল্য অনুযায়ী তাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। তিনি তাঁর নিজের কারখানায় শ্রমিকদের কাজের সময় কমিয়ে দেন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে মজুরি বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছিলেন।
৪। যৌথ মালিকানা: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ ঘটিয়ে উৎপাদনের উপায়ে যৌথ বা সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা। সেন্ট সাইমন ও রবার্ট ওয়েন উভয়ই মনে করতেন যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি সমাজে লোভ, হিংসা ও চরম বৈষম্য তৈরি করে। তাই তাঁরা কলকারখানা, জমি এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতকে সমাজের সকলের যৌথ নিয়ন্ত্রণে আনার প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁদের মতে, সম্পদের ওপর যখন পুরো সমাজের অধিকার থাকবে, তখন ব্যক্তিগত মুনাফার অন্ধ চশমা ক্ষয়ে গিয়ে সামষ্টিক কল্যাণ নিশ্চিত হবে।
৫। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: সেন্ট সাইমন সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হবে যুদ্ধবিগ্রহ বা শাসন করা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা তদারকি করা। তাঁর কাল্পনিক রাষ্ট্রে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, শিল্পপতি এবং দক্ষ প্রযুক্তিবিদেরা যৌথভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন। এর ফলে সমাজের সম্পদ অপচয় না হয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারবে।
৬। সহযোগিতার নীতি: রবার্ট ওয়েন পুঁজিবাদী প্রতিযোগিতার পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সহমর্মিতাকে সমাজ গঠনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে টিকে থাকার অন্ধ প্রতিযোগিতা মানুষকে স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর করে তোলে, যা সমাজের শান্তি বিনষ্ট করে। এর বিপরীতে, যদি মানুষ পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা না করে সমবায়ের ভিত্তিতে কাজ করে, তবে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং শান্তি বজায় থাকবে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মানব সমাজ একটি পরিবারের মতো, যেখানে একে অপরের সহযোগিতাই প্রগতির চাবিকাঠি।
৭। শোষণমুক্ত পরিবেশ: কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর এবং শোষণমুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করার ওপর রবার্ট ওয়েন বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে মিল-কারখানাগুলোর পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নোংরা, অন্ধকার এবং স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, যা শ্রমিকদের জীবনকে নরকতুল্য করে তুলত। ওয়েন তাঁর নিজস্ব নিউ ল্যানার্কের সুতা কলে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, ভালো পরিবেশ ও মানবিক আচরণ শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
৮। নৈতিক জাগরণ: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা কোনো প্রকার রক্তক্ষয়ী ক্রান্তি বা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের কথা কখনোই চিন্তা করেননি। সেন্ট সাইমন এবং রবার্ট ওয়েন বিশ্বাস করতেন যে, ধনী ও পুঁজিপতিদের হৃদয়ের পরিবর্তন এবং নৈতিক জাগরণের মাধ্যমেই সমাজতন্ত্র আনা সম্ভব। তাঁরা ভাবতেন, ধনীরা যখন বুঝতে পারবে যে শোষণ একটি অনৈতিক কাজ, তখন তারা নিজেরাই উদ্বৃত্ত সম্পদ ছেড়ে দেবে। এই অতিরিক্ত সরলতা ও নৈতিক আবেদনই ছিল তাঁদের সমাজতান্ত্রিক রূপরেখার একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় কিন্তু বাস্তবতাবর্জিত দিক।
৯। সমবায় আন্দোলন: রবার্ট ওয়েনকে আধুনিক সমবায় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান জনক বা পথিকৃৎ হিসেবে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করা হয়ে থাকে। তিনি শ্রমিক ও সাধারণ ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষার্থে মুনাফাহীন সমবায় দোকান এবং সমবায় উৎপাদন ভিত্তিক ছোট ছোট গ্রাম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁর এই মডেল অনুযায়ী, সমবায়ের সদস্যরা নিজেরাই উৎপাদন করবে এবং ন্যায্য মূল্যে নিজেদের মধ্যে পণ্য বণ্টন করে নেবে। এর মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিদের শোষণ থেকে সমাজের সাধারণ মানুষকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা।
১০। নতুন সমাজ: সেন্ট সাইমন এবং রবার্ট ওয়েন দুজনেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং আধুনিক শিল্পের চরম বিকাশের মাধ্যমে একটি নতুন সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁরা শিল্পায়নের বিরোধী ছিলেন না, বরং শিল্পের ক্ষতিকর দিকগুলোকে দূর করে একে মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের স্বপ্নের সমাজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমস্ত আবিষ্কার মানুষের দাসত্ব মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে, কোনো শোষণের অস্ত্র হিসেবে নয়। এই নতুন সমাজে প্রতিটি মানুষ তার সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের সমান এবং অবারিত সুযোগ লাভ করবে।
১১। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার: রবার্ট ওয়েন সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, প্রতিকূল পরিবেশ ও শিক্ষার অভাবই মানুষকে অপরাধী বা অলস করে তোলে, তাই শৈশব থেকেই সঠিক শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। তিনি তাঁর কারখানার শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য অবৈতনিক এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত চমৎকার শিশু বিদ্যালয় বা ইনফ্যান্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের চারিত্রিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটিয়ে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
১২। পরিকল্পিত অর্থনীতি: সেন্ট সাইমন অনুন্নত ও বিশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি সুপরিকল্পিত এবং কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রস্তাব করেছিলেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়, তা তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তাঁর মতে, দেশের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে সেই অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন ও বণ্টন করা উচিত। এই সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সমাজের অপচয় রোধ করবে এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে।
১৩। মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি: এই দুই মহান চিন্তাবিদের সামগ্রিক দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গভীর মানবতাবাদ ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তাঁরা তৎকালীন সমাজের দরিদ্র, নিঃস্ব ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে নিজেদের বিলাসবহুল জীবন ও চিন্তা উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের এই সমাজতান্ত্রিক রূপরেখা কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার ছিল না, বরং তা ছিল মানব মুক্তির এক মহৎ ইশতেহার। মানুষের দুঃখ দূর করে সমাজকে একটি সুখী ও সুন্দর বাসযোগ্য স্থানে পরিণত করাই ছিল তাঁদের মূল প্রেরণা।
১৪। শান্তিপূর্ণ রূপান্তর: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তারা সমাজ পরিবর্তনের জন্য সবসময় সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও অহিংস পথ বেছে নিয়েছিলেন। মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রের মতো তারা বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত শ্রেণির মধ্যে কোনো সশস্ত্র সংগ্রাম বা রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। তাঁরা মনে করতেন, ধনিক শ্রেণিকে বুঝিয়ে, আইনি সংস্কার করে এবং সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব। এই অতি-শান্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শ্রমিকেরা উদ্বুদ্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত তা দীর্ঘস্থায়ী কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে পারেনি।
১৫। আদর্শ গ্রাম: রবার্ট ওয়েন তাঁর সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে ‘নিউ হারমনি’ নামক এক চমৎকার আদর্শ গ্রাম বা সমবায় কমিউনিটি গড়ে তুলেছিলেন। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রামে সবাই একসাথে বসবাস করত, একসাথে কাজ করত এবং উৎপাদিত সম্পদ সমানভাবে ভাগ করে নিত। যদিও অভ্যন্তরীণ কিছু মতবিরোধ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাবে এই পরীক্ষামূলক আদর্শ গ্রামটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তাসত্ত্বেও, এই উদ্যোগটি প্রমাণ করে যে ওয়েন তাঁর কাল্পনিক তত্ত্বকে বাস্তবে রূপ দিতে কতটা আন্তরিক ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
১৬। ঐতিহাসিক অবদান: কার্ল মার্ক্স ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস সেন্ট সাইমন এবং রবার্ট ওয়েনের এই তত্ত্বকে ‘কাল্পনিক’ বললেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অকপটে স্বীকার করেছেন। এই দুই মনীষীই সর্বপ্রথম পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ত্রুটি, অসমতা এবং মানবিক বিপর্যয়গুলোকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছিলেন। তাঁদের সুতীক্ষ্ণ সমালোচনা ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা পরবর্তীকালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র বা মার্ক্সবাদের পথকে অনেক সহজ ও সুগম করে তুলেছিল। আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অনেক ধারণাই আসলে তাঁদের এই চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
১৭। সীমাবদ্ধতার স্বরূপ: সেন্ট সাইমন ও রবার্ট ওয়েনের কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল শ্রেণী সংগ্রামের অনুপস্থিতি এবং পুঁজিবাদের বাস্তব চরিত্রকে বুঝতে না পারা। তাঁরা পুঁজিপতিদের সদিচ্ছা ও হৃদয়ের পরিবর্তনের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় ভরসা করেছিলেন, যা বাস্তব সম্মত ছিল না। শোষক শ্রেণী যে কখনো স্বেচ্ছায় তাদের স্বার্থ ও বিপুল সম্পত্তি ত্যাগ করবে না, এই রূঢ় সত্যটি তাঁরা অনুধাবন করতে পারেননি। সমাজ পরিবর্তনের কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক পথ না থাকায় তাঁদের এই সুন্দর রূপরেখা শেষ পর্যন্ত এক উজ্জ্বল কল্পনাই রয়ে গেছে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় যে, সেন্ট সাইমন ও রবার্ট ওয়েনের সমাজতান্ত্রিক রূপরেখা বাস্তবে পুরোপুরি সফল না হলেও তা মানব ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। সমাজ থেকে শোষণ, বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূর করার জন্য তাঁরা যে মানবিক ও সমবায়ী মডেলের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজও সমাদৃত। তাঁদের এই কাল্পনিক সমাজতন্ত্রই মূলত পরবর্তীকালের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এবং আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল, যা সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।