- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে নাটকীয় এবং প্রভাবশালী ঘটনা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। দীর্ঘ সাত দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে টিকে থাকা এই সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি ১৯৯১ সালে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। কোনো বাহ্যিক আক্রমণ ছাড়া, সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে এই মহাবিপ্লবী রাষ্ট্রের অবসান বিশ্বকে এক নতুন মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেয়।
১। অর্থনৈতিক স্থবিরতা: আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে থমকে দাঁড়ায়। অতিমাত্রায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শিল্প উৎপাদন হ্রাস পায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান শোচনীয় হয়ে পড়ে। বাজার অর্থনীতির অভাব এবং ভুল অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই এই ধসের প্রধান কারণ ছিল।
২। সামরিক প্রতিযোগিতা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘস্থায়ী শীতল যুদ্ধ এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য আত্মঘাতী ছিল। ওয়াশিংটনের ‘স্টার ওয়ার্স’ প্রকল্পের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে মস্কো তার বাজেটের সিংহভাগ সামরিক খাতে ব্যয় করতে বাধ্য হয়। এর ফলে জনকল্যাণমূলক খাতগুলো মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত হয় এবং অর্থনীতি পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে পড়ে।
৩। আফগান যুদ্ধ: ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক আক্রমণ ছিল একটি মস্ত বড় কৌশলগত ভুল। দীর্ঘ এক দশক ধরে চলা এই যুদ্ধ সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধ’ হিসেবে প্রমাণিত হয়। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি হাজার হাজার সোভিয়েত সৈন্যের প্রাণহানি ঘটে। এই ব্যর্থ যুদ্ধ দেশের অভ্যন্তরে সরকারের জনপ্রিয়তা ও নৈতিক ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে ধসিয়ে দেয়।
৪। গ্লাসনস্ত নীতি: মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতা গ্রহণের পর ‘গ্লাসনস্ত’ বা উন্মুক্ততা নীতি প্রবর্তন করেন। এই নীতির ফলে সোভিয়েত নাগরিকরা দীর্ঘকাল পর বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার লাভ করে। এর ফলে সরকারের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দমনপীড়ন ও ব্যর্থতার ইতিহাস জনসমক্ষে চলে আসে। বাকস্বাধীনতার এই সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষ কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করে।
৫। পেরেস্ত্রৈকা নীতি: অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে গর্বাচেভ ‘পেরেস্ত্রৈকা’ বা পুনর্গঠন নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এই ব্যবস্থার অধীনে আংশিক মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণা চালু করার চেষ্টা করা হয়। তবে দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত কমিউনিস্ট কাঠামো ভেঙে নতুন ব্যবস্থা গড়তে গিয়ে অর্থনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্যসংকট তীব্র হয়ে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
৬। কমিউনিস্টদের দুর্নীতি: সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতারা চরম দুর্নীতি ও ভোগবিলাসে মগ্ন ছিলেন। সাধারণ মানুষ যখন লাইনে দাঁড়িয়ে রুটি সংগ্রহ করত, তখন নেতারা বিশেষ সুবিধাজনক জীবনযাপন করতেন। এই ‘নমেনক্লাতুরা’ বা সুবিধাভোগী শ্রেণীর প্রতি সাধারণ জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম নেয়। দলের ওপর থেকে মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যায়।
৭। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: সোভিয়েত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল চরম মাত্রায় কেন্দ্রীভূত এবং আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি ছোটখাটো সিদ্ধান্তের জন্য মস্কোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হতো। এই অদক্ষ ও স্থবির আমলাতন্ত্র উদ্ভাবনী শক্তিকে গলা টিপে হত্যা করে। ফলে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতির সাথে তাল মেলাতে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
৮। জাতীয়তাবাদের উত্থান: সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ১৫টি ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির প্রজাতন্ত্রের একটি জোরপূর্বক জোড়াতালি দেওয়া ইউনিয়ন। মস্কোর দমননীতি শিথিল হতেই বাল্টিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন রাজ্যে তীব্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। ইউক্রেন, জর্জিয়া এবং এস্তোনিয়ার মতো দেশগুলো নিজেদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দাবি তুলতে থাকে। এই জাতীয়তাবাদের জোয়ার সোভিয়েত ঐক্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়।
৯। চেরনোবিল বিপর্যয়: ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দুর্ঘটনা সোভিয়েত ব্যবস্থার অদক্ষতা প্রকাশ করে। প্রাথমিক অবস্থায় সরকার এই চরম বিপর্যয়ের খবর গোপন করার অপচেষ্টা চালায়। পরবর্তীতে সত্য প্রকাশ পেলে রাষ্ট্রের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে তীব্র সমালোচনা হয়। এই ঘটনাটি সরকারের ওপর জনগণের বিশ্বাসের ভিত সম্পূর্ণরূপে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
১০। তথ্যের নিয়ন্ত্রণহীনতা: আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ এবং গ্লাসনস্ত নীতির কারণে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সোভিয়েত তরুণ সমাজ পশ্চিমা জীবনযাত্রা, স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা আর কাজ করছিল না। ফলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের মোহ বহুগুণ বেড়ে যায়।
১১। নেতৃত্বের দুর্বলতা: ব্রেজনেভের দীর্ঘ শাসনামলে সোভিয়েত ইউনিয়নে কোনো যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেনি। গর্বাচেভ যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন সংস্কার করার মতো যথেষ্ট সময় বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ছিল না। তার দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সংস্কার প্রক্রিয়া হিতে বিপরীত হয়। যোগ্য ও দূরদর্শী রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবেই বিশাল এই সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল।
১২। আদর্শিক দেউলিয়াত্ব: দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসন এবং জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া মার্ক্সবাদী আদর্শের প্রতি মানুষ ক্লান্তি অনুভব করছিল। সাম্যবাদের যে সোনালী স্বপ্ন জনগণকে দেখানো হয়েছিল, বাস্তব জীবনের সাথে তার কোনো মিল ছিল না। আদর্শের এই শূন্যতা ও মিথ্যাচার সাধারণ মানুষকে সমাজতন্ত্রের প্রতি চরমভাবে উদাসীন ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। ফলে ব্যবস্থার সুরক্ষায় কেউ এগিয়ে আসেনি।
১৩। পশ্চিমা চক্রান্ত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস করতে গোপনে কাজ করে যাচ্ছিল। তারা সোভিয়েত বিরোধী বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এবং পোল্যান্ডের ‘সলিডারিটি’র মতো আন্দোলনকে বিপুল অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে। পশ্চিমা দেশগুলোর এই ভূ-রাজনৈতিক চাপ ও কূটকৌশল সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ ভাঙনকে অনেক বেশি সহজ ও দ্রুততর করে তুলেছিল।
১৪। তেলের দরপতন: আশির দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের মূল্যে এক ভয়াবহ ধস নামে। সোভিয়েত অর্থনীতি মূলত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। তেলের দাম কমার ফলে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার আয় এক ধাক্কায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এই আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো কোনো বিকল্প পরিকল্পনা মস্কোর ছিল না।
১৫। বাল্টিক বিদ্রোহ: এস্তোনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়া—এই তিনটি বাল্টিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য প্রথম জোরালো আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৯ সালে লাখ লাখ মানুষ মানবপ্রাচীর তৈরি করে স্বাধীনতার দাবি জানায়। এই সফল প্রতিরোধ আন্দোলন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের ভেতরও স্বাধীনতার মশাল জ্বেলে দেয়। বাল্টিক দেশগুলোর এই সাহসই সোভিয়েত ভাঙনের সূচনা করে।
১৬। আগস্ট ক্যু: ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে কমিউনিস্ট পার্টির কট্টরপন্থী নেতারা গর্বাচেভকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্য একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। এই ঘটনার ফলে কমিউনিস্ট পার্টির দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ বিভেদ পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে এবং বরিস ইয়েলৎসিন নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন। এই ব্যর্থ ক্যু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন নিশ্চিত করে।
১৭। বেলোভেঝা চুক্তি: ১৯৯১ সালের ৮ই ডিসেম্বর রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশের নেতারা বেলোভেঝা নামক স্থানে এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন এবং কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস গঠন করেন। এই আইনি ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্র থেকে একটি পরাশক্তি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, কোনো একক কারণে নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। মিখাইল গর্বাচেভের সংস্কারের প্রয়াস স্থবির হয়ে পড়া এক বিশাল সাম্রাজ্যকে বাঁচাতে গিয়ে উল্টো তার ধ্বংসকে অবধারিত করে তোলে। ১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর ক্রেমলিন থেকে লোহিত পতাকা নামিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে। এই পতন প্রমাণ করে যে, জনগণের মৌলিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া কোনো স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই চিরস্থায়ী হতে পারে না।